যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে যখন গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা চলছে, ঠিক তখনই ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির রহস্যময় প্রকাশ্য অনুপস্থিতি তেহরানের জন্য বড় সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে জনসমক্ষে তার অনুপস্থিতি এবং শান্তি আলোচনা নিয়ে নীরবতা খোদ ইরানের শাসক মহলেই অস্বস্তি বাড়াচ্ছে।
হামলায় গুরুতর আহত হন মোজতবা
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের কর্মকর্তাদের মতে, গত ফেব্রুয়ারিতে এক বিমান হামলায় মোজতবা খামেনি গুরুতর আহত হন। ওই হামলায় তার স্ত্রী, সন্তান ও বাবা সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনি নিহত হন। এরপর থেকে মোজতবার পক্ষ থেকে কেবল কিছু লিখিত বার্তা এবং ছবি প্রকাশিত হয়েছে। তবে পর্যবেক্ষকদের দাবি, সেসব ছবি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে তৈরি অথবা পরিবর্তন করা।
নীতিনির্ধারকদের মধ্যে ফাটল
মোজতবা খামেনির অনুপস্থিতিতে তেহরানের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে ফাটল দেখা দিচ্ছে। যুদ্ধের সময় তারা ঐক্যবদ্ধ থাকলেও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তির বিষয়ে তারা এখন দ্বিধাবিভক্ত। ইয়েল ইউনিভার্সিটির ইতিহাসবিদ আরশ আজিজি বলেন, খামেনির দীর্ঘ অনুপস্থিতি তার কট্টরপন্থি সমর্থকদের বিচলিত করছে। তারা এই শান্তি আলোচনার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। বিশেষ করে পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফের মতো মধ্যপন্থি নেতাদের ওপর তারা ক্ষুব্ধ। তাদের অভিযোগ, গালিবাফ যুক্তরাষ্ট্রের কাছে অনেক বেশি নতি স্বীকার করছেন।
কট্টরপন্থি অনেক সমর্থক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খামেনির কাছে অন্তত একটি অডিও বার্তা প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন, যাতে তিনি এই আলোচনার প্রতি নিজের সমর্থন ব্যক্ত করেন।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
ইরানের ইতিহাসে জাতীয় নিরাপত্তার মতো বড় সিদ্ধান্তে সর্বোচ্চ নেতাই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দিয়ে থাকেন। মোজতবার দুই পূর্বসূরি প্রায়ই জনসমক্ষে এসে বিভিন্ন পক্ষের বিবাদ মেটাতেন। আশির দশকে ইরান-ইরাক যুদ্ধ থামানোর সময় আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি সেই কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, যাকে তিনি ‘বিষের পেয়ালা’ পানের সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। মোজতবার বাবা আলী খামেনিও ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তির আগে জনসমক্ষে আলোচনার সবুজ সংকেত দিয়েছিলেন।
এআই ছবি ও ধোঁয়াশা
বর্তমান সরকারের পক্ষ থেকে মোজতবার নতুন কোনও ছবি প্রকাশ করা হয়নি। এমনকি তার এক্স অ্যাকাউন্টের ছবি বা তেহরানের রাজপথের বিশাল বিলবোর্ডগুলোও এআই দিয়ে তৈরি বলে মনে হচ্ছে বলে দাবি করা হচ্ছে মার্কিন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে। তার কোনও কণ্ঠস্বর না পাওয়ায় অনেক ইরানি নাগরিক প্রশ্ন তুলছেন, তিনি আদৌ বেঁচে আছেন কি না।
ইরানি কর্মকর্তাদের দাবি, নিরাপত্তার স্বার্থেই মোজতবা খামেনি নিজেকে আড়ালে রেখেছেন। ইসরায়েলের ‘হিট লিস্টে’ তার নাম শীর্ষে থাকায় সুরক্ষার খাতিরে এই গোপনীয়তা। তবে গত বৃহস্পতিবার ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান প্রথমবার দাবি করেন, তিনি খামেনির সঙ্গে আড়াই ঘণ্টার একটি বৈঠক করেছেন। বিশ্লেষকদের মতে, মোজতবা যে মৃত নন, বরং নিরাপত্তার কারণে লুকিয়ে আছেন; সমর্থক ও বিরোধীদের তা বোঝাতেই পেজেশকিয়ান এই বার্তা দিয়েছেন।
সরকারি বিবৃতিতে ধোঁয়াশা
এদিকে শুক্রবার রাতে খামেনির আঘাতের বিবরণ দিয়ে এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, ফেব্রুয়ারির হামলায় মোজতবার পিঠ ও হাঁটু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। তবে বর্তমানে তিনি সুস্থ আছেন। মোজতবার কার্যালয়ের কর্মকর্তা মাজাহের হোসেনি বলেন, ‘শত্রুরা নানা অজুহাতে তার অডিও বা ভিডিও রেকর্ড পাওয়ার চেষ্টা করছে যাতে সেটির অপব্যবহার করা যায়। উপযুক্ত সময়ে তিনি নিজেই আপনাদের সঙ্গে কথা বলবেন।’
তবে এসব সরকারি বিবৃতিতে ধোঁয়াশা কাটছে না। পেজেশকিয়ানের বক্তব্যে কী আলোচনা হয়েছে তার চেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে তাদের সাক্ষাতের ধরণ, আর কবে কোথায় এই বৈঠক হয়েছে সে সম্পর্কেও কিছু জানানো হয়নি।
সূত্র: ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল



