হরমুজ প্রণালিতে ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কোরের আটক করা জাহাজ এমএসসি ফ্রান্সেসকা। ২৪ এপ্রিল, ২০২৬ছবি: রয়টার্স
যুদ্ধ শেষ করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে ১৪ দফার নতুন একটি প্রস্তাব দিয়েছে ইরান। এই প্রস্তাবের মূল লক্ষ্য যুদ্ধ বন্ধ করা এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা আনা। গত শনিবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, তিনি নতুন প্রস্তাবগুলো পর্যালোচনা করছেন, তবে এখনো চুক্তির বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাননি। মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তানের মাধ্যমে ইরানের পাঠানো আগের প্রস্তাবটি নিয়ে হতাশা প্রকাশের এক দিন পর এ কথা বলেন ট্রাম্প।
গত বৃহস্পতিবার রাতে তেহরান ১৪ দফা প্রস্তাব পাকিস্তানকে পাঠায়। ইরানের বার্তা সংস্থা তাসনিম নিউজের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র যে ৯ দফা প্রস্তাব দিয়েছিল, তার পাল্টায় ১৪ দফা প্রস্তাব তৈরি করে তেহরান।
ইরানে যুদ্ধবিরতি শুরুর কয়েক সপ্তাহ পেরিয়ে গেছে। তবে এখনো ওয়াশিংটন ও তেহরান কোনো শান্তিচুক্তিতে পৌঁছাতে পারেনি। তেহরান চায় যুদ্ধের স্থায়ী অবসান। আর ট্রাম্প চাইছেন ইরান প্রথমে হরমুজ প্রণালিতে চলমান অবরোধ বন্ধ করুক। গুরুত্বপূর্ণ এ জলপথ দিয়ে বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ তেল ও গ্যাস রপ্তানি হয়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতার বিষয়টি নিয়েও আলোচনার ওপর জোর দিয়েছেন।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার প্রতিক্রিয়ায় হরমুজ প্রণালিতে অবরোধ শুরু করে ইরান। পরে ট্রাম্প প্রশাসনও ইরানি বন্দরে নৌ অবরোধ শুরু করে। যুদ্ধবিরতি চলার মধ্যেও নৌ অবরোধ চলতে থাকে। দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা বেড়ে যায়। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একে অপরের জাহাজে হামলা, আটক এবং বাধা দেওয়ার ঘটনা চালিয়ে যাচ্ছে।
এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে, ইরানের নতুন প্রস্তাবটিতে কী আছে এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তা গ্রহণ করবেন কি না।
ইরানের ১৪ দফা প্রস্তাবে কী আছে
ইরানের সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, তেহরানের ১৪ দফা প্রস্তাবটি মূলত ওয়াশিংটনের দেওয়া ৯ দফা শান্তি পরিকল্পনার জবাব। যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত প্রস্তাবের প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল দুই মাসের একটি যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করা। ইরানের এই ১৪ দফা পরিকল্পনা মূলত একটি বিস্তৃত শান্তিকাঠামো, যা শুধু সাময়িক যুদ্ধবিরতির বদলে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের দিকে ইঙ্গিত করছে।
নতুন শান্তি প্রস্তাবে ইরান বলেছে, তারা যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানোর চেয়ে যুদ্ধ অবসানের দিকে বেশি মনোযোগ দিতে চায়। এ ছাড়া তারা ৩০ দিনের মধ্যে সব বিষয় নিষ্পত্তি করতে চায়।
নতুন প্রস্তাবে ভবিষ্যতে হামলা না করার নিশ্চয়তা, ইরানের চারপাশ থেকে মার্কিন বাহিনী প্রত্যাহার, শতকোটি ডলার মূল্যের জব্দকৃত ইরানি সম্পদ ফেরত দেওয়া এবং নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি জানানো হয়েছে। এ ছাড়া যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ, সব শত্রুতা বন্ধ (লেবাননসহ) এবং ‘হরমুজ প্রণালির জন্য একটি নতুন ব্যবস্থা’ গড়ে তোলার কথাও বলা হয়েছে।
গত বছরের জুনেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার শিকার হয়েছিল ইরান। দেশটি ভবিষ্যতে যেকোনো আগ্রাসন না হওয়ার নিশ্চয়তা চায়। ইসরায়েল এর আগে ইরানি পরমাণু বিজ্ঞানীদের লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে এবং দেশটির পারমাণবিক স্থাপনায় নাশকতা চালিয়েছে।
ট্রাম্প কি এ প্রস্তাব গ্রহণ করবেন
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইতিমধ্যে বলেছেন, তিনি ইরানের প্রস্তাবটি পর্যালোচনা করছেন। ট্রাম্প হুঁশিয়ার করে বলেছেন, ইরান বাজে আচরণ করলে ওয়াশিংটন নতুন করে হামলা শুরু করবে।
গত শনিবার ফ্লোরিডায় সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেছেন, তিনি প্রস্তাবটি সম্পর্কে অবগত আছেন।
কূটনৈতিক আলোচনার সম্ভাবনার মধ্যেও আবার হামলা শুরু করা না–করা প্রশ্নে প্রেসিডেন্ট আগের মতোই কঠোর অবস্থান বজায় রেখেছেন।
হামলা আবার শুরু হবে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘তারা যদি খারাপ কিছু করে, তাহলে সেটা আবারও ঘটার সম্ভাবনা আছে।’
ট্রাম্প আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ‘খুব ভালো অবস্থানে’ আছে। তিনি দাবি করেন, ইরান সমঝোতার জন্য মরিয়া হয়ে আছে। কারণ, কয়েক মাসের সংঘাত ও নৌ অবরোধে দেশটি বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।
পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে একটি পোস্ট দিয়েছেন ট্রাম্প। সেখানে তিনি লেখেন, ইরানের প্রস্তাব গ্রহণযোগ্য হওয়া কঠিন। কারণ, গত ৪৭ বছরে ইরান মানবজাতি এবং বিশ্বকে যে ক্ষতির মধ্যে ফেলেছে, তার জন্য যথেষ্ট মূল্য পরিশোধ করেনি তারা।
কাতারের জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক পল মুসগ্রেভ মনে করেন, ট্রাম্প সম্ভবত ইরানের নতুন প্রস্তাবটি না পড়েই বা এর সম্পর্কে পুরোপুরি তথ্য না নিয়েই তা প্রত্যাখ্যান করেছেন।
কূটনৈতিক আলোচনার সম্ভাবনা সত্ত্বেও আবারও হামলা শুরু করা না–করা প্রশ্নে ডোনাল্ড ট্রাম্প আগের মতোই কঠোর অবস্থান বজায় রেখেছেন। হামলা আবার শুরু হবে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘তারা যদি খারাপ কিছু করে, তাহলে সেটা আবারও ঘটার সম্ভাবনা আছে।’
আগের শান্তি প্রস্তাবগুলোতে কী ছিল
ইরানে গত মাসে কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতির এক দিন আগে তেহরান একটি ১০ দফা শান্তি প্রস্তাব দিয়েছিল। সেখানে আঞ্চলিক সংঘাতের অবসান, হরমুজ প্রণালি দিয়ে নিরাপদ চলাচলের নিশ্চয়তা, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও পুনর্গঠনের মতো বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত ছিল। রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ইসলামিক রিপাবলিকের প্রতিবেদন থেকে এমন তথ্য জানা গেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তখন বলেছিলেন, ইরানের ১০ দফা ‘গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব’, তবে ‘যথেষ্ট ভালো নয়’।
২৫ মার্চ যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি করা ১৫ দফা পরিকল্পনার জবাবে গত ৭ এপ্রিল ইরান এ প্রস্তাব দিয়েছিল।
ওয়াশিংটনের ওই পরিকল্পনায় এক মাসের যুদ্ধবিরতির কথা উল্লেখ ছিল। তাতে বলা হয়েছিল, এ সময়ের মধ্যে দুই পক্ষ পাকিস্তানের মাধ্যমে যুদ্ধের অবসান নিয়ে আলোচনা করবে।
ইসরায়েলের চ্যানেল টুয়েলভের তথ্য বলছে, প্রস্তাবে নাতাঞ্জ, ইস্পাহান ও ফোরদোতে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো ভেঙে ফেলা, ইরানের পক্ষ থেকে কখনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার স্থায়ী অঙ্গীকার, ইতিমধ্যে সমৃদ্ধ করা ইউরেনিয়ামের মজুত আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থার (আইএইএ) কাছে হস্তান্তর, জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে ইরানের অবশিষ্ট পারমাণবিক অবকাঠামোর সব অংশ পর্যবেক্ষণের অনুমতি দেওয়া, হরমুজ প্রণালি আবারও চালু করা এবং ইরানের ওপর থেকে সব নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার মতো বিষয়গুলো ছিল। এ ছাড়া এতে জাতিসংঘের সেই ব্যবস্থার অবসান করার কথা বলা হয়েছিল, যার মাধ্যমে আবারও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা যায়।
তবে ইরান এই পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যান করেছিল। তারা বলেছিল, অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে পুনর্গঠিত হয়ে আবারও হামলা চালানোর সুযোগ করে দেবে। এর পরিবর্তে তারা তাদের ১০ দফা পরিকল্পনা প্রস্তাব করেছিল।
বর্তমানে পরিস্থিতি কী
যুদ্ধবিরতি চলতে থাকলেও ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) শনিবার বলেছে, হামলার জবাব দিতে তারা সম্পূর্ণ প্রস্তুত আছে। কারণ, আগের চুক্তিগুলো মানার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে অনীহা দেখেছিল তারা।
গতকাল রোববার আইআরজিসির গোয়েন্দা শাখা এক্সে দেওয়া এক পোস্টে লিখেছে, ‘এটার অর্থ একটাই, তা হলো ট্রাম্পকে এখন অসম্ভব এক সামরিক অভিযান পরিচালনা অথবা ইরানের সঙ্গে একটি খারাপ চুক্তির মধ্য থেকে যেকোনো একটিকে বেছে নিতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে বিকল্প সুযোগগুলো কমে এসেছে।’
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর থেকে হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ রেখেছে তেহরান। এতে বিশ্বজুড়ে তেল ও গ্যাসের দাম গেছে বেড়ে।
ইরানকে চাপ দিতে গত ১৩ এপ্রিল সব ইরানি বন্দরে অবরোধ আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র। এতে তেল ও গ্যাস–সংকট আরও তীব্র হয়। শুক্রবার আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ছিল প্রতি ব্যারেল ১১১ দশমিক ২৯ ডলার, যা যুদ্ধ শুরুর আগে ছিল ৬৫ ডলারের মতো।
ট্রাম্প সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধকে ‘খুব লাভজনক ব্যবসা’ বলার পর উত্তেজনা আরও বেড়েছে।
ট্রাম্প ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বলেন, ‘আমরা পণ্যবাহী যান দখল করেছি। তেল দখল করেছি। এটি একটি খুব লাভজনক ব্যবসা। কে ভাবতে পেরেছিল যে আমরা জলদস্যুর মতো আচরণ করব! আমরা কিন্তু কোনো খেলা খেলছি না।’
এই মন্তব্যের পর ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এটিকে ‘জলদস্যুতার এক নিন্দনীয় স্বীকারোক্তি’ বলে আখ্যা দেয়।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক প্রতিষ্ঠান কুইন্সি ইনস্টিটিউট ফর রেসপনসিবল স্টেটক্রাফটের বিশ্লেষক ত্রিতা পারসি আল–জাজিরাকে বলেন, ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ ট্রাম্পের জন্য হিতে বিপরীত হয়েছে এবং পরিস্থিতিকে আরও নাজুক করছে।
ত্রিতা পারসি বলেন, ‘আলোচনা চলছিল এবং অবরোধ থাকুক বা না থাকুক, তা চলতে পারত।’
পারসি আরও বলেন, ‘নৌ অবরোধ ইরানকে আলোচনার টেবিলে বসাতে কোনো ভূমিকা রাখেনি। বরং উল্টো এটি কূটনৈতিক অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করছে।’
তাঁর মতে, নৌ অবরোধ আরোপের আগে ট্রাম্প কূটনৈতিকভাবে সবচেয়ে শক্তিশালী অবস্থানে ছিলেন। যদি তিনি সেই অবস্থায় সময়কে কাজে লাগাতেন, তাহলে ইরানের বিপরীতে তিনি অনেক শক্ত অবস্থানে থাকতেন।
ট্রাম্প জ্বালানিসংকট মোকাবিলায় একটি নৌ চলাচল বিষয়ক জোট গঠনসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়েও ভাবছেন। এর নাম হতে পারে মেরিটাইম ফ্রিডম কন্সট্রাক্ট (এমএফসি)। এর উদ্দেশ্য হবে হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা।
যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, এই জোটের মূল কাজ হবে সদস্যদেশগুলোর মধ্যে গোয়েন্দা তথ্য ভাগাভাগি করা, কূটনৈতিক সমন্বয় করা এবং নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করে প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা।



