মার্কিন নৌ-অবরোধ আর যুদ্ধের দ্বিমুখী চাপে ইরানের অর্থনীতিতে স্মরণকালের ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে এসেছে। বুধবার খোলাবাজারে মার্কিন ডলারের বিপরীতে ইরানি মুদ্রার (রিয়াল) মান কমে নতুন রেকর্ড গড়েছে। বর্তমানে এক ডলার কিনতে ব্যয় করতে হচ্ছে ১৮ লাখ রিয়ালের বেশি।
মুদ্রার মানের পতন
মার্কিন বার্তা সংস্থা এপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বুধবার অনানুষ্ঠানিক বাজারে প্রতি ডলারের বিনিময় হার ১.৮২ মিলিয়ন (১৮ লাখ ২০ হাজার) রিয়ালে পৌঁছেছে। অথচ চলতি মাসের শুরুতে এই হার ছিল ১.৫৬ মিলিয়ন। কারেন্সি ট্র্যাকার নেভাসানের তথ্যমতে, যুদ্ধের প্রথম দুই মাস রিয়ালের মান তুলনামূলক স্থিতিশীল ছিল। গত ফেব্রুয়ারির শেষে এই হার ছিল ১.৬৬ মিলিয়ন এবং মার্চ শেষে ছিল ১.৫৫ মিলিয়ন। সোমবার থেকে মুদ্রার এই মান পুনরায় দ্রুত কমতে শুরু করেছে, যা ইরানে ভয়াবহ মুদ্রাস্ফীতি সৃষ্টি করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
একাধিক বিনিময় হার ও সরকারি অবস্থান
ইরান বর্তমানে বেশ কয়েকটি বিনিময় হার পরিচালনা করছে। কাগজে-কলমে সরকারিভাবে ডলারের দাম ৪২ হাজার রিয়ালে আটকে রাখা হলেও তা বাজারের প্রকৃত পরিস্থিতির সঙ্গে সংগতিহীন। রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য আমদানির জন্য সরকার ২ লাখ ৮৫ হাজার রিয়াল ভর্তুকি হার নির্ধারণ করেছে। তবে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরের খোলাবাজারে চিত্রটা সম্পূর্ণ ভিন্ন।
কেন এই বিপর্যয়?
রিয়ালের এই নজিরবিহীন পতনের পেছনে মূল কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে ইরানের ওপর আরোপিত মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ও সম্প্রতি কার্যকর হওয়া নৌ-অবরোধকে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কর্মকর্তাদের দীর্ঘমেয়াদি অবরোধের প্রস্তুতি নিতে নির্দেশ দিয়েছেন। এক মার্কিন কর্মকর্তার ভাষ্যমতে, এই কৌশলের লক্ষ্য হলো ইরানের অর্থনীতিকে ‘গুঁড়িয়ে দেওয়া’।
কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে ইরান বিধিনিষেধ আরোপ করার পর চলতি মাসের শুরুতে ওয়াশিংটন এই অবরোধ কার্যকর করে। উল্লেখ্য, বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেলের এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালি দিয়েই পরিবাহিত হয়। রয়টার্সের তথ্যমতে, যুদ্ধের আগে এই পথ দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ১৩০টি জাহাজ চলাচল করলেও অবরোধের পর তা কমে মাত্র সাতটিতে দাঁড়িয়েছে।
তেহরান মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক সংবাদমাধ্যম আল-মনিটরের প্রতিনিধি জানিয়েছেন, দক্ষিণ উপকূলীয় বন্দর দিয়ে তেল রফতানি ও জরুরি পণ্য আমদানি বাধাগ্রস্ত হওয়ায় ইরানের অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা প্রকট হয়ে উঠেছে। গত এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছিল, যুদ্ধে ইরানের প্রায় ২৭০ বিলিয়ন (২৭ হাজার কোটি) ডলারের ক্ষতি হয়েছে।
কূটনৈতিক ব্যর্থতা ও নতুন নিষেধাজ্ঞা
৮ এপ্রিল একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও দীর্ঘমেয়াদি কোনও চুক্তিতে পৌঁছাতে পারেনি ওয়াশিংটন ও তেহরান। ১১ এপ্রিল পাকিস্তানে সর্বশেষ দফা আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এর মধ্যেই ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরও কঠোর করেছে। মঙ্গলবার মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ ৩৫টি প্রতিষ্ঠানকে নিষিধাজ্ঞার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছে, যারা ইরানের কোটি কোটি ডলারের অবৈধ লেনদেনে সহায়তা করছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
রিয়ালের এই পতন অবশ্য দীর্ঘদিনের প্রক্রিয়ার অংশ। ২০১৮ সালের মাঝামাঝি সময়ে প্রতি ডলারের দাম ছিল ৮০ হাজার রিয়াল। ওই বছর পারমাণবিক চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সরে আসার পর থেকেই পতন শুরু হয়। ২০২৬ সালের শুরুতে ডলারের দাম দাঁড়ায় ১.৪ মিলিয়ন রিয়ালে।
গণবিক্ষোভ ও রক্তক্ষয়ী দমনপীড়ন
মুদ্রার এই অবমূল্যায়ন ইরানে চরম রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি করেছে। গত ডিসেম্বরে ডলারের বিপরীতে রিয়ালের মান ১৩ লাখ ৪০ হাজারে পৌঁছালে দেশজুড়ে বড় ধরনের প্রতিবাদ ও দাঙ্গা শুরু হয়। গত কয়েক বছরের মধ্যে এটিই ছিল সবচেয়ে বড় গণবিক্ষোভ। তবে কঠোর সরকারি দমনপীড়নের মুখে তা একসময় স্তিমিত হয়ে আসে।
মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্ট নিউজ এজেন্সি’র ফেব্রুয়ারি মাসের তথ্য অনুযায়ী, ওই বিক্ষোভে অন্তত ৭ হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে প্রায় ৬ হাজার ৫০০ জন বিক্ষোভকারী এবং ২০০ জন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য রয়েছেন।



