মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধে জ্বালানি সংকট: বিদ্যুৎ দাম বাড়ানোর পথ নয়, উৎপাদন খরচ কমানোর বিকল্প
মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধে জ্বালানি সংকট: বিদ্যুৎ দাম বাড়ানোর পথ নয়

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ও জ্বালানি সংকট: বিদ্যুৎ দাম বাড়ানোর পথে সরকার

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ সরকার বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে। নির্বাচনের পর বর্তমান সরকার আগামী অন্তত দুই বছর বিদ্যুতের দাম না বাড়ানোর অঙ্গীকার করেছিল। কিন্তু সম্প্রতি অর্থমন্ত্রীকে আহ্বায়ক করে উচ্চপর্যায়ের একটি মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন করা হয়েছে, যা বিদ্যুতের দাম পুনর্নির্ধারণের কাজ করছে। বিদ্যুৎ বিভাগের প্রস্তাবে বাসাবাড়িতে বিদ্যুতের দাম ব্যবহারভেদে ৭ দশমিক ৮ থেকে ২০ দশমিক ১১ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। পাইকারি পর্যায়েও দাম বাড়ানোর তিনটি বিকল্প প্রস্তাব তৈরি করা হয়েছে।

ভর্তুকি কমানোর যুক্তি ও বাস্তবতা

মূল্যবৃদ্ধির পেছনে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ভর্তুকি কমিয়ে সরকারি ব্যয়ের বোঝা কমানো এবং আইএমএফের শর্ত পূরণের কথা বলা হচ্ছে। তবে ভর্তুকি কমানোর জন্য মূল্যবৃদ্ধিই একমাত্র উপায় নয়; উৎপাদন খরচ কমিয়েও ভর্তুকি কমানো সম্ভব। এছাড়া ভর্তুকি কোথায় যাচ্ছে, তার যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

ভর্তুকি দেওয়ার মূল কারণ হলো, আমদানিনির্ভর ও ব্যয়বহুল জ্বালানিভিত্তিক বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র (আইপিপি) থেকে বেশি দামে বিদ্যুৎ কিনতে হচ্ছে পিডিবিকে। এই সমস্যা মধ্যপ্রাচ্য সংকটের আগেও ছিল, যুদ্ধের কারণে ভর্তুকির চাপ আরও বেড়েছে। ভর্তুকির অর্থের বড় অংশ ব্যয় হচ্ছে ক্যাপাসিটি চার্জের পেছনে। জ্বালানি সংকটে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার একটি বড় অংশ সারা বছর অব্যবহৃত থাকে, কিন্তু পিডিবিকে চুক্তি অনুসারে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হয়। প্রতিবছর বেসরকারি খাতে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ক্যাপাসিটি চার্জের পরিমাণ বেড়েছে, ফলে পিডিবির লোকসানও বেড়েছে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকার দেড় দশকে পাইকারি পর্যায়ে ১২ বার ও খুচরা পর্যায়ে ১৪ বার বিদ্যুতের দাম বাড়ালেও লোকসান ও ভর্তুকি কমেনি।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

টেকসই সমাধান: উৎপাদন খরচ কমানো

ভর্তুকি কমানোর জন্য বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি কোনো টেকসই পথ নয়। টেকসই সমাধানের জন্য উৎপাদন খরচ কমাতে হবে। সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যে উৎপাদন খরচ কমাতে বেসরকারি খাতের কাছ থেকে বিদ্যুৎ ক্রয়ের অসম চুক্তিগুলো সংশোধন করে ক্যাপাসিটি চার্জের বোঝা কমাতে হবে। এ ক্ষেত্রে পাকিস্তানের উদাহরণ উল্লেখযোগ্য। পাকিস্তান সম্প্রতি আইপিপির সঙ্গে চুক্তি বাতিল ও সংশোধন, ডলারের বদলে রুপিতে বিদ্যুতের দর নির্ধারণ এবং রিটার্ন অন ইকুইটি কমানোর মতো পদক্ষেপ নিয়েছে। ফলে ১৪টি আইপিপির সঙ্গে চুক্তি সংশোধনের মাধ্যমে ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি রুপি সাশ্রয় হয়েছে।

পাকিস্তান দ্রুত সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়িয়েছে, যার ফলে জ্বালানি আমদানি ব্যয় কমেছে। ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত পাকিস্তানের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ সমপরিমাণ সৌরবিদ্যুতের সক্ষমতা গড়ে উঠেছে, যা এলএনজি ব্যবহার কমিয়ে প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলারের জ্বালানি আমদানি এড়াতে সাহায্য করেছে।

বাংলাদেশের করণীয়

বাংলাদেশেও আইপিপিগুলোর সঙ্গে চুক্তি বাতিল ও সংশোধন করে, চুক্তিগুলোকে ‘টেক অ্যান্ড পে’ মডেলে রূপান্তর করে, বিদ্যুতের দাম ডলারের বদলে টাকায় নির্ধারণ করে এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির সক্ষমতা বৃদ্ধি করে বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ কমানো সম্ভব। বিগত অন্তর্বর্তী সরকার এ বিষয়ে কিছু করতে পারেনি, তবে আওয়ামী লীগ আমলের বিদ্যুৎ চুক্তি পর্যালোচনার জন্য একটি কমিটি গঠন করেছিল, যা তাদের প্রতিবেদনে অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে বেশি দরে বিদ্যুৎ ক্রয় ও ক্যাপাসিটি চার্জ দেওয়ার সমস্যা তুলে ধরেছে। কমিটির সুপারিশ হলো, দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া চুক্তি বাতিল এবং উচ্চ ব্যয়ের চুক্তি পুনরায় আলোচনার মাধ্যমে সংশোধন করা।

বর্তমান বিএনপি সরকারের উচিত ছিল দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই দুর্নীতি ও অনিয়মে জর্জরিত চুক্তি বাতিল বা সংশোধনের মাধ্যমে ব্যয় হ্রাসের উদ্যোগ নেওয়া। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে এটি আরও জরুরি হয়ে পড়েছে। কিন্তু সরকার মূল্যবৃদ্ধির বিষয়ে কমিটি গঠন করে ভুল পথে হাঁটছে।

ইতিমধ্যে লোডশেডিংয়ে জনজীবন বিপর্যস্ত। সরকার জ্বালানির পর্যাপ্ত মজুতের কথা বললেও বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানি দেওয়া যাচ্ছে না। পেট্রলপাম্পগুলোতে দীর্ঘ লাইন, কৃষকেরা সেচের ডিজেলের জন্য হাহাকার করছেন। সরকার ইতিমধ্যে ডিজেল, অকটেন, পেট্রল ও কেরোসিনের দাম বাড়িয়েছে। এ অবস্থায় বিদ্যুতের দাম বাড়ানো ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’। বিদ্যুতের বাড়তি দামের প্রভাব পুরো অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়বে এবং মূল্যস্ফীতিকে উসকে দেবে।

সরকারকে এখন সিদ্ধান্ত নিতে হবে—ভর্তুকি কমাতে বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির সহজ কিন্তু অর্থনীতির জন্য বিপর্যয়কর পথ বেছে নেবে, নাকি উৎপাদন খরচ কমানোর কঠিন কিন্তু টেকসই পথ বেছে নেবে।