একবার আমরা অটোরিকশা করে নিউ জলপাইগুড়ি রেলস্টেশন থেকে শিলিগুড়ি শহরে যাচ্ছিলাম। তখন ঢাকা থেকে শিলিগুড়িতে মিতালি ট্রেন চলাচল করতো। আমার ছেলে যেহেতু দার্জিলিংয়ে পড়ে, তো আমাকে প্রায়ই শহরটিতে যেতে হয়। আমরা দেখলাম, হঠাৎ মাঝপথে অটোরিকশাটি থেমে গেলো। ভেবেছিলাম হয়তো কোনও যান্ত্রিক সমস্যা। কিন্তু না। চালক তার শার্টের পকেট থেকে একটি রুটি বের করলেন। রাস্তার ধারে বসে থাকা একটি গরুর সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। তাকে প্রণাম করলেন। এরপর রুটিটা খাওয়ালেন।
প্রথমবার আমরা অবাক হয়েছিলাম। এখন আর হই না। কারণ ভারতের বিভিন্ন শহরের মাঠে-ঘাটেই শুধু নয়, সড়ক মহাসড়ক থেকে শুরু করে যেখানে-সেখানে দেখা যায় গরুর অবাধ বিচরণ। নাহ, দড়ি দিয়ে বাঁধা থাকে না গরুগুলো। বড়জোর কারও কারও গলায় বাঁধা থাকে কেবল একটা করে ঘণ্টি। বেশিরভাগ সময় মহাসড়ক দিয়ে চলার রাস্তায় ঠিক মাঝখানে গরুকে বসে থাকতে দেখেছি। কেউ তাদের তাড়িয়ে দিচ্ছে না। বরং গাড়ি, বাস, জিপ, রিকশা, প্রাইভেটকার, এমনকি ট্রাককেও দেখেছি তাদের সাইড দিয়ে ধীরে ধীরে পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছে। কখনও কখনও তারা রাস্তা পার হয়। গাড়ি থেমে যায়। রাস্তার মাঝখানেই প্রাকৃতিক কর্ম করে যায়। কেউ কিছুই বলে না। কী অবাধ স্বাধীনতা!
এই দৃশ্যগুলো দেখে মনে হতে পারে, আহারে এ দেশে গরুদের যদি এতটা স্বাধীনতা থাকে, তাহলে মানুষের মর্যাদা না জানি কত বেশি! আসলে কি তাই? ভারতে স্বাধীনতার সংজ্ঞা সবার জন্য কি সমান?
গরু ও রাজনীতির উত্থান
ভারতে গরু নিয়ে আবেগ নতুন নয়। কিন্তু গত দেড় দশকে এই আবেগকে নতুন ভাষা দেওয়া হয়েছে—রাজনৈতিক ভাষা। ‘গো-রক্ষা’ এখন শুধু ধর্মীয় অনুভূতি নয়, এটি একটি পরিচয়, যার নাম রাজনীতি। আর এই দেড় দশক ধরে ভারত শাসন করছে নরেন্দ্র মোদির ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। ২০১৪ সালে মোদি যখন প্রধানমন্ত্রী হন, তখন তার দলের দখলে ছিল মাত্র ৭টি রাজ্য। আর ২০২৬ সালে এসে বিজেপি বা তাদের নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোট ২১টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে ক্ষমতায় আছে। অর্থাৎ এক দশকে বিজেপির প্রভাব প্রায় তিনগুণ বিস্তৃত হয়েছে।
এই বিস্তার শুধু রাজনৈতিক সংগঠনের শক্তির গল্প নয়। এটি একটি ধারণার বিস্তারও। সেই ধারণার নাম হিন্দুত্ববাদ। বিজেপির হিন্দুত্ববাদ মতবাদের প্রচারণা সমর্থকদের কাছে সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণ, আর সমালোচকদের কাছে একটি রাজনৈতিক প্রকল্প। এই প্রকল্পের কেন্দ্রে উঠে এসেছে কিছু প্রতীক। তার মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী সম্ভবত গরু।
অনেক পর্যবেক্ষকের মতে, ধীরে ধীরে এই প্রতীককে ঘিরে একটি নতুন সামাজিক মনস্তত্ত্ব তৈরি হয়েছে। যেখানে ‘গরু’ শুধু একটি প্রাণী নয়, বরং ‘আমরা’ আর ‘ওরা’র সীমারেখা টানার একটি সূক্ষ্ম উপায়। যারা আগে একই হাটে ব্যবসা করতো, একই চায়ের দোকানে বসতো, এই দেড় দশকে তাদের মধ্যেও এখন এক অদৃশ্য দূরত্ব তৈরি হয়েছে।
একসময় গ্রামের হিন্দু কৃষক তার বৃদ্ধ গরুটি বিক্রি করতেন পাশের মুসলিম ব্যবসায়ীর কাছে। সেটি ছিল সাধারণ অর্থনৈতিক লেনদেন। এখন সেই একই কৃষক চারপাশে তাকান, কেউ দেখছে? কেউ ছবি তুলছে না? কেউ তাকে গরুবিরোধী বলবে না তো? মুসলিম ব্যবসায়ীও আগের মতো নিশ্চিন্তে দরদাম করেন না। তার মধ্যেও ভয়—রাস্তার মধ্যে কেউ থামাবে না তো? পিটিয়ে মেরে ফেলবে না তো?
বাজার একই আছে, মানুষও একই আছে। বদলেছে তাদের মানসিকতা। তবে এই পরিবর্তনকে সবাই একইভাবে দেখেন না। সমর্থকদের মতে, এটি কেবল সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের পুনঃপ্রতিষ্ঠা। সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের বিশ্বাস দীর্ঘদিন উপেক্ষিত ছিল—এখন তা জায়গা পাচ্ছে। সমালোচকদের মতে, এটি একটি সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক কৌশল। যেখানে ধর্মীয় প্রতীক ব্যবহার করে ভোটব্যাংককে সংগঠিত করা হচ্ছে।
পশ্চিমবঙ্গে গরু কোরবানি নিষেধাজ্ঞা
পশ্চিমবঙ্গের কথাই ধরা যাক। বিধানসভা নির্বাচনের ফল ঘোষণা হলো ৪ মে। বিজেপি সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলো। পশ্চিমবঙ্গে প্রথম বিজেপির মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে ৯ মে শপথ নিলেন শুভেন্দু অধিকারী। এর প্রায় সপ্তাহ দুয়েক বাদেই মুসলিমদের বড় ধর্মীয় অনুষ্ঠান ঈদুল আজহা। আর এই ঈদের ঐতিহ্যই হলো কোরবানি। এশিয়ায় ছাগল, ভেড়ার পাশাপাশি গরুও কোরবানি দেয় মুসলিম সম্প্রদায়। এই বিধানসভা নির্বাচনের আগেও সেখানে মুসলিমরা গরু কোরবানি দিতে পারতেন। কারণ পশ্চিমবঙ্গ ঐতিহাসিকভাবে ভারতের সেই অল্প কয়েকটি রাজ্যের একটি, যেখানে সম্পূর্ণ গরু জবাই নিষিদ্ধ ছিল না, বরং নির্দিষ্ট শর্তসাপেক্ষে অনুমোদিত ছিল।
পশ্চিমবঙ্গে পশু জবাই নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত ১৯৫০ সালের আইনে পশুর বয়স, স্বাস্থ্য ও সার্টিফিকেটের বিধান কাগজে-কলমে ছিল। এমনকি ২০১৮ সালে (মোদির আমলে) কলকাতা হাইকোর্টও প্রকাশ্য স্থানে গরু জবাই ও আইনবহির্ভূত কোরবানি না দেওয়ার নির্দেশ দেয়। কিন্তু এই আইনগুলো এতদিন পুরো পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক ইস্যু ছিল না। কিন্তু শুভেন্দু অধিকারী ক্ষমতায় আসার পরই সামনে আনেন এই দুটি আইনকে। যেন এমন একটা সুযোগের অপেক্ষাতেই ছিলেন তিনি। গো-মাতা রক্ষার নামে তিনি ১৯৫০ সালের আইন ও ২০১৮ সালের আদালতের নির্দেশনা পুনরায় কার্যকর করার ঘোষণা দেয়। শুধু কার্যকর নয়, আইন দুটির প্রয়োগে কড়াকড়ি আরোপ করেন তিনি। নজরদারি বাড়ান।
এর ফলে শুধু ধর্মীয় অনুশীলনই নয়, গবাদিপশু ব্যবসাও কিন্তু প্রভাবিত হয়েছে। আর এই ব্যবসার সঙ্গে শুধু মুসলিম নয়, বহু হিন্দু খামারি ও ব্যবসায়ীও জড়িত। শুভেন্দু অধিকারীর ঘোষণার পরপরই পুরো পশ্চিমবঙ্গে গরুর খামারি ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে এক ধরনের হাহাকার পড়ে যায়। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর স্বাভাবিকভাবেই সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা বেড়েছে। ফলে তারা নিশ্চয়ই আইনের বাইরে কিছু করার সাহস পাচ্ছে না। কিন্তু একাধিক ভিডিও ও নিউজে দেখা গেছে, কোরবানির অল্প সময় আগে নয়া মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষণায় তারা ক্ষুব্ধ হয়েছেন। কারণ তাদের অনেকেই কেবল কোরবানি উপলক্ষেই খামার করেন। অনেকে ঋণ নিয়ে গরু কিনেছেন। হয়তো বছরখানেক বা ছয় মাস পর, কোরবানিতে বিক্রি করবেন এই আশায়। গরু বিক্রি করতে না পেরে তারা প্রায় পথে বসছেন।
অর্থনীতি ও দ্বৈত বাস্তবতা
ভারত বৃহত্তর অর্থনীতির দেশ। এসব ছোটখাটো ব্যবসায়ীর লোকসানে তাদের তেমন কিছু যায় আসে না। কিন্তু যেকোনও দেশেরই সাধারণ মানুষ আসলে চলে পেটেভাতে। প্রশ্ন জাগে, যে হিন্দুত্ববাদের আবেগ দিয়ে একের পর এক রাজ্য জয় করা যাচ্ছে, সাধারণ মানুষের পেটে টান পড়লে কি শুধু সেই আদর্শ দিয়ে তাদের ক্ষোভ ঠেকিয়ে রাখা যাবে? কারণ বাজার যখন সংকুচিত হয়, ক্ষতির বোঝা একপাক্ষিক থাকে না। প্রশ্নটা তখন ধর্মের থাকে না। অর্থনীতির হয়ে যায়।
এখানে আরেকটি বিষয় উল্লেখযোগ্য—সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিশ্লেষণ অনুযায়ী ভারত বর্তমানে বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম ‘বাফেলো মিট’ রফতানিকারক দেশ। ২০২৫ সালে ভারতের ‘বাফেলো মিট’ রফতানি প্রায় ১.৭ মিলিয়ন টনে পৌঁছানোর পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল। যদিও এর বেশিরভাগই আসলে মহিষের মাংস। কিন্তু অধিকাংশ দেশে একে বিফই বলা হয়। তো দেখা যাচ্ছে, ভারতে ‘গো মাতা রক্ষা’ বলতে মূলত গরুকেই বোঝানো হয়। মহিষ সেই সুরক্ষার বাইরে রয়ে গেছে। ফলে একদিকে গরু নিয়ে আবেগ তুঙ্গে, অন্যদিকে মহিষের মাংস বৈধভাবে বাজারে ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে চলতে থাকে—এ যেন এক অদ্ভুত দ্বৈত বাস্তবতা।
গত ডিসেম্বরেই আমরা কলকাতায় গিয়েছিলাম। সেখানে মারকুইস স্ট্রিটের একটা হোটেলে ছিলাম। হোটেল থেকে হাঁটা দূরত্বের মধ্যে গরুর মাংস পাওয়া যায়—এমন রেস্টুরেন্টে গিয়েছিলাম। কী ভিড়! টেবিল পেতে লাইনে দাঁড়াতে হয়। বহু বছরের পুরোনো সেই রেস্টুরেন্টগুলো কি এখন বন্ধ হয়ে যাবে?
পশ্চিমবঙ্গে যেদিন নির্বাচনের ফল ঘোষণা হলো—সেদিনও আমরা শিলিগুড়ি ছিলাম। দোকানপাট, হোটেল-রেস্টুরেন্ট সব বন্ধ। মাত্র একটি মুসলিম হোটেল খোলা পেয়েছিলাম। কিন্তু ফলাফল ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে তাদের মাথায় হাত দিতেও দেখেছিলাম। একটা হোটেল বা রেস্টুরেন্ট তো গুটিকয়েক লোকজন দিয়ে চলে না। আর মুসলিম হোটেলের সবাই মুসলিমও হয় না। তো এসব হোটেল-রেস্টুরেন্ট বন্ধ হলে বহু হিন্দুও চাকরি হারাবে নিশ্চয়।
তো একটি দেশের রাজনীতি যখন ধীরে ধীরে প্রতীকের ওপর দাঁড়াতে শুরু করে, তখন কি বাস্তব সমস্যাগুলো আড়ালে চলে যায়? বেকারত্ব, মূল্যস্ফীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য—এই প্রশ্নগুলো কি তখন আর আগের মতো কেন্দ্রে থাকে? নাকি সেগুলোকে ছাপিয়ে যায় আবেগ, পরিচয় আর প্রতীকের রাজনীতি?
পশ্চিমবঙ্গে ঈদের আগে ফলাফল ঘোষণা হওয়ায়, বিজেপি তার হিন্দুত্ববাদ প্রচারে এবং গরু কোরবানিতে কড়াকড়ি আরোপ করে বেশ ভালো একটা দান মারতে পেরেছে। কিন্তু ঈদ তো শেষ। পরের ঈদের জন্য অপেক্ষা এক বছরের। এই সময়ে কোন বিষয় নিয়ে রাজনীতি করবেন শুভেন্দু অধিকারী? আগামী দিনে তার এই রাজনীতির পরবর্তী ধাপের ওপর নির্ভর করছে পশ্চিমবঙ্গ ও তার মানুষদের ভবিষ্যৎ। এর ওপর নির্ভর করছে বাংলাদেশের সঙ্গে তাদের সম্পর্কটা কেমন হবে—তার মেরুকরণও।
লেখক: সাইকোলজিস্ট



