স্বর্ণগর্ভা জননীর করুণ পরিণতি: সন্তানের অবহেলায় মায়ের লাশে পোকা
স্বর্ণগর্ভা জননীর করুণ পরিণতি: সন্তানের অবহেলায় মায়ের লাশে পোকা

এক মা। ছেলে তাঁর যুগ্ম সচিব, আরেক ছেলে বুয়েটের শিক্ষক। অপর ছেলেও উচ্চশিক্ষিত ও কানাডা প্রবাসী। মেয়ে একটা স্কুল টিচার। বিয়ে দিয়েছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের সঙ্গে। এমন মাকে স্বর্ণগর্ভা জননী বলাই যায়। সান-সৌকতেই থাকার কথা তাঁর। কিন্তু নির্মম বাস্তবতা। ৭৫ বছর বয়সের এই মহিলা নিজ কক্ষে কবে কখন যে মরে পচতে শুরু করেছেন কেউ জানে না। ৯৯৯ নম্বরে ডাক পেয়ে পুলিশ এসে দেখে, লাশে পোকা ধরেছে। দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ও যুগ্ম সচিবের মায়ের লাশ থেকে। পুলিশ যখন লাশ সরাতে ঘরে ঢুকে, নজর পড়ে ঘর যেন নয়, পুরো একটা ডাস্টবিন। ডাস্টবিনের মধ্যেই পড়ে আছে একজন মানুষের মৃতদেহ।

শিক্ষিত পরিবারের বিচ্ছিন্নতা

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকের কাছে তাঁর ভাইয়ের বর্তমান ফোন নম্বরটিও নেই, বোন মানসিক ভারসাম্য হারিয়েছেন বলেও সংবাদে প্রকাশ। নূরজাহান বেগমের দুই সন্তানই ডক্টরেট ডিগ্রি হোল্ডার এবং দুজনই বুয়েট থেকে বেরিয়েছেন। সঙ্গত কারণেই এমন একটি শিক্ষিত পরিবারের এই হাল কেন, প্রশ্ন আসতে পারে। এমন বিচ্ছিন্নতা কি অবশ্যম্ভাবী ছিল ওই পরিবারের জন্য? কেন এমন হলো? ঠিক কোন কারণে এমন অবস্থা ওই পরিবারের বিষয়টি হয়তো খোঁজ না নিয়ে বলা যাবে না। কিন্তু এমন পরিস্থিতি হওয়ার পেছনের কারণগুলো দেখা যেতে পারে।

পারিবারিক ধ্বসের কারণ

সোজা কথায় এবং প্রথম কারণ হিসেবে বলতে হবে— পারিবারিক জীবনে এমন ধ্বস নামে সাধারণত যৌথ পরিবার ভেঙে যাওয়ার কারণে। এবং অতিরিক্ত আত্মকেন্দ্রিক দম্পতি হওয়ার কারণে। আর শীর্ষে ওঠার অশুভ এবং অপরিকল্পিত প্রতিযোগিতার জন্য। অনুমান করা যায়, এগুলোর একটি কিংবা একাধিক কারণ ঘটতে পারে মৃত নূরজাহান বেগমের পরিবারে। যে কারণে সন্তানেরা মাকেও অবহেলা করেছে নিজের শুধু নিজের ভাবনায় ব্যস্ত থেকে। আবার এ ঘটনা থেকে আমাদের ভাবনায় আসতে পারে— যে মায়ের লাশে পোকা ধরার পরও স্বাভাবিক অবস্থায় দাফন সম্ভব হলো না, যে লাশে পচন ধরেছে, সেই লাশ কিন্তু একটি সমাজেরও চিত্র হয়ে যেতে পারে। কিংবা বলা যায়, সমাজ যেন সেদিকেই এগিয়ে যাচ্ছে। একটু বেশি বেশি মনে হলেও এমন আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ আছে বলে মনে করি না।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বাঙালির চিরায়ত সংস্কৃতি বনাম আধুনিক প্রতিযোগিতা

অথচ বাঙালির চিরায়ত সংস্কৃতি হচ্ছে ভ্রাতৃত্ববোধ। ভালোবাসার বন্ধন ছিল পরিবার থেকে সমাজে। একে অন্যের সুখে দুঃখে ছিল ভাগিদার। সেই বন্ধন ছিন্ন হতে থাকে অর্থনীতির চাকায় ভর করায়। একটা অশুভ প্রতিযোগিতায় নেমে পড়ে মানুষ। প্রতিযোগিতার লক্ষ্য— বিত্তের প্রাচুর্য, ক্ষমতা এবং প্রভাব। এই তিন চাহিদা পূরণে মানুষ এতটাই নিমগ্ন হয়, যেখানে পারিপার্শিক অবস্থা দেখার মানসিকতাই বিলুপ্ত হয়ে যায়। যন্ত্রের মতো সে চলতে থাকে সামনের দিকে এবং গন্তব্য সেই তিনটি লক্ষ্য। কামিনী রায়ের সেই কবিতা— ‘সকলের তরে সকলে মোরা, প্রত্যেকে মোরা পরের তরে।’ সেই বোধ সম্পূর্ণ অচল হয়ে পড়ে মানুষের কাছে।

শিক্ষা ও প্রতিযোগিতার চক্র

লক্ষ্যগুলো অর্জনের প্রতিযোগিতায় এখন কী দেখা যাচ্ছে? মা পাগলের মতো ছুটেন সন্তানকে নিয়ে স্কুলে। বাসায় ফিরে নাকেমুখে কিছু গিলে ছোটেন কোচিং সেন্টারের দিকে। ফেরেন সন্তানের হাত ধরে। চোখ কান খোলা রাখেন সন্তান যেন এদিক ওদিকও না তাকায়। বাসায় ফিরে পড়ার তাগাদা। নাওয়া খাওয়াতেও একই চাপ, খাও মাথা (মেধা) ভালো রাখতে খেতে হবে। চামুচ দিয়ে ঠেসে ঠুসে খাওয়ানোই যেন মায়ের কর্তব্য। বাবা বাসায় ফিরেন রাত করে, কারণ তার হাতে সময় নেই। ছেলে-মেয়েদের প্রথম হওয়া নিশ্চিত করতে কাড়ি কাড়ি টাকা দরকার। টাকার পেছনে দৌড়াতে গিয়ে দিন শেষ বিকেল শেষ। সন্ধায় বাসায় ফিরে গা চলে না ক্লান্তিতে। সন্তান থাকে পড়ার টেবিলে স্ত্রী থাকেন রান্না ঘরে আর সন্তান পড়ার টেবিলে বসে বইয়ের পাতা উল্টায়। সময়ের চাকা ঘুরে চলে, স্থান পাল্টায় কিন্তু ওই মা-বাবা আর তাদের সন্তানদের জীবন ঘড়ির কাঁটা সেই ১২টা থেকে ১২টা। একটু এদিক ওদিক হওয়ার জো নেই। বাচ্চাদের জীবনও সেই পড়ার টেবিলনির্ভর।

আত্মকেন্দ্রিকতার ফল

মায়ের অক্লান্ত পরিশ্রম আর বাবার চেষ্টায় সন্তানরা ঠিক ওই স্বর্ণগর্ভা মায়ের সন্তান হয়। প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা দিয়ে কেউ হয় যুগ্ম সচিব কিংবা বুয়েটের মতো প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক। তারাও মায়ের শেখানো জীবনকেই জীবন বলে মনে করেন। সমাজ বিচ্ছিন্ন এই উচ্চশিক্ষিত সন্তানেরা এতটাই আত্মকেন্দ্রিক হয়ে পড়েন যে, এক ভাই আরেক ভাইয়ের সঙ্গে কথা-বার্তা-আড্ডার সুযোগও পান না। সেই প্রতিযোগিতাই চালিয়ে যান তাদের কর্মজীবনে। সেই একই লক্ষ্য ক্যারিয়ার হোক উচ্চে ওঠার সিঁড়ি। যে মানুষটি নিজের ভাইবোনের খবর রাখার মতো চিন্তাও করে না, সেই মানুষটি কি আর কামিনী রায়ের সেই কবিতা মনে মনে রাখার প্রয়োজন বোধ করে?

পুঁজিবাদী অর্থনীতির প্রভাব

পুঁজিবাদী অর্থনীতির প্রভাবে ওই যে অশুভ প্রতিযোগিতায় যুক্ত হয়ে আত্মকেন্দ্রিক হয়ে পড়ছে। এর প্রভাব ব্যক্তি থেকে ব্যক্তিতে সংক্রমিত হচ্ছে। নিজেকে ছাড়া অন্য কারও দিকে তাকানোর সুযোগ থাকছে না। এর উদাহরণ এই ঢাকা শহরে অনেক। নিচতলা কিংবা ওপরতলার অধিবাসী একই লিফ্টে ওঠানামা করে প্রতিদিন, কিন্তু কারও সঙ্গে কারও কথাবার্তা নেই। এমনকি একই বাড়িতে কেউ মারা গেলেও অনেকেই জানে না। নতুন প্রজন্মের কাছে এই প্রবণতা বেড়ে গেছে প্রযুক্তির সুবাদে। একটু সময় পেলেই মোবাইল হাতে বসে পড়ে সোফায় কিংবা বিছানায়। অন্য কারও খবর নেওয়ার সময় কোথায়? গোটা সমাজই যেন প্রতিবন্ধী।

গণমাধ্যমের ভূমিকা ও সমাজের দায়

নূরজাহান বেগমের করুণ মৃত্যুর সংবাদ বিষয়ে ছোট করে বলি। এই সংবাদটি আমাদের গণমাধ্যমগুলো প্রকাশকালে ওই মহিলা যাদের হাতে নিগৃহীত হলেন, যে সন্তানেরা তাকে শুধু অবহেলাই দিয়েছে— সেই সন্তানদের নাম প্রকাশ করেনি, অন্তত আমি একাধিক নিউজ পোর্টালে দেখলাম একই ভাষায় সংবাদ হয়েছে। হয়তো এথিক্স এর কথা বলবেন কেউ। অহেতুক দোষ দেওয়ার প্রয়োজন নেই। যিনি এমন যোগ্য (!) সন্তানের মা, যারা মা মারা গেলেন নাকি বেঁচে আছেন সেই খবরও রাখেন না, তাদের নাম প্রকাশেও আপত্তি কেন? তাহলে কি পরবর্তী সময় কোনও শিল্পপতি, অভিনেতা কিংবা লেখকের সন্তান খুন করলে, অমুকের সন্তান খুন করেছে— এভাবে সংবাদ লেখা বন্ধ হবে? অপরাধীর কারণে তার বাবা-মা কিংবা অভিভাবকের গায়েও কালির দাগ লাগানো বন্ধ হবে? হলে ভালো। তবে যে যুগ্ম সচিব কিংবা অধ্যাপকের মা অবহেলায় ঘরে পড়ে থাকেন— এমন যোগ্য সন্তানদের সম্পর্কে মানুষের উৎসাহ থাকতেই পারে।

প্রতিরোধের উপায়

ইতোমধ্যে সেই স্বর্ণগর্ভা মায়ের সন্তানদের নাম ঠিকানা প্রকাশও হয়ে যেতে পারে। কিন্তু যে সামাজিক ক্ষত তৈরি হলো তার রেশ থাকবে দীর্ঘদিন। প্রতিরোধের উপায় কী? নিজের স্বার্থ রক্ষায় উন্মাদ হওয়া মানুষগুলোকে আবার সমাজবদ্ধ এবং দায়বদ্ধ মানুষের কাতারে আনার কাজটি অত্যন্ত কঠিন। কারণ তাদের গড়ে উঠাটাই এর বিপরীত। তাদের বোঝাতে হবে আত্মকেন্দ্রিক মানুষেরা সবকিছুতে সফল হতে পারে। কিন্তু একটা সময় আসে, যখন সে নিজের কাছেই হেরে যায়। এই বোধটা যদি সমাজে না আসে— তাহলে নূরজাহান বেগমদের সংখ্যা বাড়বেই শুধু। লেখক: সাংবাদিক, শিশুসাহিত্যিক ও মুক্তিযুদ্ধ গবেষক।