ইসরায়েলের আঞ্চলিক আধিপত্য বিস্তার ও সামরিক আগ্রাসনের মুখে মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ায় এক নতুন মেরুকরণ শুরু হয়েছে। পাকিস্তান, মিসর, তুরস্ক ও সৌদি আরব মিলে একটি শক্তিশালী নিরাপত্তা জোট গঠনের দিকে এগোচ্ছে বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই সম্ভাব্য জোট ভবিষ্যতে এই অঞ্চলের ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখতে ‘ইসলামি ন্যাটো’র ভূমিকা পালন করতে পারে।
সামরিক মহড়া ও কূটনৈতিক সমন্বয়
কিছু দিন আগে পাকিস্তানে মিসরীয় ও পাকিস্তানি বিশেষ বাহিনীর মধ্যে দুই সপ্তাহব্যাপী যৌথ সামরিক মহড়া শেষ হয়েছে। এটি নতুন কিছু না হলেও সময়কালটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। গত বছরের সেপ্টেম্বরে কাতারের দোহায় ইসরায়েলি বিমান হামলার পর থেকেই এই চার দেশের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ ও সমন্বয় বেড়েছে।
মিসরীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষক ইসলাম মানসি বলেন, ‘দোহার ওপর হামলার পর আরব দেশগুলো বুঝতে পেরেছে যে তারাও ইসরায়েলি আক্রমণ থেকে নিরাপদ নয়।’ অন্যদিকে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর শুরু হওয়া যুদ্ধ এই দেশগুলোর কৌশলগত চিন্তায় বড় পরিবর্তন এনেছে। পশ্চিম তীর দখল এবং লেবানন ও সিরিয়ায় ইসরায়েলি আগ্রাসন ‘বৃহত্তর ইসরায়েল’ গঠনের ভয়কে আরও উস্কে দিয়েছে।
প্রতিরক্ষা চুক্তি সম্প্রসারণ
সম্প্রতি পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ এক টেলিভিশন অনুষ্ঠানে জানিয়েছেন, সৌদি আরবের সঙ্গে পাকিস্তানের বিদ্যমান প্রতিরক্ষা চুক্তিতে কাতার ও তুরস্ককেও অন্তর্ভুক্ত করার প্রক্রিয়া চলছে। তিনি বলেন, ‘যদি কাতার ও তুরস্ক এই চুক্তিতে যোগ দেয়, তবে তা একটি ইতিবাচক ঘটনা হবে।’
আঙ্কারাভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক টেপাভ-এর কৌশলবিদ নিহাত আলি ওজকান জানান, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো এখন বুঝতে পারছে যে শুধু যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভর করে নিজেদের জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করা সম্ভব নয়। ওয়াশিংটন সব সময় নিজের এবং ইসরায়েলের স্বার্থকেই প্রাধান্য দেয়।
জোটের সম্ভাব্য প্রভাব ও চ্যালেঞ্জ
এই চারটি দেশ মিলে একটি জোট গঠিত হলে তার প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী। এই জোটের সম্মিলিত জনসংখ্যা হবে প্রায় ৫০ কোটি এবং মোট জিডিপি হবে ৩.৮৭ ট্রিলিয়ন ডলার। সৌদি বিশ্লেষক ওমর সাইফ বলেন, এই দেশগুলোর স্বতন্ত্র সামরিক সক্ষমতা ইসরায়েলের আঞ্চলিক উচ্চাকাঙ্ক্ষায় লাগাম টানতে সক্ষম। গত ১৭ এপ্রিল তুরস্কে অনুষ্ঠিত আন্তালিয়া ডিপ্লোম্যাসি ফোরামের ফাঁকে এই চার দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠক সেই লক্ষ্যেই একটি বড় পদক্ষেপ ছিল।
তবে এই জোট গঠনের পথে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। তুরস্ক, মিসর ও সৌদি আরবের মধ্যে দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক তিক্ততা মাত্র গত কয়েক বছরে কাটতে শুরু করেছে। এ ছাড়া সৌদি আরব ও মিসরের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘস্থায়ী কৌশলগত ও সামরিক অংশীদারত্ব রয়েছে। ওয়াশিংটন এই চার দেশকে ইসরায়েলের বিপক্ষে যায় এমন কোনও আনুষ্ঠানিক জোট গড়তে দেবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
তুর্কি বিশ্লেষক ফিরাস রিদওয়ান ওগলু অবশ্য ভিন্ন মত পোষণ করেন। তার মতে, এ ধরনের জোট মধ্যপ্রাচ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য তৈরি করে মূলত আরেকটি আঞ্চলিক যুদ্ধের ঝুঁকি কমিয়ে দেবে, যা পরোক্ষভাবে যুক্তরাষ্ট্রেরও কাম্য।
সূত্র: এনডিটিভি, নিউ আরব আল-মনিটর



