যুক্তরাষ্ট্রের পতন: ইতিহাসের শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ
যুক্তরাষ্ট্রের পতন: ইতিহাসের শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ

মার্টিন উলফের বিশ্লেষণে ফুটে উঠেছে, ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর যুক্তরাষ্ট্র যে বৈশ্বিক ব্যবস্থা গড়ে তুলেছিল, তা বর্তমানে ভেঙে পড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব অবস্থানও সংকটে। ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটছে, যেখানে ১৯১৪ সালের আগের বিশ্ব পরিস্থিতির প্রতিধ্বনি শোনা যাচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের উত্থান ও পতনের ইতিহাস

বিংশ শতকে যুক্তরাষ্ট্র সর্বজয়ী ছিল। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর দেশটি প্রতিদ্বন্দ্বীহীন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়। সাংবিধানিক সরকার ও মুক্তির মূল্যবোধ সঞ্চার করে দেশটি বিশ্বনেতৃত্বের আসনে বসে। কিন্তু এই অবস্থান দীর্ঘস্থায়ী হয়নি।

যুক্তরাষ্ট্রের উত্থানের মূল ভিত্তি স্থাপিত হয় উনবিংশ শতকের মাঝামাঝি। ইউরোপীয় শক্তিগুলো, বিশেষ করে যুক্তরাজ্য, তখন বিশাল সাম্রাজ্য ও বাষ্পীয় শক্তির মাধ্যমে বিশ্ব শাসন করত। দ্বিতীয় শিল্পবিপ্লবের সময় (১৯১৪ সাল পর্যন্ত) যুক্তরাষ্ট্র রসায়ন, বিদ্যুৎ, দূরালাপন, ওষুধ, জ্বালানি, বেতার ও উড়োজাহাজের ক্ষেত্রে অগ্রগতি অর্জন করে। এই অগ্রগতি বিশ্বায়নের পথ সুগম করে এবং যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত করে (১৯১৪ সালে)।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপের প্রভু হয়ে ওঠে। কিন্তু শান্তিপ্রক্রিয়াকে সমর্থনের পর দেশটি নিজেকে সরিয়ে নেয়, যার ফলে শান্তি অপ্রয়োগযোগ্য হয়ে পড়ে। অভ্যন্তরীণ সংকট, মূল্যস্ফীতি ও বেকারত্ব মহামন্দার দিকে ধাবিত করে, যা শেষ পর্যন্ত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের জন্ম দেয়।

ঠান্ডা যুদ্ধ ও সোভিয়েত পতনের পরের বিশ্ব

ঠান্ডা যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপে সম্পৃক্ত থাকে। সোভিয়েত কমিউনিজমের সঙ্গে প্রতিযোগিতার প্রেরণায় দেশটি ইউরোপে গণতান্ত্রিক ঐক্য গড়ে তোলে। অবাধ মুক্তবাজার হারিয়ে গিয়ে নিয়ন্ত্রিত পুঁজিবাদ প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৮০-এর দশকের 'নয়া উদারতাবাদের' বিপ্লবের পরও ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রিতই থাকে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

১৯৮৯-১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও তার সাম্রাজ্যের পতনের পর যুক্তরাষ্ট্র ফ্যাসিবাদ, সমাজতন্ত্র, জার্মানি, জাপান, ব্রিটিশ সাম্রাজ্য ও সোভিয়েত ইউনিয়নের ওপর জয়ধ্বনি ঘোষণা করে। এক মেরুর বিশ্ব সূচিত হয়। কিন্তু মাত্র ৩৫ বছরের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্যকারী ভূমিকা উধাও হয়ে যায়, যেমনটি হয়েছিল যুক্তরাজ্যের ক্ষেত্রে ১৯০০ সালের মধ্যে।

পতনের তিনটি প্রধান কারণ

যুক্তরাষ্ট্রের পতনের পেছনে তিনটি প্রধান কারণ চিহ্নিত করেছেন মার্টিন উলফ: চীনের উত্থান, ডিজিটাল বিপ্লব ও দক্ষিণপন্থী জনতুষ্টিবাদের জয়জয়কার।

চীন ১৯৭০-এর দশকে রাশিয়ার সঙ্গে সখ্য সীমিত করে এবং দেং জিয়াওপিংয়ের 'সংস্কার ও খুলে দেওয়া' নীতি গ্রহণ করে। এক শতাব্দী পর প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্র একটি সমকক্ষীয় প্রতিযোগীর মুখোমুখি হয়। ডিজিটাল বিপ্লব বিশ্বায়নকে ত্বরান্বিত করে, কিন্তু সংহতিনাশক তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি আর্থিক সংকট ও গণহারে অভিবাসন সংকট ডেকে আনে। দক্ষিণপন্থী জনতুষ্টিবাদ লিঙ্গ, গোত্র ও পরিচয়ের চাহিদা দ্বারা চালিত হয়ে রক্ষণশীল ও জাতীয়তাবাদী প্রতিবিপ্লব সৃষ্টি করে।

বর্তমান সংকট ও ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ

যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০তম জন্মদিনের প্রাক্কালে দেশটি নিজে সংকটে নিপতিত হয়েছে। প্রশাসন দুর্নীতিগ্রস্ত ও অদক্ষ হয়ে গেছে। স্বাধীনতার ঘোষণায় জুলুমকারী ও নির্যাতকদের থেকে মুক্তি ঘোষণা করা হয়েছিল, কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্প তাদেরই একজন হতে চান। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতার স্তম্ভগুলো—আইনের শাসন, বিশ্বসেরা বিজ্ঞান, আস্থাবান মিত্রকুল এবং অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা—কর্তন করছেন।

দুই দশক ধরে বিশ্বে গণতন্ত্র উল্টোপথে হাঁটছে। ভি-ডেমের হিসাব অনুসারে, এখন বিশ্বের মাত্র ৭ শতাংশ মানুষ উদার গণতন্ত্রের মধ্যে বাস করছে। সি চিন পিং তো হাসতেই পারেন!

বর্তমান চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে রয়েছে বৈশ্বিক পরিবেশ সংকট, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো বিপ্লবী প্রযুক্তির প্রভাব এবং নিরঙ্কুশ স্বৈরশাসন বনাম গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ। ১৯১৪ সালের আগের কয়েক বছরের অবস্থার প্রতিধ্বনি করছে বর্তমান বিশ্ব।

ভালো ও খারাপ খবর

ভালো খবর হলো, পারমাণবিক অস্ত্র বৃহৎ শক্তিগুলোর মধ্যে যুদ্ধের হুমকি কমিয়ে দিয়েছে। কোনো বড় শক্তি আজ আর বিংশ শতকের প্রথম দিকের মতো সামরিকবাদে আক্রান্ত নয়। প্রায় সব সরকারই তাদের জনগণের সমৃদ্ধি সাধনে গুরুত্ব দেয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর অতুলনীয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সর্বত্রই আরও বেশি সমৃদ্ধির চাহিদা উৎসাহিত করেছে।

খারাপ খবর হলো, আমরা এখন একগুচ্ছ চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছি, যা একযোগে মোকাবিলা করতে হবে। বৈশ্বিক পরিবেশ সংকট, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাব এবং স্বৈরশাসন বনাম গণতন্ত্রের প্রশ্ন ঘুরেফিরে আসছে। ৩৫ বছর আগে সোভিয়েত স্বৈরতন্ত্রের পতনের পর আমরা যে দুনিয়ার আশা করেছিলাম, তা মুছে যাচ্ছে। একই সঙ্গে অন্তত কিছু সময়ের জন্য হলেও যুক্তরাষ্ট্রও।

আমরা ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিই। কিন্তু হায়, আমরা আবার তা ভুলেও যাই।