ট্রাম্পের স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন ভাষণে একাধিক মিথ্যা দাবি, সিএনএনের ফ্যাক্ট চেক প্রকাশ
ট্রাম্পের ভাষণে মিথ্যা দাবি, সিএনএনের ফ্যাক্ট চেক

ট্রাম্পের স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন ভাষণে একাধিক মিথ্যা দাবি, সিএনএনের ফ্যাক্ট চেক প্রকাশ

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গতকাল মঙ্গলবার কংগ্রেসে বার্ষিক স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন ভাষণ দিয়েছেন। এই ভাষণে তিনি বিনিয়োগ, জ্বালানিমূল্য, মূল্যস্ফীতি, করছাড় ও অন্যান্য অর্থনৈতিক সূচক নিয়ে বেশ কয়েকটি দাবি করেন। তবে সিএনএনের ফ্যাক্ট চেক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ট্রাম্পের অনেক দাবিই বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না বা অতিরঞ্জিত।

বিনিয়োগ ও জ্বালানিমূল্য সংক্রান্ত মিথ্যা দাবি

ট্রাম্প দাবি করেছেন যে তিনি দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব নেওয়ার পর ১৮ লাখ কোটি ডলারের বিনিয়োগ নিশ্চিত করেছেন। কিন্তু হোয়াইট হাউসের তথ্য অনুযায়ী, প্রকৃত বিনিয়োগের পরিমাণ মাত্র ৯ লাখ ৭০ হাজার কোটি ডলার। হোয়াইট হাউস অস্পষ্ট প্রতিশ্রুতি ও বাণিজ্যিক আদান-প্রদানকে বিনিয়োগ হিসেবে গণনা করেছে বলে সিএনএনের অক্টোবর পর্যালোচনায় উঠে এসেছে।

জ্বালানিমূল্য প্রসঙ্গে ট্রাম্প বলেছেন, অধিকাংশ অঙ্গরাজ্যে গ্যাসের দাম গ্যালনপ্রতি ২.৩০ ডলারের নিচে। কিন্তু আমেরিকান অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য মতে, গতকাল কোনো অঙ্গরাজ্যে গড় দাম ২.৩৬ ডলারের নিচে ছিল না। মাত্র ৪টি স্টেশন ২ ডলারের কম দরে জ্বালানি বিক্রি করছে, যা মোট স্টেশনের ০.০০০০৩ শতাংশ মাত্র।

মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ভুল তথ্য

ট্রাম্পের দাবি, তিনি যখন গত বছর ভাষণ দেন, তখন দেশে রেকর্ড মূল্যস্ফীতি চলছিল। কিন্তু বাস্তবে বাইডেনের মেয়াদের শেষ মাসে মূল্যস্ফীতি ছিল ২.৯ শতাংশ, আর ট্রাম্পের দায়িত্ব নেওয়ার সময় ৩ শতাংশ। ২০২২ সালের সর্বোচ্চ ৯.১ শতাংশ মূল্যস্ফীতি ১৯২০ সালের রেকর্ড থেকে অনেক কম।

অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি প্রসঙ্গে ট্রাম্প বলেছেন, বাইডেন প্রশাসন স্থবির অর্থনীতি রেখে গিয়েছিল এবং এখন তা গতি ফিরে পেয়েছে। কিন্তু ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ট্রাম্পের মেয়াদে প্রবৃদ্ধির হার ২.২ শতাংশ, যা বাইডেনের সময়কার যেকোনো বছরের তুলনায় কম। ২০২৪ সালে প্রবৃদ্ধি ছিল ২.৮ শতাংশ।

করছাড় ও অভিবাসন সংক্রান্ত বিভ্রান্তিকর দাবি

ট্রাম্প দাবি করেছেন যে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় করছাড় দিয়েছেন। কিন্তু কংগ্রেসিয়াল বাজেট অফিসের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই করছাড়ের পরিমাণ ১০ বছরে ৪ লাখ ৮০ হাজার কোটি ডলার, যা জিডিপির ১.৩ শতাংশ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি ১৯১৮ সালের পর সপ্তম বৃহত্তম করছাড়, সবচেয়ে বড় নয়।

অভিবাসন প্রসঙ্গে ট্রাম্প বলেছেন, বাইডেন প্রশাসন ১১,৮৮৮ হত্যাকারীকে যুক্তরাষ্ট্রে ঢুকতে দিয়েছে। কিন্তু হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের তথ্য মতে, এই সংখ্যা বছরের পর বছর ধরে ঢোকার সব বিদেশির হিসাব, শুধু বাইডেনের সময়ের নয়। এতে ট্রাম্পের নিজের প্রথম মেয়াদের হিসাবও অন্তর্ভুক্ত।

শুল্ক, জালিয়াতি ও নির্বাচন সংক্রান্ত ভুল তথ্য

ট্রাম্পের দাবি, বিদেশি পণ্যের ওপর তাঁর আরোপিত শুল্ক বিদেশি দেশগুলো দিচ্ছে। কিন্তু নিউইয়র্ক ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৯০ শতাংশ শুল্কের বোঝা যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসায়ী ও ভোক্তাদের ওপর পড়েছে।

মিনেসোটায় সোমালিদের জালিয়াতি সংক্রান্ত দাবিও ভিত্তিহীন। ফেডারেল প্রসিকিউটর ৯০০ কোটি ডলার জালিয়াতির আশঙ্কা প্রকাশ করলেও, ট্রাম্প ১,৯০০ কোটি ডলারের কথা বলেছেন এবং তিনি এটাও বলেননি যে শুধু সোমালিরাই এতে জড়িত।

নির্বাচন প্রসঙ্গে ট্রাম্প ভোট জালিয়াতির ব্যাপকতা ও ডাকযোগে ভোটকে কারচুপিপূর্ণ বলে দাবি করেছেন। কিন্তু গবেষণা বলছে, ভোট জালিয়াতির হার অত্যন্ত সামান্য এবং ডাকযোগে ভোটে জালিয়াতি খুবই কম ঘটে।

কর্মসংস্থান ও যুদ্ধ থামানোর অতিরঞ্জিত দাবি

ট্রাম্প দাবি করেছেন, এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি মানুষ কাজ করছেন। সংখ্যাগতভাবে এটি সত্য হলেও, কর্মসংস্থান ও জনসংখ্যার অনুপাত দেখলে ট্রাম্পের মেয়াদে এ হার সামান্য কমেছে। বেকারত্বের হারও ৪ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪.৩ শতাংশ হয়েছে।

আটটি যুদ্ধ থামানোর দাবিও অতিরঞ্জিত। ট্রাম্প কিছু সংঘাত কমাতে ভূমিকা রাখলেও প্রকৃত অর্থে আটটি যুদ্ধ থামানোর কোনো প্রমাণ নেই। উদাহরণস্বরূপ, মিসর-ইথিওপিয়া বিরোধ একটি যুদ্ধ নয়, বরং কূটনৈতিক বিরোধ।

সামাজিক নিরাপত্তা ও বাজেটঘাটতি সংক্রান্ত মিথ্যা দাবি

ট্রাম্প বলেছেন, তিনি সামাজিক নিরাপত্তার ওপর কর তুলে দিয়েছেন। কিন্তু বাস্তবে বিগ, বিউটিফুল বিলে ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সীদের জন্য অস্থায়ী করছাড় চালু করা হয়েছে, যা ২০২৮ সালে শেষ হবে। ৬৫ বছরের নিচের ব্যক্তিরা এই সুবিধা পাচ্ছেন না।

জালিয়াতি বন্ধ করলেই বাজেটঘাটতি শূন্য হবে এমন দাবিও ভিত্তিহীন। সর্বশেষ অর্থবছরে ফেডারেল বাজেটঘাটতি ছিল প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার কোটি ডলার, যা জালিয়াতির আনুমানিক ক্ষতির তিন গুণের বেশি।

সিএনএনের এই ফ্যাক্ট চেক বিশ্লেষণে ট্রাম্পের ভাষণের একাধিক দাবির সত্যতা যাচাই করে দেখা গেছে, অনেক ক্ষেত্রেই তাঁর বক্তব্য বাস্তব তথ্যের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।