ওয়াশিংটনের হিলটন হোটেলে গুলির ঘটনা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। আরেকটি বড় ধরনের নিরাপত্তা–সম্পর্কিত ঘটনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকার মাত্র কয়েক ঘণ্টা পর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমি কল্পনাও করতে পারি না যে এর চেয়ে বিপজ্জনক আর কোনো পেশা আছে।’
সিক্রেট সার্ভিসের একটি বড়সড় দল প্রেসিডেন্টকে তর্কসাপেক্ষে বিশ্বের সবচেয়ে সুরক্ষিত ব্যক্তিতে পরিণত করলেও, তাঁকে নিরাপদ রাখার কাজটা সহজ হচ্ছে না। প্রথমে ২০২৪ সালের গ্রীষ্মে পেনসিলভানিয়ার বাটলারের ট্রাম্পকে হত্যাচেষ্টার ঘটনা ঘটেছিল। ওই সময় একটি বুলেট তাঁর কান স্পর্শ করে চলে যায়। এর ঠিক ৬৪ দিন পর ফ্লোরিডার গলফ কোর্সে খেলার সময় তিনি আবারও এক সম্ভাব্য আততায়ীর লক্ষ্যবস্তু হন। আর এখন দেশটির রাজধানীর হিলটন হোটেলে গুলির ঘটনা হোয়াইট হাউস করেসপনডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের নৈশভোজের আনন্দ-উল্লাস স্তব্ধ করে দেয়। এর কয়েক ঘণ্টা পর ট্রাম্পের নিরাপত্তা আবারও নিবিড় পর্যবেক্ষণের মুখে পড়েছে।
নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন
সন্দেহভাজন বন্দুকধারী ৩১ বছর বয়সী কোল টমাস অ্যালেনের উদ্দেশ্য এবং নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তু এখনো অস্পষ্ট। তবু একজন বন্দুকধারী কীভাবে প্রেসিডেন্টের এত কাছাকাছি পৌঁছাতে পারলেন, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। ওয়াশিংটনের প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ, কূটনীতিক এবং সাংবাদিকদের আতিথেয়তা দেওয়া ওই হোটেলের তল্লাশি বা স্ক্রিনিং ব্যবস্থা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। নৈশভোজে উপস্থিত থাকা বিবিসির উত্তর আমেরিকা অঞ্চলের প্রধান সংবাদদাতা গ্যারি ও’ডনোহিউ বলেন, ওয়াশিংটনে হিলটনের চারপাশের রাস্তাগুলো কয়েক ঘণ্টা ধরে বন্ধ থাকলেও অনুষ্ঠানস্থলের নিরাপত্তাব্যবস্থা ‘এত বেশি জোরদার ছিল না’। গ্যারি লিখেছেন, ‘দরজার বাইরে থাকা ব্যক্তিটি প্রায় ছয় ফুট দূর থেকে আমার টিকিটের দিকে কেবল একপলক তাকিয়েছিলেন।’ ট্রাম্পের সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করা সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, সন্দেহভাজন ব্যক্তি বলরুমের ওপরের তলায় অবস্থিত সিক্রেট সার্ভিসের একটি তল্লাশিচৌকি ভেদ করে দ্রুতবেগে ঢুকে পড়ছেন। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তাঁর কাছে একটি শটগান, একটি হ্যান্ডগান এবং একাধিক ছুরি ছিল।
ওয়াশিংটনে নিযুক্ত সাবেক ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত কিম ডেরক এর আগে করেসপনডেন্টস ডিনারগুলোতে অংশ নিয়েছেন। তিনি নিরাপত্তাব্যবস্থার সমালোচনা করেছেন। বিবিসির ‘সানডে উইথ লরা কুয়েন্সবার্গ’ অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ‘আপনি যদি সেখানে (হোটেল অতিথি হিসেবে) থাকতেন এবং এই অনুষ্ঠানে ঢুকে পড়ার কোনো অসৎ উদ্দেশ্য আপনার থাকত, তবে আপনাকে কেবল একটি নিরাপত্তা বাধা পার হতে হতো...এবং এরপরই আপনি বলরুমে ঢুকে পড়তে পারতেন।’ গ্রেপ্তার হওয়ার আগে ওই ব্যক্তি কর্মকর্তাদের সঙ্গে গোলাগুলিতে জড়ান। সিএনএনের উলফ ব্লিৎজার সংবাদমাধ্যমটিকে জানিয়েছেন, তিনি সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে একটি ‘খুবই শক্তিশালী’ অস্ত্র ব্যবহার করে কয়েক দফা গুলি করতে দেখেছেন। প্রেসিডেন্ট পরে মেঝেতে উপুড় হয়ে শুয়ে থাকা খালি গায়ের এক ব্যক্তির ছবি পোস্ট করেন। তাঁর হাত দুটি পেছন থেকে হাতকড়া দিয়ে আটকানো ছিল। আর চারপাশে সিক্রেট সার্ভিসের কর্মকর্তারা দাঁড়িয়ে আছেন।
ভারপ্রাপ্ত মার্কিন অ্যাটর্নি জেনারেল টড ব্ল্যাঞ্চ এনবিসি নিউজকে বলেন, অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে তিনি প্রশাসন কর্মকর্তাদের লক্ষ্যবস্তু করেছিলেন, এর মধ্যে ‘সম্ভবত প্রেসিডেন্টও ছিলেন’। পুলিশ জানিয়েছে, কোল টমাস অ্যালেন ওয়াশিংটন হিলটনের একজন অতিথি ছিলেন। বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর কিছু ব্যক্তি একই ভবনে থাকা সত্ত্বেও হোটেল হিসেবে সেটির কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছিল।
ট্রাম্পের বলরুমের সাফাই
ঘটনার পরে ট্রাম্প নিজেই বলেছেন, হিলটন ‘এত বেশি নিরাপদ ভবন ছিল না’। তিনি আরও বলেন, এ ঘটনাটি নির্মাণাধীন নতুন হোয়াইট হাউস বলরুমের গুরুত্বই তুলে ধরছে। এই নির্মাণকাজ নিয়ে আইন জটিলতা রয়েছে। হোয়াইট হাউস বলরুমের নিরাপত্তাব্যবস্থার কিছু দিক তুলে ধরে ট্রাম্প বলেন, ‘এটি আসলে একটি বড় কক্ষ এবং এটি অনেক বেশি নিরাপদ। এটি ড্রোন-প্রতিরোধী। এতে বুলেট-প্রুফ গ্লাস রয়েছে। আমাদের বলরুমটি প্রয়োজন।’ প্রেসিডেন্ট সিক্রেট সার্ভিসের ‘সাহসিকতার’ প্রশংসাও করেছেন। তাঁরা প্রেসিডেন্ট এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সকে মঞ্চ থেকে সরিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন। তিনি বলেন, তাঁরা ‘চমৎকার কাজ’ করেছেন।
অবশ্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবং প্রেসিডেন্টের মতো ব্যক্তিদের নিরাপত্তা নিয়ে জানাশোনা আছে এমন ব্যক্তিরা বলেছেন, বন্দুকধারীর বলরুমে প্রবেশ করতে না পারার বিষয়টিই প্রমাণ করে যে নিরাপত্তাব্যবস্থা কার্যকর ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থার (এফবিআই) সাবেক স্পেশাল এজেন্ট জেফ ক্রোগার বিবিসিকে বলেন, ‘সিক্রেট সার্ভিসকে ঠিক এই কাজের জন্যই প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।’ তিনি বলেন, গুলির শব্দ শোনার সঙ্গে সঙ্গেই তারা ‘প্রেসিডেন্টকে ঘিরে ফেলে’ একটি ‘মানব ঢাল’ তৈরি করেছিল। সাবেক সিক্রেট সার্ভিস এজেন্ট ব্যারি ডোনাডিও বিবিসিকে বলেন, অনুষ্ঠানে ‘এজেন্ট, অফিসার ও পুলিশের কোনো অভাব ছিল না’ বলে মনে হয়েছে। নিরাপত্তার ধরনে কী ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে, সে বিষয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে কয়েকজন বিশেষজ্ঞ বলেছেন, তাঁরা এখন ট্রাম্পের অনুষ্ঠানগুলোর জন্য আরও কঠোর ব্যবস্থার প্রত্যাশা করছেন। এর মধ্যে নিরাপত্তাবেষ্টনীর পরিসর আরও বাড়ানোর বিষয়টি থাকতে পারে।
রাজনৈতিক সহিংসতা বাড়ছে
এই গুলিবর্ষণ আমেরিকার রাজনৈতিক সহিংসতার সর্বশেষ ঘটনা। তথ্য–উপাত্ত অনুযায়ী এ ধরনের সহিংসতা ক্রমেই বাড়ছে। ২০২৩ সালে মার্কিন ক্যাপিটল পুলিশ ৮ হাজারের বেশি হুমকির ঘটনার তদন্ত করেছে, যা ২০১৮ সালের তুলনায় ৫০ শতাংশ বেশি। গত বছর ইউটাতে চার্লি কার্কের হত্যাকাণ্ড আমেরিকার তিক্ত রাজনৈতিক বিভাজনকে আরও স্পষ্টভাবে উন্মোচিত করেছে। এই রক্ষণশীল রাজনৈতিক ভাষ্যকার যখন ‘টার্নিং পয়েন্ট ইউএসএ’–এর একটি অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিচ্ছিলেন, তখন তাঁকে গুলি করা হয়। এই সহিংসতার ঘটনাটি ভিডিওতে ধরা পড়েছিল এবং তা ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়ে।
এর কয়েক মাস আগে মিনেসোটার সাবেক স্পিকার মেলিসা হর্টম্যান এবং তাঁর স্বামী মার্ক গুলিতে নিহত হন। একই ঘটনায় অঙ্গরাজ্য সিনেটর জন হফম্যান এবং তাঁর স্ত্রী ইভেটকেও একাধিকবার গুলি করা হয়েছিল। তাঁরা আহত হলেও শেষ পর্যন্ত বেঁচে যান। ২০২২ সালে প্রতিনিধি পরিষদের সাবেক স্পিকার ন্যান্সি পেলোসির স্বামী পল পেলোসি হাতুড়ি হামলার শিকার হন। মাথার খুলি ফেটে যাওয়ায় তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। ২০১৭ সালে ভার্জিনিয়াতে কংগ্রেসনাল বেসবল গেমের জন্য আইনপ্রণেতারা যখন অনুশীলন করছিলেন, তখন রিপাবলিকান স্টিভ স্ক্যালিস এবং আরও চারজন ব্যক্তি গুলিতে আহত হন।
প্রেসিডেন্টকে হত্যাচেষ্টার অন্যান্য ঘটনার মধ্যে রোনাল্ড রিগ্যানকেও নিশানা করা হয়েছিল। তাঁকে ১৯৮১ সালে জন হিঙ্কলি জুনিয়র গুলি করে আহত করেছিলেন। গুলিতে রিগ্যানের ফুসফুস ছিদ্র হয়ে গিয়েছিল, তবে তিনি বেঁচে যান। এই গোলাগুলির ঘটনাটিও ঘটেছিল ওয়াশিংটন হিলটনের বাইরে—সেই একই হোটেল, যেখানে শনিবারের জমকালো অনুষ্ঠানটি আয়োজন করা হয়েছিল। নিজের অনুষ্ঠানগুলোতে বারবার এ ধরনের হামলার বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে ট্রাম্প বলেন, তিনি ‘হত্যাকাণ্ড নিয়ে পড়াশোনা করেছেন’। আব্রাহাম লিংকনের মতো সাবেক প্রেসিডেন্টরাও লক্ষ্যবস্তু হয়েছিলেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেন, ‘এ তালিকায় অনেক বড় বড় নাম আছে। আমি এটা বলতে অপছন্দ করি যে সেই তালিকায় থাকায় আমি সম্মানিত বোধ করছি, কিন্তু আমি (যুক্তরাষ্ট্রের জন্য) অনেক কিছু করেছি।’



