টাকার কার্লসনের অনুশোচনা: ট্রাম্পের সমর্থনে এখন যন্ত্রণা, ইরান ইস্যুতে তীব্র মতবিরোধ
যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী রক্ষণশীল সাংবাদিক ও ভাষ্যকার টাকার কার্লসন এখন গভীর অনুশোচনায় ভুগছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের পক্ষে জোরালো সমর্থন ও পরামর্শ দেওয়ার জন্য তিনি নিজেকে দায়ী করছেন। সম্প্রতি একটি পডকাস্টে কার্লসন স্পষ্ট ভাষায় বলেন, 'ডোনাল্ড ট্রাম্পকে হোয়াইট হাউসে ফেরানোর বিষয়ে সহায়তা করার জন্য আমি দীর্ঘদিন ধরে যন্ত্রণায় ভুগব'।
ইরান ইস্যুতে তীব্র মতবিরোধের সূত্রপাত
কার্লসনের এই অনুশোচনার পেছনে মূল কারণ হলো ইরান নিয়ে ট্রাম্পের সঙ্গে তার তীব্র মতবিরোধ। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে দুই জনের মধ্যে বিবাদ চলছিল। এবারের ইস্টারে ট্রাম্প ইরানকে হুমকি দিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পোস্ট দিয়েছিলেন। তাতে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, 'ইরান যদি হরমুজ প্রণালি খুলে না দেয়, তাহলে আমি দেশটিকে নরকে পরিণত করব'।
ট্রাম্পের এই পোস্ট কার্লসনকে অত্যন্ত ক্ষুব্ধ করে তোলে। তিনি ট্রাম্পের এমন আচরণকে 'অশুভ' বলে আখ্যায়িত করেন। পাশাপাশি হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তাদের প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানান। কার্লসন দীর্ঘদিন ধরে বিদেশে মার্কিন হস্তক্ষেপের ঘোর বিরোধী। তাই ইরানে মার্কিন হামলার সম্ভাবনা তার কাছে একেবারেই গ্রহণযোগ্য নয়।
ট্রাম্পের তীব্র প্রতিক্রিয়া ও পাল্টা আক্রমণ
কার্লসনের বক্তব্যে ক্ষুব্ধ হন ডোনাল্ড ট্রাম্পও। তিনি নিজের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে পোস্ট দিয়ে কার্লসনসহ রক্ষণশীল সমালোচকদের 'বোকা' বলে গালমন্দ করেন। ট্রাম্প আরও মন্তব্য করেন যে কার্লসনের একজন ভালো মনোরোগবিশেষজ্ঞকে দেখানো দরকার। তিনি দাবি করেন, ২০২৩ সালে ফক্স নিউজ থেকে বরখাস্ত হওয়ার পর থেকে কার্লসন আর 'আগের মতো নেই'।
গত শুক্রবারও ট্রাম্প কার্লসনকে কটাক্ষ করে আরেকটি পোস্ট দেন। তাতে তিনি লেখেন, 'কার্লসন একজন স্বল্প বুদ্ধির মানুষ। তাঁকে হারিয়ে দেওয়া সহজ। তাঁকে অতিমূল্যায়ন করা হয়েছে'। হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে কার্লসনের অনুশোচনামূলক মন্তব্যের বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে ট্রাম্পের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এই পোস্টগুলোর দিকেই ইঙ্গিত করা হয়েছে।
কার্লসনের খোলামেলা স্বীকারোক্তি ও ভবিষ্যৎ প্রভাব
গত সোমবার প্রকাশিত নিজের পডকাস্টের এক পর্বে কার্লসন তার ভাই বাকলের সঙ্গে নানা বিষয়ে খোলামেলা আলোচনা করেন। এই সময় তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, 'এখন ইরানে যা ঘটছে, তার পেছনে আমি নিজেও দায়ী। আমি কারণগুলোর অংশ'। কার্লসন আরও যোগ করেন, 'শুধু এটা বলা যথেষ্ট নয় যে আমি আমার মত বদলেছি বা এটা খারাপ, আমি আর এসবে নেই'।
তিনি স্বীকার করেন যে এই সময়টাতে তাদের নিজেদের বিবেকের সঙ্গে লড়াই করতে হচ্ছে। কার্লসন বলেন, 'আমরা দীর্ঘ সময় ধরে এ নিয়ে কষ্ট পাব। আমি পাব। তাই আমি বলতে চাই, মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্য আমি দুঃখিত'। তার ভাই বাকলও একসময় ট্রাম্পের বক্তব্য লেখকের দায়িত্ব পালন করেছেন, যা এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
রাজনৈতিক মহলে প্রতিক্রিয়া ও বিতর্ক
কার্লসনের এই অনুশোচনামূলক মন্তব্যের পর রাজনৈতিক মহলে নানা প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মিত্র ও ডানপন্থী অধিকারকর্মী লরা লুমার গত সোমবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে টাকার কার্লসনের সমালোচনা করে লেখেন, 'কার্লসন দেশকে ডেমোক্র্যাটদের হাতে তুলে দেওয়ার চেষ্টা করছেন'।
এদিকে, ২০২৫ সালের বিশ্বের শীর্ষ ১০ জন কথিত 'ইহুদিবিদ্বেষী' ও 'জায়নবাদবিরোধী' ইনফ্লুয়েন্সারের তালিকা প্রকাশ করেছে ইসরায়েল সরকার। এই ১০ জনের মধ্যে ছয়জনই যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই তালিকায় কার্লসনের নামও রয়েছে। যা তার বর্তমান অবস্থান ও ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছে।
২০২৪ সালে ট্রাম্প যখন দ্বিতীয় মেয়াদে হোয়াইট হাউসে ফিরতে জোর প্রচার চালাচ্ছিলেন, তখন প্রায়ই তার পাশে দেখা যেত টাকার কার্লসনকে। তিনি ট্রাম্পকে জোর সমর্থন জানাতেন, নানা পরামর্শ দিতেন। কিন্তু এখন সেই সমর্থনের জন্য তিনি গভীর অনুশোচনায় ভুগছেন। ফক্স নিউজের সাবেক এই ভাষ্যকার, উপস্থাপক ও ইনফ্লুয়েন্সারের এই অবস্থান পরিবর্তন মার্কিন রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।



