বিগত দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে ইসরায়েল গাজা ও লেবাননসহ বিভিন্ন ফ্রন্টে নির্বিচারে ও বিপজ্জনক যুদ্ধ চালাচ্ছে, যার ফলে হাজার হাজার বেসামরিক মানুষ নিহত হচ্ছেন। কেউ কেউ একে ‘গণহত্যা’ বলেও আখ্যা দিয়েছেন। এর বিপরীতে আবার ইসরায়েলি ডানপন্থিদের দাবি, সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোকে নির্মূল করতে ইসরায়েল বড্ড বেশি সময় নিচ্ছে এবং প্রয়োজনের চেয়ে ধীরগতিতে এগোচ্ছে; তাদের উচিত দ্রুত এই কাজ শেষ করা।
ট্রাম্পের পরস্পরবিরোধী বক্তব্য
মঙ্গলবার জি-৭ সম্মেলনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একাধারে এই দুটি যুক্তিই একসঙ্গে তুলে ধরেছেন। ট্রাম্প বলেন, ইসরায়েল হিজবুল্লাহর সঙ্গে বড্ড দীর্ঘ সময় ধরে লড়াই করছে এবং এতে অনেক বেশি মানুষ মারা যাচ্ছে। কাউকেও খুঁজতে গিয়ে প্রতিবার একটি আস্ত অ্যাপার্টমেন্ট ভবন গুঁড়িয়ে দেওয়ার কোনও প্রয়োজন নেই। কারণ ওই সব ভবনে অনেক মানুষ থাকে এবং তারা সবাই হিজবুল্লাহর সদস্য নয়, তা আমি আপনাদের বলতে পারি।
এর ঠিক কয়েক মিনিট পরেই তিনি আবার বলেন, লেবানন ও হিজবুল্লাহর সঙ্গে ইসরায়েলের এই আচরণে আমি খুশি নই। তাদের আরও দ্রুত এই কাজ শেষ করা উচিত ছিল। এটি যেন চিরকাল ধরেই চলছে।
পরদিন বুধবার তিনি ইসরায়েল ও লেবানন নিয়ে আরও একটি অস্পষ্ট মন্তব্য করে বলেন, তিনি চান না হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ইসরায়েলের লড়াই শেষ হোক। তবে তিনি চান ইসরায়েল যেন আত্মরক্ষার পাশাপাশি সঠিক বিচারবুদ্ধি ব্যবহার করে।
ইসরায়েলের কঠিন পরিস্থিতি
ট্রাম্পের এই অবিচ্ছিন্ন চিন্তাভাবনার ফলে ইসরায়েল এখন এক অসম্ভব কঠিন পরিস্থিতির মুখে পড়েছে। অধিকাংশ ইসরায়েলি বিশ্লেষকেরা মনে করেন, সীমান্তে সামরিক ও কূটনৈতিক চাপের সমন্বয় ছাড়া হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করা সম্ভব নয়। কিন্তু সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত একটি সমঝোতা স্মারক লেবাননে যুদ্ধ শেষের ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। যার অর্থ দাঁড়ায়, হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ইসরায়েলি সামরিক অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের আর সমর্থন নেই। ট্রাম্পও জি-৭ সম্মেলনে লেবানন সংঘাতকে একটি গৌণ বিষয় হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যা ইরানের সঙ্গে আলোচনা থেকে মনোযোগ সরানোর কারণ হওয়া উচিত নয়।
এমন পরিস্থিতিতে ইসরায়েলকে দ্রুতই যেকোনও একটি পথ বেছে নিতে হতে পারে: হয় সামরিক চাপ বজায় রেখে ট্রাম্পের কূটনৈতিক সমর্থন হারাতে হবে, না হয় ট্রাম্পের সুনজরে থাকতে লেবানন যুদ্ধ বন্ধ বা সীমিত করতে হবে। যা অনেকের কাছে দেশের সবচেয়ে জরুরি লড়াই।
বিশেষজ্ঞদের মতামত
রিজিওনাল অর্গানাইজেশন ফর পিস, ইকোনমিকস অ্যান্ড সিকিউরিটি-র নির্বাহী পরিচালক ক্সেনিয়া সভেতলোভা বলেন, ট্রাম্প এই দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধগুলোর পক্ষে নন। তার লক্ষ্য লেবাননে কোনও যুদ্ধ না রাখা এবং ফলস্বরূপ ইরানের সঙ্গেও কোনও যুদ্ধ চালিয়ে না যাওয়া। কিন্তু ইসরায়েলের কাছে যে লক্ষ্যটি গুরুত্বপূর্ণ, তা এতে অর্জিত হচ্ছে না।
বর্তমানে ইসরায়েল কূটনৈতিক ও সামরিক দুই পথেই একসঙ্গে এগোচ্ছে। লেবাননে লড়াই অব্যাহত রয়েছে এবং ইসরায়েলি কর্মকর্তারা ওয়াশিংটনে লেবাননের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কয়েক দফা সরাসরি আলোচনাও করেছেন। তবে এরিয়েল ইউনিভার্সিটির মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক গবেষক ড্যান নাওরের মতে, এই ঐতিহাসিক সরাসরি আলোচনা হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে একটি প্রতীকী জয় হলেও এতে বড় কোনও অগ্রগতির সম্ভাবনা কম। কারণ লেবানন কেবল একটি ‘অনাক্রমণ চুক্তি’ নিয়ে কথা বলছে, কোনও শান্তি চুক্তি নয়। নাওরের মতে, হিজবুল্লাহমুক্ত লেবানন রাষ্ট্র গড়তে হলে মার্কিন কূটনৈতিক ও আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি ইসরায়েলের সামরিক চাপ অব্যাহত রাখা জরুরি।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
তবে আরব রাষ্ট্রগুলো, বিশেষ করে সৌদি আরব ইসরায়েলের এই সামরিক অভিযান দীর্ঘায়িত করার পক্ষে নয়। সভেতলোভার মতে, ট্রাম্পের বক্তব্যে সৌদি আরবের দৃষ্টিভঙ্গিই প্রতিফলিত হয়েছে, যারা লেবাননে স্থায়ী যুদ্ধবিরতি চায়। অন্যদিকে ট্রাম্পের আরেকটি প্রস্তাব ছিল, হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের দায়িত্ব সিরিয়ার ইসলামপন্থি প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারা’র হাতে ছেড়ে দেওয়া। কিন্তু এক দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা গৃহযুদ্ধের পর সিরিয়া এখন নিজের দেশ পুনর্গঠন ও আন্তর্জাতিক বৈধতা পাওয়ার লড়াইয়ে ব্যস্ত। ইসরায়েল, লেবানন ও সিরিয়ার নেতৃত্বও এই সমাধানের বিরোধী।
এই পরিস্থিতিতে সভেতলোভা মনে করেন, ইসরায়েলের উচিত প্রথমে নিজেদের রণকৌশল ঠিক করা এবং হিজবুল্লাহকে সামরিক ও কূটনৈতিকভাবে পরাজিত করার একটি স্পষ্ট পরিকল্পনা ট্রাম্পের কাছে উপস্থাপন করা। আর যদি ট্রাম্প নিজের শর্ত চাপিয়ে দিতে চান, তবে নাওরের মতে, ইসরায়েলের উচিত নিজের দেশের স্বার্থে যা সেরা, সেটাই করা, এমনকি মার্কিন প্রেসিডেন্টের অসন্তোষের ঝুঁকি নিয়ে হলেও। নাওরে বলেন, আমেরিকান বিবেচনার ওপর ভরসা করে এই যুদ্ধ এখানে থামানো যাবে না। এখানে থামার অর্থ হলো পেছনে ফিরে যাওয়া এবং যা অর্জিত হয়েছে তা হারিয়ে ফেলা।
সূত্র: টাইমস অব ইসরায়েল



