নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক টিকে থাকার কৌশল: যুদ্ধই একমাত্র অবলম্বন
ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক অবস্থানকে অনেকটা হাঙরের সাঁতারের সাথে তুলনা করা যায়। কিছু হাঙর যেমন অবিরাম সাঁতার না কাটলে বাঁচতে পারে না, তেমনি নেতানিয়াহুর ক্ষমতায় টিকে থাকার উপায় হলো যুদ্ধ ও সংঘাত। তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে এই কৌশল বারবার কাজে লেগেছে, যা বর্তমান ইরান ও লেবানন সংকটেও স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।
যুদ্ধকে রাজনৈতিক ঢাল হিসেবে ব্যবহার
নেতানিয়াহু ইরানের বিরুদ্ধে পরমাণু অস্ত্রের ভুয়া অভিযোগ তুলে যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়েছেন, যাতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সহযোগী হিসেবে পাওয়া যায়। যদিও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান ১৪ দিনের যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে, নেতানিয়াহু এতে অসন্তুষ্ট। তিনি চান যুদ্ধ চলুক, কারণ এটি তাঁর রাজনৈতিক স্বার্থে জরুরি।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির অভিযোগ, ইসলামাবাদে শান্তি আলোচনা চলাকালে নেতানিয়াহুর ফোনকলের পর পরিস্থিতি পাল্টে যায় এবং আলোচনা ভেস্তে যায়। এছাড়া, নেতানিয়াহু লেবাননে জোর হামলা চালিয়ে যাচ্ছেন, যা ইরান যুদ্ধবিরতি চুক্তির লঙ্ঘন বলে দাবি করলেও তিনি তা মানতে নারাজ।
যুদ্ধের ভয়াবহ পরিণতি ও নেতানিয়াহুর অবস্থান
এই সংঘাতে ইরানে ৩ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন, লেবাননে ২ হাজারের বেশি, এবং গাজায় ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ইসরায়েলের হামলায় ৭২ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি প্রাণ হারিয়েছেন। ৭৬ বছর বয়সী নেতানিয়াহু ইসরায়েলের সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষমতায় থাকা নেতা, যাঁর ১৮ বছরের বেশি প্রধানমন্ত্রীত্বে যুদ্ধই প্রধান হাতিয়ার।
১৯৯৬ সালে প্রথমবার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই নেতানিয়াহু যখনই সংকটে পড়েছেন, নিরাপত্তা ইস্যু ও যুদ্ধকে রাজনৈতিক ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছেন। এটি তাঁর বৈতরণী পার হওয়ার কৌশল, যা ইসরায়েলি রাজনীতিতে তাঁর টিকে থাকাকে নিশ্চিত করেছে।
বিচার এড়াতে যুদ্ধের কৌশল
নেতানিয়াহুর জন্য সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো ফৌজদারি অপরাধের মামলা। বিশ্বাসভঙ্গ, জালিয়াতি ও ঘুষগ্রহণের অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে তিনটি মামলার বিচার চলমান, যা ইসরায়েলের ইতিহাসে ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রীর জন্য প্রথম। দোষী সাব্যস্ত হলে তাঁর কারাদণ্ড নিশ্চিত, তাই তিনি মামলার বিচার বিলম্বিত করতে সদাতৎপর।
২০২০ সালে বিচার শুরু হওয়ার পর নেতানিয়াহু নানা অজুহাতে শুনানি স্থগিত রাখছেন, যেখানে যুদ্ধ তাঁর মোক্ষম হাতিয়ার। গাজা যুদ্ধকে কাজে লাগিয়ে তিনি আদালতের শুনানি দিনের পর দিন পিছিয়েছেন। ২০২৫ সালের মার্চে যুদ্ধবিরতি ভঙ্গের পর আবার বিচার স্থগিত হয়, এবং তিনি বিচারব্যবস্থা দুর্বল করার চেষ্টা চালিয়েছেন।
গত ৩০ নভেম্বর নেতানিয়াহু প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগের কাছে ক্ষমার আবেদন করেন, নিরাপত্তা ও জাতীয় স্বার্থের অজুহাত দেখিয়ে। ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর পর তিনি বিচার বন্ধের আবদার জানান, এবং যুদ্ধবিরতির পর আবার বিচার শুরুর ঘোষণা আসলে তিনি দুই সপ্তাহ স্থগিতের আবেদন করেন।
নির্বাচনী চাপ ও যুদ্ধের ভূমিকা
২০২৬ সালের ইসরায়েলি নির্বাচন সামনে রেখে জনমত জরিপে নেতানিয়াহুর অবস্থান ভালো নয়, তিনি পরাজয়ের মুখে পড়তে পারেন। এই রাজনৈতিক মৃত্যু এড়াতে তিনি মরিয়া, এবং গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান যুদ্ধ শুরু করে ট্রাম্পকে সহযোগী করেন।
চ্যাথাম হাউসের বিশেষজ্ঞ ইয়োসি মেকেলবার্গের মতে, নেতানিয়াহু ইরানের সঙ্গে যুদ্ধকে বড় বাজি হিসেবে নিয়েছেন, যা তাঁর রাজনৈতিক টিকে থাকার সম্ভাবনা বাড়াতে পারে। যদিও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলায় ইরানের শীর্ষ নেতারা নিহত হয়েছেন, সরকার অটুট আছে এবং ইরান প্রতিরোধে দৃঢ়তা দেখিয়েছে।
যুদ্ধবিরতি ও নেতানিয়াহুর পরাজয়
সাময়িক যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে নেতানিয়াহু আপাতত বাজিতে হেরে গেছেন। হিব্রু বিশ্ববিদ্যালয়ের জরিপ অনুযায়ী, মাত্র ১০ শতাংশ ইসরায়েলি এই যুদ্ধকে সফল মনে করেন, এবং নেতানিয়াহুর জনসমর্থন ৪০ শতাংশ থেকে ৩৪ শতাংশে নেমে এসেছে।
তবুও নেতানিয়াহু হাল ছাড়ছেন না। যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের মধ্যে স্থায়ী শান্তিচুক্তি ঠেকাতে তিনি সর্বাত্মক চেষ্টা চালাবেন, কারণ এই যুদ্ধের সঙ্গে তাঁর জীবন-মরণের প্রশ্ন জড়িত। তথ্যসূত্র হিসেবে রয়টার্স, এএফপি, আল-জাজিরা, বিবিসি, আরব সেন্টার ওয়াশিংটন ডিসি, এবং চ্যাথাম হাউসের প্রতিবেদন উল্লেখযোগ্য।



