ইরানে শান্তি আলোচনা ব্যর্থ, সরকার সমর্থকদের সড়ক দখল অব্যাহত রাখার আহ্বান
ইরান সরকার স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছে, চলমান যুদ্ধের অবসান ঘটাতে কোনো চুক্তি করতে হলে যুক্তরাষ্ট্রকে আরও বেশি উদ্যোগী ও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। একইসঙ্গে, তেহরান প্রশাসন নিজেদের সমর্থকদেরকে সড়ক দখল করে রাখার আহ্বান জানিয়েছে, যা ইঙ্গিত দেয় দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি উত্তপ্ত রয়েছে।
ইসলামাবাদে ব্যর্থ শান্তি আলোচনা
গত শনিবার ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে শান্তি আলোচনা অনুষ্ঠিত হয় পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে। এই আলোচনার মূল উদ্দেশ্য ছিল যুদ্ধবিরতি ও শান্তি প্রতিষ্ঠার উপায় খুঁজে বের করা। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় এই বৈঠকে অংশ নেয় তেহরান ও ওয়াশিংটনের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরা।
দুই পক্ষ প্রায় ২১ ঘণ্টা ধরে আলোচনা চালালেও কোনো ধরনের চুক্তি বা সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। এই ব্যর্থতা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি করেছে, বিশেষ করে যারা দ্রুত যুদ্ধবিরতির আশা করছিলেন।
ইরানি নেতাদের প্রতিক্রিয়া
ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ আলোচনা প্রক্রিয়ার তীব্র সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘এই দফার আলোচনায় মার্কিন প্রতিনিধিদল শেষ পর্যন্ত ইরানি প্রতিনিধিদলের আস্থা অর্জনে সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হয়েছে।’ গালিবাফ ইরানের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন এবং তাঁর বক্তব্য থেকে স্পষ্ট যে দুই দেশের মধ্যে আস্থার সংকট গভীর।
অন্যদিকে, ইরানের বিচার বিভাগের প্রধান গোলাম-হোসেন মোহসেনি-এজেই ইসলামাবাদে যাওয়া দেশটির প্রতিনিধিদলকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। তিনি দাবি করেছেন যে প্রতিনিধিরা ইরান সরকারের সমর্থকদের অধিকার রক্ষায় সফল হয়েছেন।
সড়কে সরকারপন্থীদের অবস্থান
ইরানের অভ্যন্তরে সরকারপন্থী সমর্থকরা ছয় সপ্তাহের বেশি সময় ধরে তেহরান ও অন্যান্য প্রধান শহরের চত্বর, সড়ক এবং মসজিদে জড়ো হচ্ছেন। এই সমর্থকদের মধ্যে আধা সামরিক বাহিনীর সদস্যরাও রয়েছেন, যারা প্রতি রাতে নিয়মিতভাবে অবস্থান নিচ্ছেন।
শনিবার রাতে, যখন প্রতিনিধিরা ইসলামাবাদে আলোচনায় ব্যস্ত ছিলেন, তখন ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে বিপ্লবী গার্ডের (আইআরজিসি) অ্যারোস্পেস বিভাগের একজন সদস্যকে দেখানো হয়। তিনি তেহরানের কেন্দ্রস্থলে পতাকা হাতে সমর্থকদের উদ্দেশ্যে বলছিলেন, ‘শত্রু যদি না বোঝে, আমরা তাদের বুঝতে বাধ্য করব।’
সামরিক পোশাক পরা ও কালো মুখোশধারী এই ব্যক্তির বক্তব্য শুনে ভিড় থেকে অনেকেই আইআরজিসিকে আরও বেশি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানোর জন্য চিৎকার করতে থাকেন। এই দৃশ্য ইরানের অভ্যন্তরীণ উত্তেজনার মাত্রা প্রকাশ করে।
আলোচনা ব্যর্থতার কারণ
রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, এই আলোচনার মাধ্যমে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কেবল নিজের ‘ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধার’ করতে চেয়েছিলেন, তেহরান নয়। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ট্রাম্পের ‘অতিরিক্ত দাবি’ই আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার মূল কারণ।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও স্বীকার করেছে যে মাত্র এক দিনের আলোচনায় কোনো চুক্তিতে পৌঁছানো সম্ভব হবে, এমন আশা তাদের ছিল না। এই মন্তব্য থেকে বোঝা যায়, ইরান সরকার আলোচনা প্রক্রিয়াকে দীর্ঘমেয়াদি কৌশল হিসেবে দেখছে।
ইরানি আইনপ্রণেতাদের প্রতিক্রিয়া
ইরানের একাধিক আইনপ্রণেতা আলোচনায় কোনো ফলাফল না আসায় সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তাঁদের মতে, বর্তমান যুদ্ধে ইরানই সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে, তাই কোনো চুক্তি না হওয়াই ভালো।
পার্লামেন্টের ডেপুটি স্পিকার হামিদরেজা হাজি-বাবাই স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, ‘জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে যদি কোনো প্রস্তাব আনা হয়, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য আত্মসমর্পণের ইঙ্গিত থাকবে এবং ইরান ও তার নেতাদের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করার কথা বলা হবে, কেবল তখনই সেটি সড়কে অবস্থান নেওয়া ইরান সরকারের সমর্থকদের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে।’
ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আস্থার সংকট অত্যন্ত গভীর। সরকারপন্থী সমর্থকদের সড়ক দখল অব্যাহত রাখার আহ্বান ইঙ্গিত দেয় যে তেহরান যেকোনো মূল্যে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে চায়।
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ভবিষ্যতে শান্তি আলোচনা আবারও অনুষ্ঠিত হতে পারে, কিন্তু সেটি নির্ভর করবে উভয় পক্ষের নমনীয়তার ওপর। যুদ্ধ অবসানের পথ এখনও অনিশ্চিত, এবং ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ এই প্রক্রিয়াকে আরও জটিল করে তুলছে।



