ইসরাইলে যুদ্ধের প্রতি জনসমর্থন দ্রুত কমছে, ইহুদি জনগোষ্ঠীতে ব্যাপক পতন
ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন সরকারের সামরিক অভিযানের প্রতি দেশটির জনসমর্থন দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে। বিশেষ করে ইহুদি জনগোষ্ঠীর মধ্যে এই পতনের হার সবচেয়ে বেশি লক্ষণীয়। ইসরায়েল ডেমোক্রেসি ইনস্টিটিউট (আইডিআই)-এর সাম্প্রতিক জরিপ অনুযায়ী, যুদ্ধের শুরুতে ৭৪ শতাংশ ইহুদি জনতা এই লড়াইকে ‘জোরালোভাবে’ সমর্থন জানালেও বর্তমানে মাত্র ৫০ শতাংশ মানুষ যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে মত দিচ্ছেন।
ইহুদি ও আরব জনগোষ্ঠীর মধ্যে সমর্থনের পার্থক্য
জরিপে আরও দেখা গেছে, ইসরায়েলের আরব জনগোষ্ঠীর মধ্যে সমর্থন মাত্র ৬ পয়েন্ট কমে ১৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। তবে প্রথম দুই সপ্তাহে ইহুদিদের মধ্যে যে ব্যাপক উৎসাহ ও উদ্দীপনা ছিল, তা অত্যন্ত দ্রুতগতিতে কমে গেছে। এই পরিবর্তনের পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ চিহ্নিত করা হচ্ছে।
যাঁরা পাসওভারের (ইহুদিদের ধর্মীয় উৎসব) আগের দিনটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আশঙ্কায় বারবার আশ্রয়কেন্দ্রে ছুটে কাটিয়েছেন, তাদের কাছে এই কারণগুলো স্পষ্ট। মধ্য ইসরায়েলে অন্তত সাতবার এবং এর মধ্যে দুবার গভীর রাতে জীবন বাঁচাতে আশ্রয়কেন্দ্রে ছুটতে হয়েছে। এর প্রধান কারণ একটাই—এভাবে জীবন চলতে পারে না।
দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব
এই পরিস্থিতি শুধু ইসরায়েলের একার নয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যেকোনো দেশের মানুষই লড়াই ও মৃত্যুতে ক্লান্ত হয়ে পড়ে। যুদ্ধের পেছনে ব্যক্তিগত ও জাতীয় সম্পদ ব্যয় করতে করতে মানুষের ধৈর্য ফুরিয়ে আসে। ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে ভিয়েতনাম যুদ্ধ নিয়ে মার্কিন নাগরিকদের মনোভাব বা রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধে ইউক্রেনীয়দের মনোভাব—সব ক্ষেত্রেই এই একই চিত্র দেখা গেছে।
অর্থাৎ যারা যুদ্ধ শুরু করে ও যারা এর শিকার হয়, ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে উভয়ের ক্ষেত্রেই এই চিত্র সত্য। একটি দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ মানেই নাগরিকদের কাছে এই বার্তা যাওয়া যে যুদ্ধের ঘোষিত লক্ষ্যগুলো অর্জিত হচ্ছে না অথবা লক্ষ্যগুলো বারবার বদলে যাচ্ছে। ইসরায়েলিদের মধ্যে এই উদ্বেগ খুব দ্রুত দানা বেঁধেছে।
জরিপের ফলাফলে নাটকীয় পরিবর্তন
‘ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজ’ (আইএনএসএস)-এর জরিপ অনুযায়ী, ইসরায়েলিদের মধ্যে যাঁরা ভেবেছিলেন, এই যুদ্ধ ইরানের শাসনব্যবস্থাকে পুরোপুরি হটিয়ে দেবে, তাদের হার প্রথম সপ্তাহের তুলনায় দ্বিতীয় সপ্তাহে ৫০ শতাংশ কমেছে। এটি ২২ শতাংশ থেকে কমে মাত্র ১১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে এবং এক মাস পরও এর বিশেষ কোনো পরিবর্তন হয়নি।
আইএনএসএসের জরিপ মতে, ইরানের শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়বে বা মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হবে—এমনটা বিশ্বাস করা ইসরায়েলিদের সংখ্যা নাটকীয়ভাবে কমেছে। এটি মোট ৬৯ শতাংশ থেকে চতুর্থ সপ্তাহে ৪৪ শতাংশে নেমে এসেছে, অর্থাৎ এটি এখন সংখ্যালঘু মত। তবে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র শক্তি ধ্বংস করা যাবে—এখনো অধিকাংশ ইসরায়েলির এমন বিশ্বাস থাকলেও তা আগের চেয়ে কমেছে। প্রায় ১৫ শতাংশ কমে এই হার এখন ৫৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
যুদ্ধবিরতির দাবি বাড়ছে
প্রায় ৬০ শতাংশ ইসরায়েলি মনে করেন, এখন অথবা বড় কোনো সামরিক সাফল্যের পর দ্রুত যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে পৌঁছানো উচিত। এই হার যুদ্ধের প্রথম সপ্তাহের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। ইরানের বর্তমান শাসনের পতন না হওয়া পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন অর্ধেকের কম (৪৪ শতাংশ) মানুষ।
যুদ্ধের শুরুতে খুব কম ইসরায়েলি যুদ্ধবিরতি সমর্থন করলেও এখন এই মনোভাব দ্রুত বদলে যাচ্ছে। এটি একটি স্পষ্ট বার্তা দেয় যে ইসরায়েলিরা এখনো স্বল্পস্থায়ী যুদ্ধই পছন্দ করে, কিন্তু এই যুদ্ধ ক্রমেই দীর্ঘায়িত হচ্ছে। এই অবস্থায় সরকারের জন্য জনসমর্থন ধরে রাখা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।



