আরব সাগরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় বাংলাদেশি নাবিকের দুঃসহ অভিজ্ঞতা
আরব সাগরে পানামার পতাকাবাহী জাহাজ 'এমভি গোল্ড অটাম'-এ মিসাইল হামলার ভয়াবহ মুহূর্তটি প্রথম আলোকে বর্ণনা করেছেন বাংলাদেশি নাবিক এহসান সাবরি রিহাদ। গত মঙ্গলবার স্থানীয় সময় বেলা সাড়ে ১১টার দিকে এই হামলা ঘটে, যা ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতির আগের দিন সংঘটিত হয়। জাহাজটি চীনের সাংহাই থেকে পণ্য নিয়ে ওমানের সোহার বন্দরের দিকে যাচ্ছিল, তখন এটি গন্তব্য থেকে প্রায় ২০০ নটিক্যাল মাইল দূরে আরব সাগরে অবস্থান করছিল।
হামলার শুরুর মুহূর্ত
এহসান সাবরি রিহাদ বলেন, 'বেলা ১১টার দিকে দুপুরের খাবার খেয়ে বিশ্রাম নিচ্ছিলাম। হঠাৎ বিকট শব্দে জাহাজ কেঁপে ওঠে। দ্রুত লাইফ জ্যাকেট পরে ইঞ্জিনকক্ষে ছুটে যাই। দেখি, সেখানে সব ঠিক আছে। এরপর দৌড়ে ওপরে ডেকে উঠে দেখি, ক্রেনের নিচে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে। তখনই বুঝতে পারি মিসাইল আক্রমণের শিকার হয়েছে জাহাজটি।' তিনি আরও উল্লেখ করেন যে হামলার পরপরই আরেকটি মিসাইল আঘাত হানে, যা কয়েক সেকেন্ডের জন্য তাদের বেঁচে থাকার সুযোগ দেয়।
জাহাজটিতে মোট ২২ জন নাবিক ছিলেন, যার মধ্যে বাংলাদেশের ৬ জন, চীনের ১১ জন, ইন্দোনেশিয়ার ৩ জন এবং মিয়ানমার ও ভিয়েতনামের ১ জন করে নাবিক অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। কক্সবাজার সদরের বাসিন্দা এহসান সাবরি রিহাদ ইঞ্জিন ক্যাডেট হিসেবে ১০ মাস আগে এই জাহাজে যোগ দিয়েছিলেন, এবং এটি ছিল তার কর্মজীবনের প্রথম সমুদ্রযাত্রা।
হামলার পরের পরিস্থিতি
হামলার পর জাহাজে একের পর এক আঘাতের শব্দ শোনা যায়, এবং কয়েকটি আঘাতের পর চারপাশে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। সবশেষ আঘাতে জাহাজের এক পাশে গর্ত তৈরি হয় এবং মূল ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে যায়। এহসান সাবরি জানান, জাহাজের পেছনের ডেক ছাড়া প্রায় সব অংশেই আগুন জ্বলছিল, এবং পণ্য হিসেবে থাকা বড় বাসগুলো আগুনে পুড়ে অঙ্গারে পরিণত হয়।
নাবিকেরা আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করেন, কিন্তু বেলা একটা পর্যন্ত চেষ্টা করেও ইঞ্জিন চালু করা যায়নি। একপর্যায়ে ক্যাপ্টেন জাহাজ পরিত্যক্ত ঘোষণা করেন, এবং নাবিকেরা লাইফবোটে নামার প্রস্তুতি নেন। তবে ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে একটি লাইফবোট ক্ষতিগ্রস্ত হয়, এবং অন্য একটি লাইফবোটে এহসান সাবরি রিহাদসহ ৪ জন উঠতে সক্ষম হন, যার মধ্যে ইন্দোনেশিয়ার তিন নাবিকও ছিলেন।
লাইফবোটে আটকে থাকা ও উদ্ধার অভিযান
লাইফবোটে নামার পর শুরু হয় আরেক দুঃসহ সময়। বোমার আঘাতে লাইফবোটের ইঞ্জিন অচল হয়ে যায়, এবং উত্তাল সাগরে ঢেউয়ের পানি লাইফবোটে ঢুকতে থাকে। এহসান সাবরি বলেন, 'অচল লাইফবোটটা ঢেউয়ের মধ্যে দুলছিল। সবার চোখেমুখে আতঙ্ক ছিল। কয়েক দফা বমি করেছি। মনে হচ্ছিল, আজকেই শেষ দিন।' প্রায় সাত ঘণ্টা পর রাত সাড়ে আটটার দিকে এমভি ইউনাইচ নামের একটি জাহাজের দেখা পেয়ে তারা সাহায্য চান এবং রশির সিঁড়ি বেয়ে জাহাজটিতে ওঠেন।
পরে পাকিস্তান নৌবাহিনীর জাহাজ পিএনএস হুনাইন উদ্ধার অভিযানে এগিয়ে আসে। বুধবার সকাল আটটার দিকে এটি পরিত্যক্ত জাহাজে আটকে থাকা ১৮ জনের মধ্যে ১৪ জনকে উদ্ধার করে। জাহাজের আগুন নিয়ন্ত্রণে আসায় ক্যাপ্টেনসহ ৪ জন জাহাজেই থেকে যান, যার মধ্যে বাংলাদেশি নাবিক মাজহারুল আবেদীন শাওনও রয়েছেন। সাগর শান্ত হলে সাহায্যকারী জলযান দিয়ে জাহাজটি ওমানের উপকূলে নেওয়ার আশায় তারা সেখানে অবস্থান করেন।
উদ্ধার ও পরবর্তী অবস্থা
পাকিস্তান নৌবাহিনীর জাহাজটি এমভি ইউনাইচ থেকে চারজনকেও উদ্ধার করে, এবং মোট ১৮ জন নাবিককে নিয়ে গতকাল বেলা দুইটায় করাচি বন্দরে পৌঁছায়। এহসান সাবরি ছাড়াও এই দলে বাংলাদেশি নাবিক তাওহীদুর রহমান, আবদুল্লাহ আল মারুফ, সৈকত পাল ও রিয়াদ হোসেন অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। নাবিকদের জাহাজেই প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়।
দুর্ঘটনা থেকে উদ্ধার হওয়ার পর এহসান সাবরি বাংলাদেশ মার্চেন্ট মেরিন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক সাখাওয়াত হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। সাখাওয়াত হোসেন নিশ্চিত করেন যে সবাই নিরাপদে আছে এবং নাবিকদের নিরাপদে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য কাজ চলছে। এই ঘটনাটি ইরান যুদ্ধ শুরুর পর পারস্য উপসাগর, হরমুজ প্রণালি ও ওমান উপসাগর এলাকার যুদ্ধ ঝুঁকির প্রতিফলন হিসেবে দেখা যাচ্ছে।



