ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধবিরতি কার্যকর: স্থায়ী শান্তির সোপান নাকি নতুন সংঘাতের পূর্বাভাস?
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরানের সভ্যতা ধ্বংসের হুমকির মধ্যেই গতকাল ইরান ও তার প্রতিপক্ষ শক্তিগুলোর মধ্যে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছে। গত এক মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা প্রলয়ংকরী ধ্বংসলীলা ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার পর এই সাময়িক যুদ্ধবিরতিতে বিশ্ববাসীর মনে কিছুটা হলেও শান্তি ও স্বস্তি নেমে এসেছে।
যুদ্ধবিরতির পরও হামলা অব্যাহত
সর্বশেষ খবর অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও ইরান ও ইসরায়েলে পারস্পরিক হামলার ঘটনা ঘটেছে। যুদ্ধে নিজেকে বিজয়ী প্রমাণ করতে এমন হামলা অস্বাভাবিক নয়, তবে শেষ পর্যন্ত যুদ্ধবিরতি টিকে থাকবে বলে আশা করা যায়। বস্তুত, এই মুহূর্তের বড় প্রশ্ন হলো, এই যুদ্ধবিরতি কি স্থায়ী শান্তির সোপান? নাকি এটি নতুন কোনো প্রলয়ংকারী ঝড়ের পূর্বাভাস বা পরবর্তী বৃহত্তর সংঘাতের রণকৌশল?
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের প্রশ্ন: যুদ্ধে জয়ী কে?
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক মহলে এখন এই প্রশ্নটিও ঘুরপাক খাচ্ছে যে, এই যুদ্ধে প্রকৃতপক্ষে জয়ী হলো কে? যদিও রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মারিয়া জাখারোভা গতকাল বলেছেন যে, এই যুদ্ধবিরতির ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের উপর চালানো হামলায় ‘শোচনীয় পরাজয়’ বরণ করেছে, তবু যুদ্ধের লাভক্ষতির হিসাব কষতে বসলে দেখা যায়, আধুনিক যুদ্ধবিগ্রহে নিরঙ্কুশ বিজয় কেবলই একটি অলীক ধারণা।
ইরানের ক্ষয়ক্ষতি ও মনস্তাত্ত্বিক বিজয়
ইরানের সমরশক্তি ও আঞ্চলিক প্রভাব খর্ব করার যে লক্ষ্য ইসরায়েল ও তার মিত্রশক্তির ছিল, তা আংশিক সফল হয়েছে বলে অনেক পশ্চিমা বিশ্লেষক মনে করেন। ইরানের পারমাণবিক অবকাঠামো ও সমর-সরঞ্জামাদির উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, যা দেশটিকে অর্থনৈতিক ও সামরিকভাবে কয়েক দশক পিছনে ঠেলে দিয়েছে। তবে মুদ্রার অপর পিঠও রয়েছে। ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’ ও ‘দ্য গার্ডিয়ান’-এর সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ইরান দেখিয়ে দিয়েছে যে সুদীর্ঘ অবরোধের পরেও তারা প্রতিপক্ষের অভ্যন্তরে সরাসরি আঘাত হানতে সক্ষম। এই যুদ্ধে ইরান সরাসরি সম্মুখসমরে অবতীর্ণ হয়ে তার ‘প্রতিরোধ অক্ষ’-এর মনোবল বৃদ্ধি করেছে। তাই সামরিকভাবে ইরান ক্ষতিগ্রস্ত হলেও মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিকভাবে তারা নিজেদের অপরাজেয় ভাবমূর্তি টিকিয়ে রাখতে সমর্থ হয়েছে।
বিশ্ব অর্থনীতির পরাজয় ও ভূরাজনৈতিক দ্বিধা
পক্ষান্তরে, মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতা বিনষ্ট হওয়ায় এবং জ্বালানি তৈলের বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি হওয়ায় বিশ্ব অর্থনীতি যে পরাজয়ের সম্মুখীন হয়েছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। উল্লেখ্য, এই যুদ্ধবিরতি শেষ পর্যন্ত স্থায়ী হবে কি না, তা নিয়ে ভূরাজনীতিবিদগণ দ্বিধাবিভক্ত। ‘আলজাজিরা’ ও ‘রয়টার্স’-এর প্রতিবেদনে প্রকাশিত তথ্যমতে, এই বিরতি মূলত উভয় পক্ষের জন্য রসদ সংগ্রহের একটি সুযোগ মাত্র। আলজাজিরার এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে: ‘বর্তমান যুদ্ধবিরতি কোনো দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির ফসল নয়; বরং এটি আন্তর্জাতিক চাপের মুখে গৃহীত একটি মানবিক বিরতি।’
মধ্যপ্রাচ্যের জটিল সমীকরণ ও ভবিষ্যৎ
প্রকৃতপক্ষে মধ্যপ্রাচ্যের জটিল সমীকরণে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যকার অস্তিত্বের লড়াই কেবল দুই সপ্তাহের সমঝোতায় মিটবার নয়। হিজবুল্লাহ, হামাস ও হুতি বিদ্রোহীদের গতিবিধি এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে পরিবর্তিত অভ্যন্তরীণ রাজনীতির প্রভাব—এই সমস্ত কিছুই যুদ্ধবিরতির স্থায়িত্ব নির্ধারণ করবে। অতএব, এই যুদ্ধে কে জিতল বা কে হারল—তার বিচার করবে মহাকাল। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে জয় হয়েছে কেবল মানবিকতার, যদি এই দুই সপ্তাহে আর্তমানবতার নিকট পর্যাপ্ত ত্রাণ ও চিকিৎসা পৌঁছানো সম্ভব হয়। আর যদি এই বিরতি কেবলই রণকৌশল পরিবর্তনের হাতিয়ার হয়, তাহলে আগামীর দিনগুলিতে মধ্যপ্রাচ্য এক ভয়াবহতর অন্ধকারের দিকে ধাবিত হবে। চীন, পাকিস্তানসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে কেবল মধ্যস্থতা করলেই চলবে না, বরং সংঘাতের মূল কারণসমূহ দূর করার সাহসী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। নতুবা এই দুই সপ্তাহের শান্তি কেবলই নতুন আরেক ঝড়ের পূর্বের নিস্তব্ধতা বলে পরিগণিত হবে। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী ইতিমধ্যে বলেছেন যে, এই যুদ্ধবিরতিতে লেবানন অন্তর্ভুক্ত থাকবে না। যদিও মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তান বলছে–লেবাননও যুদ্ধবিরতির মধ্যে পড়ে। তার অর্থ কি এই—যুদ্ধ শেষ হয়ে ও হয়নি বা হবে না?



