হরমুজ প্রণালিতে সীমিত জাহাজ চলাচল শুরু, ইরানের টোল দাবিতে উত্তেজনা
হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল শুরু, ইরানের টোল দাবি

হরমুজ প্রণালিতে যুদ্ধবিরতির পর সীমিত জাহাজ চলাচল শুরু

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দুই সপ্তাহের সাময়িক যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর বুধবার পারস্য উপসাগরের গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে সীমিত পরিসরে জাহাজ চলাচল শুরু হয়েছে। তবে ‘নিরাপদ যাতায়াত’ নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিলেও ইরান এই প্রণালির ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ দাবি করায় নতুন করে উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল এ খবর জানিয়েছে।

জাহাজ চলাচলের ধীর গতি ও ইরানের নিয়ন্ত্রণ দাবি

জাহাজ ট্র্যাকিং সংস্থা মেরিন ট্রাফিক-এর তথ্য অনুযায়ী, অস্থায়ী চুক্তি ঘোষণার পর প্রথম কয়েক ঘণ্টায় মাত্র দুটি জাহাজ এই প্রণালি অতিক্রম করেছে। জাহাজ ব্রোকারদের মতে, যুদ্ধবিরতি টিকে থাকলে আগামী কয়েক দিনে আরও কয়েক ডজন জাহাজ উপসাগর দিয়ে যাতায়াত করতে পারে। তবে যুদ্ধের সময়ে জাহাজ চলাচলের গতি অত্যন্ত ধীর।

বর্তমানে হরমুজ প্রণালিতে যাতায়াতের অপেক্ষায় চার শতাধিক তেল ও জ্বালানি ট্যাঙ্কার এবং অন্তত ২০টি এলএনজিবাহী জাহাজ আটকা পড়ে আছে। যুদ্ধবিরতি হলেও এই রুটে জাহাজ চলাচল এখনই স্বাভাবিক হওয়ার কোনও লক্ষণ নেই। ইরান নৌবাহিনী প্রণালির কাছে নোঙর করা জাহাজগুলোকে সাফ জানিয়ে দিয়েছে যে, যাতায়াতের জন্য অবশ্যই তেহরানের অনুমতি নিতে হবে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ইরানের কঠোর অবস্থান ও টোল আদায়

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি এক বার্তায় স্পষ্ট করেছেন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে যেকোনও যাতায়াত ইরানি সশস্ত্র বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে হতে হবে। মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে শান্তি আলোচনার অগ্রগতির ওপর ভিত্তি করেই তেহরান এই যাতায়াতের গতি নিয়ন্ত্রণ করবে।

ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের হাতে আসা একটি রেডিও রেকর্ডিং অনুযায়ী, ইরান নৌবাহিনী বুধবার হুঁশিয়ারি দিয়েছে, ‘অনুমতি ছাড়া কোনও জাহাজ যাতায়াতের চেষ্টা করলে তা ধ্বংস করে দেওয়া হবে।’

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

শিপিং সার্কেলগুলোতে বর্তমানে বহুল আলোচিত নাম ‘তেহরান টোল বুথ’। ইরান এই প্রণালি দিয়ে পার হওয়ার জন্য প্রতিটি জাহাজ থেকে ১০ লাখ ডলার বা তারও বেশি মাশুল আদায় করছে। গত কয়েক সপ্তাহে যখন এক হাজারের বেশি জাহাজ আটকা পড়ে ছিল, তখন অন্তত ২৫০টি জাহাজ ইরানকে এই মাশুল দিয়ে যাতায়াত করেছে। এর মধ্যে বেশিরভাগই ইরানের নিজস্ব বা তাদের সরবরাহকারী জাহাজ। তবে চীন, গ্রিস, পাকিস্তান ও ফ্রান্সের মালিকানাধীন অন্তত ৩৫টি বড় জাহাজও মাশুল দিয়ে এই পথ ব্যবহার করেছে।

বিশেষ করিডোর ও বাণিজ্যিক প্রভাব

এই পদ্ধতিতে জাহাজগুলো মূল শিপিং চ্যানেলের উত্তরের একটি বিশেষ করিডোর ব্যবহার করে। যুদ্ধবিরতির মধ্যস্থতাকারীরা বলছেন, ইরান ‘নিরাপদ যাতায়াতের’ কথা বললেও এই মাশুল আদায়ের বর্তমান ধারা পরিবর্তনের সম্ভাবনা কম।

ট্রাম্প নতুন এক বিভ্রান্তি ছড়িয়ে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান যৌথভাবে এই টোল ব্যবস্থা পরিচালনা করতে পারে। তবে প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ সাফ জানিয়েছেন, ‘আমরা কেবল প্রণালি খুলে দেওয়ার বিষয়ে একমত হয়েছি।’

আটকে পড়া জাহাজের কর্মী ও মালিকরা চলাচলের জন্য মুখিয়ে থাকলেও সমুদ্র বিমাকারীরা এখনই কোনও নিশ্চয়তা দিতে পারছে না। লয়েডস মার্কেট অ্যাসোসিয়েশনের ম্যারিন ও অ্যাভিয়েশন প্রধান নিল রবার্টস বলেন, ‘উপসাগরে বাণিজ্য ব্যবস্থা খুব দ্রুত স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। এই অঞ্চলটি এখনও অত্যন্ত উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ রয়ে গেছে এবং মূল উত্তজনাগুলোর কোনও সমাধান হয়নি।’

হরমুজ প্রণালির বৈশ্বিক গুরুত্ব

হরমুজ প্রণালি মূলত পারস্য উপসাগরকে বিশ্ববাজারের সঙ্গে যুক্ত করে। স্বাভাবিক সময়ে বিশ্বের মোট তেলের প্রায় ২০ শতাংশ এই সরু জলপথ দিয়ে সরবরাহ করা হয়, যা কুয়েত, ইরাক এবং সৌদি আরব থেকে আসে।

এই পথ দিয়ে যাতায়াত করা তেল ও গ্যাসের ৮০ শতাংশেরই গন্তব্য এশীয় বাজার, বিশেষ করে চীন, ভারত ও জাপান। এছাড়া জেট ফুয়েল ও সারের মতো পণ্যও এই পথেই আসে, যা বিশ্ব ভ্রমণ শিল্প ও খাদ্য সরবরাহের জন্য অপরিহার্য। যদিও ইরানের একপাশে ওমান অবস্থিত এবং সমুদ্রসীমা অনুযায়ী ওমানের অংশে ইরানের নিয়ন্ত্রণ থাকার কোনও আইনি ভিত্তি নেই। তবুও বাস্তব পরিস্থিতিতে তেহরানের দাপটই এখন জাহাজ চলাচলের ভাগ্য নির্ধারণ করছে।