ইরান-ইসরায়েল সংঘাতে ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতি: ইসরায়েলের কৌশলগত পরাজয়ের শঙ্কা
ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতিতে ইসরায়েলের কৌশলগত পরাজয়

ইরান-ইসরায়েল সংঘাতে ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতি: ইসরায়েলের কৌশলগত পরাজয়ের শঙ্কা

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আকস্মিক সিদ্ধান্তে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি বজায় রাখার বিষয়টি ইসরায়েলকে এক কঠিন পরিস্থিতির মুখে ঠেলে দিয়েছে। সামরিক ক্ষেত্রে একের পর এক সাফল্য অর্জন করা সত্ত্বেও তেহরান এই সংঘাত থেকে রাজনৈতিকভাবে বিজয়ী হিসেবে আবির্ভূত হতে যাচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক সংবাদমাধ্যম আল-মনিটর এ খবর জানিয়েছে।

অভিযানের শুরু ও সাফল্যের গল্প

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ অভিযানের শুরুটা ছিল এক অভাবনীয় সাফল্যের গল্প। নিখুঁত সমন্বিত সেই হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন। ইসরায়েলি বিমান বাহিনী ইরানের জ্যেষ্ঠ সামরিক কমান্ডের বড় অংশ ধ্বংস করে এবং আকাশসীমায় নিরঙ্কুশ আধিপত্য বজায় রাখে। কিন্তু ৪০ দিনের রুদ্ধশ্বাস লড়াই শেষে এখন রণক্ষেত্র ছাপিয়ে বড় হয়ে উঠেছে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত পরাজয়ের শঙ্কা।

ইরানের স্থিতিস্থাপকতা ও চ্যালেঞ্জ

অভিযান শুরু হওয়ার পর ইসরায়েলি পাইলটরা যখন ইরান থেকে ফিরছিলেন, তখন তাদের মধ্যে ছিল চূড়ান্ত উল্লাস। নির্ভুল হামলা এবং ইরানি নেতৃত্বের বড় অংশ নিশ্চিহ্ন হওয়ার পর ইসরায়েলি রাজনীতিকরা দাবি করেছিলেন, ইসরায়েল মধ্যপ্রাচ্যে এক অজেয় শক্তিতে পরিণত হয়েছে। কিন্তু দ্বিতীয় সপ্তাহে এসেই সেই দাপট ফিকে হতে শুরু করে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন ইসরায়েলি পাইলট আল-মনিটরকে বলেন, ‘ওরা হাল ছাড়ে না। আঘাত করলে মাথা নিচু করে ঠিকই, কিন্তু আমরা চলে আসামাত্রই আবার মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে।’

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

চলমান এই ইঁদুর-বেড়াল খেলায় ইসরায়েলি পাইলটরা ইরানের ভ্রাম্যমাণ মিসাইল লঞ্চারগুলোর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে পেরে উঠছিলেন না। ইরানের এই স্থিতিস্থাপকতা ইসরায়েলের উন্নত আগ্নেয়াস্ত্রের শ্রেষ্ঠত্বকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছে। সামরিক শক্তিতে ইরান অনেক পিছিয়ে থাকলেও তাদের ড্রোন এবং ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত ইসরায়েলিদের জন্য বিভীষিকা হয়ে দাঁড়িয়েছে। লাখ লাখ ইসরায়েলিকে দিনে একাধিকবার বাঙ্কারে আশ্রয় নিতে বাধ্য করেছে তেহরান।

কৌশলগত পরাজয় ও রাজনৈতিক প্রভাব

গত ২৯ মার্চ ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু স্বীকার করেছিলেন যে, কয়েক দশকের ভয়াবহতম বোমাবর্ষণের পরেও ইরান ও হিজবুল্লাহর এখনও ক্ষেপণাস্ত্র ক্ষমতা রয়ে গেছে। একজন জ্যেষ্ঠ ইসরায়েলি নিরাপত্তা সূত্র আল-মনিটরকে বলেন, ‘ইরান বহু বছর ধরে এই ধরনের সংঘাতের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। তারা জানত যে তাদের কেবল সহ্য করতে হবে এবং পাল্টা হামলা চালিয়ে যেতে হবে। তারা ঠিক সেটিই করেছে।’

বিশ্লেষকদের মতে, এটি ইসরায়েলের জন্য একটি ‘কৌশলগত পরাজয়’। কারণ ইসলামপন্থি শাসকগোষ্ঠী এখনও ক্ষমতায় টিকে আছে এবং তারা সম্ভবত যুক্তরাষ্ট্রে জব্দ হওয়া তাদের সম্পদ ফিরে পাবে। ইসরায়েলের সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী অ্যাভিগডর লিবারম্যানের মতে, ‘দিগন্তে ভালো কিছুই দেখা যাচ্ছে না।’

নেতানিয়াহুর ভূমিকা ও মার্কিন নির্ভরতা

নেতানিয়াহুর সাবেক এক সহযোগী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘নেতানিয়াহু আবারও প্রমাণ করলেন যে তিনি যুদ্ধে নামতে পারেন, কিন্তু সেখান থেকে সম্মানের সঙ্গে বের হয়ে আসার ক্ষমতা তার নেই। তার কোনও প্রস্থানের কৌশল থাকে না।’ অনেকের মতে, ইসরায়েল ট্রাম্পের ওপর অতিরিক্ত নির্ভর করে বড় ঝুঁকি নিয়ে ফেলেছে। একজন অভিজ্ঞ ইসরায়েলি কূটনীতিক বলেন, ‘ট্রাম্পের ওপর আমাদের বাজি ধরাটা স্বল্পমেয়াদে খুব সফল ছিল, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এটি শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ হবে।’

তিনি আরও বলেন, যেভাবে ইরাক যুদ্ধের জন্য নেতানিয়াহুকে দায়ী করা হয়, আমেরিকানরা সেভাবেই মনে রাখবে যে তিনি ট্রাম্পকেও ‘ইরানি ফাঁদে’ টেনে নিয়েছিলেন। যুদ্ধবিরতি ঘোষণার আগে ট্রাম্প নেতানিয়াহুকে ফোন করেছিলেন। কিন্তু ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর সেই প্রস্তাবে সম্মতি দেওয়া ছাড়া আর কোনও পথ খোলা ছিল না। ইসরায়েলের ভেতর অনেকে এখন আশা করছেন যে, শান্তি আলোচনার বড় ফাঁকগুলো হয়তো কোনও চূড়ান্ত সমঝোতায় পৌঁছাতে বাধা দেবে, যা ট্রাম্পকে আবারও তেহরানের ওপর হামলা শুরু করতে বাধ্য করবে।