যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের যুদ্ধবিরতি: শর্ত নিয়ে ধোঁয়াশা, শুক্রবার ইসলামাবাদে আলোচনা
যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরান—এই তিন পক্ষ একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে একমত হয়েছে ঠিকই, কিন্তু এর শর্তাবলী ও ভবিষ্যৎ নিয়ে শুরু হয়েছে চরম ধোঁয়াশা। চুক্তির প্রতিটি শর্ত নিয়ে পক্ষগুলো একে অপরের বিরোধী বক্তব্য দিচ্ছে, যা আসন্ন শান্তি আলোচনাকে খাদের কিনারে ঠেলে দিয়েছে। শুক্রবার পাকিস্তানের ইসলামাবাদে এই সংকট নিরসনে তিন পক্ষ আলোচনায় বসার কথা রয়েছে। তবে একটি বিষয়ে সবাই একমত, এই যুদ্ধবিরতি মানেই যুদ্ধের চূড়ান্ত সমাপ্তি নয়। মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস এ খবর জানিয়েছে।
হরমুজ প্রণালি: ‘উন্মুক্ত’ নাকি ‘নিয়ন্ত্রিত’?
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতির প্রধান শর্তই ছিল হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া। কিন্তু জলপথটি আসলে কতটা উন্মুক্ত হবে, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে বিতর্ক। ইরান সরকার এক সতর্ক বার্তায় জানিয়েছে, জাহাজ চলাচলের জন্য তাদের সামরিক বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করতে হবে এবং জাহাজের সংখ্যার ওপর সীমাবদ্ধতা থাকবে। ইরানি সংবাদমাধ্যমগুলো দাবি করছে, এই জলপথ ব্যবহারের জন্য জাহাজগুলোকে মাশুল দিতে হবে। এদিকে ট্রাম্প নতুন এক বিভ্রান্তি ছড়িয়ে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান যৌথভাবে এই টোল ব্যবস্থা পরিচালনা করতে পারে। তবে প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ সাফ জানিয়েছেন, ‘আমরা কেবল প্রণালি খুলে দেওয়ার বিষয়ে একমত হয়েছি।’
যুদ্ধবিরতির মধ্যেও হামলা ও পাল্টা হামলা
যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার প্রথম ১২ ঘণ্টার মধ্যেই ইরান, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কুয়েতের জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলার ঘটনা ঘটেছে। ইরান দাবি করেছে, যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলার প্রতিশোধ হিসেবেই তারা ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে। তবে পিট হেগসেথ দাবি করেছেন, ইরানের অভ্যন্তরীণ কমান্ড ব্যবস্থায় বিশৃঙ্খলার কারণে এই হামলাগুলো হতে পারে। তিনি বলেন, ‘যুদ্ধবিরতি পুরোপুরি কার্যকর হতে সময় লাগে। আমরা আশা করছি এটি ঠিক হয়ে যাবে।’ পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ সতর্ক করে বলেছেন, এ ধরনের হামলা শান্তি প্রক্রিয়ার মূল চেতনাকে ক্ষুণ্ণ করছে।
আলোচনার ভিত্তি নিয়ে বিভক্তি
ট্রাম্প শুরুতে ইরানের ১০ দফা প্রস্তাবকে আলোচনার ‘কার্যকর ভিত্তি’ হিসেবে মেনে নিয়ে নিজের কট্টরপন্থি মিত্রদের অবাক করে দিয়েছিলেন। ইরানের ওই শর্তগুলোর মধ্যে ছিল ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অধিকার বজায় রাখা, সব নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ পাওয়া। কিন্তু বুধবার ট্রাম্প তার অবস্থান বদলে নিজের দেওয়া ১৫ দফা পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করেন, যা ইরান আগেই প্রত্যাখ্যান করেছিল। ট্রাম্প স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, ইরানকে কোনোভাবেই উচ্চমাত্রার ইউরেনিয়াম মজুত রাখতে দেওয়া হবে না। তিনি ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছেন, ‘কোনও সমৃদ্ধকরণ হবে না। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সঙ্গে মিলে মাটির গভীরে পুঁতে রাখা সব পারমাণবিক কণা খুঁড়ে বের করে নিয়ে আসবে।’
লেবানন ইস্যু ও নেতানিয়াহুর অনড় অবস্থান
পাকিস্তান ও ইরান দাবি করেছে যে, এই যুদ্ধবিরতি লেবাননের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। কিন্তু ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু তা সরাসরি নাকচ করে দিয়েছেন এবং লেবাননে হামলা আরও জোরদার করেছেন। লেবানিজ রেড ক্রসের মতে, নতুন করে হামলায় সেখানে ৮০ জনের বেশি নিহত হয়েছেন। ইরান একে চুক্তির লঙ্ঘন হিসেবে দেখছে এবং হুঁশিয়ারি দিয়েছে যে, এর ফলে পুনরায় হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়া হতে পারে।
‘ট্রিগারে হাত রেখেই’ আলোচনার অপেক্ষা
যুক্তরাষ্ট্রের জয়েন্ট চিফস চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন এই যুদ্ধবিরতিকে কেবল একটি ‘সাময়িক বিরতি’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। পিট হেগসেথ হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ‘ইরান চুক্তি মানছে কি না তা দেখতে আমরা আশপাশেই থাকব। মুহূর্তের নোটিশে আমরা পুনরায় যুদ্ধ শুরু করতে প্রস্তুত।’ পাল্টা বার্তায় ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) জানিয়েছে, ‘আমাদের হাত ট্রিগারেই আছে। যেকোনও হামলার জবাব দিতে আমরা আরও বেশি শক্তি নিয়ে প্রস্তুত।’ সব চোখ এখন শুক্রবারের ইসলামাবাদ বৈঠকের দিকে। ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স মার্কিন প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিতে পারেন। তবে পুনর্গঠনের তহবিল, পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি বন্ধ করা এবং হিজবুল্লাহ-ইসরায়েল যুদ্ধের সমাপ্তির মতো মৌলিক ইস্যুগুলোতে পক্ষগুলো এতটাই দূরে অবস্থান করছে যে, আলোচনার টেবিল থেকে স্থায়ী শান্তি বেরিয়ে আসা এক প্রকার অনিশ্চিত।



