দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে বিশ্বনেতাদের স্বস্তি, কিন্তু অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে
দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে বিশ্বনেতাদের স্বস্তি ও অনিশ্চয়তা

দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে বিশ্বনেতাদের স্বস্তি, কিন্তু অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে

যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে দুই সপ্তাহের অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ায় বিশ্বনেতারা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রলয়ঙ্করী হুমকি থেকে সরে আসা এই চুক্তি বৈশ্বিক সংকট প্রশমনে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তবে যুদ্ধবিরতির ঘোষণায় স্বস্তি এলেও বিশ্বনেতাদের মধ্যে একধরনের অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগ রয়ে গেছে, বিশেষ করে ট্রাম্পের নতুন বিশ্বব্যবস্থায় খাপ খাইয়ে চলার চ্যালেঞ্জ নিয়ে।

বিশ্বনেতাদের প্রতিক্রিয়া ও উদ্বেগ

ডেনমার্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লার্স লোকে রাসমুসেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, ‘আজকের পৃথিবী কি গতকালের চেয়ে ভালো? নিঃসন্দেহে।’ তবে তিনি যোগ করেন, ‘৪০ দিন আগের চেয়ে কি ভালো? সে বিষয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে।’ ইরান যুদ্ধের ঘোরবিরোধী স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ যুদ্ধবিরতিকে স্বাগত জানিয়েছেন, কিন্তু ট্রাম্পের সামরিক অভিযানের কঠোর সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেন, ‘কেউ পৃথিবীতে আগুন লাগিয়ে, পরে এক বালতি পানি নিয়ে হাজির হলেই স্পেন সরকার তার প্রশংসা করবে না। এখন কূটনীতি, আন্তর্জাতিক আইন ও শান্তি একান্ত দরকার।’

ইউরোপের বাইরে ওমান, জাপান, মালয়েশিয়া ও অস্ট্রেলিয়াসহ অনেক দেশ যুদ্ধবিরতির খবরকে স্বাগত জানিয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্টনি আলবানিজ স্কাই নিউজকে বলেন, তিনি এ চুক্তিকে স্বাগত জানান এবং যুদ্ধের শেষ চান। তিনি ট্রাম্পের হুমকির সমালোচনা করে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের এ ধরনের ভাষা ব্যবহার করা কোনোভাবেই সমীচীন নয়।’

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

জ্বালানি সংকট ও অর্থনৈতিক প্রভাব

যুদ্ধের ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, যা জ্বালানির ঘাটতি ও দাম বৃদ্ধির মাধ্যমে বিশ্ব অর্থনীতিকে ঝাঁকুনি দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ আগ্রাসন শুরুর কয়েক দিনের মধ্যে বিশ্ববাজারে তেল ও গ্যাস সরবরাহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি প্রায় বন্ধ করে দেয় ইরান। প্রস্তাবিত যুদ্ধবিরতির শর্ত অনুযায়ী, ইরানের সামরিক বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করা হলে এ প্রণালি দিয়ে নিরাপদে জাহাজ চলাচলের অনুমতি দেবে তেহরান।

জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস গতকাল বুধবার এক বিবৃতিতে বলেন, ‘এখন আলোচনার মাধ্যমে যুদ্ধের স্থায়ী অবসান নিশ্চিত করা প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত। আলোচনার মাধ্যমে ভয়াবহ বৈশ্বিক জ্বালানিসংকট ঠেকানো যেতে পারে।’ ইউরোপীয় দেশগুলোর কর্মকর্তারা যুদ্ধের কারণে তেল ও গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রভাব কমানোর চেষ্টায় গত এক মাস ব্যস্ত ছিলেন।

ট্রাম্পের নতুন বিশ্বব্যবস্থা ও অনিশ্চয়তা

দ্বিতীয় মেয়াদে হোয়াইট হাউসে ফিরে ট্রাম্প যে নতুন বিশ্বব্যবস্থা তৈরি করেছেন, সেখানে কীভাবে খাপ খাইয়ে চলতে হবে, তা বিশ্বনেতাদের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। নতুন বিশ্বব্যবস্থায় ট্রাম্প তাঁর মিত্র ও শত্রু—উভয় পক্ষকে সমানভাবে অনিশ্চয়তা ও দোটানায় ফেলে দিয়েছেন। বিশ্বনেতাদের হতাশার জায়গা হলো—এই যুদ্ধ বা অন্য কোনো সংঘাতের বিষয়ে ট্রাম্পকে প্রভাবিত করার মতো ক্ষমতা তাঁদের হাতে তেমন একটা নেই। তাঁর আক্রমণাত্মক ও প্রায় সময় বদলে যাওয়া বক্তব্যের অর্থ বুঝতে এক মাস ধরে বিশ্বনেতাদের হিমশিম খেতে হয়েছে।

উদাহরণ হিসেবে গত মঙ্গলবারের কথাই ধরা যায়, যখন ট্রাম্প ‘প্রলয়ঙ্করী হুমকি’ দেন। কিন্তু জার্মানির চ্যান্সেলর মের্ৎস, যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার কিংবা ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ, কেউ–ই প্রকাশ্যে ট্রাম্পের এ বক্তব্যের সমালোচনা করেননি। সম্ভবত ইচ্ছা করেই নীরব ছিলেন, যাতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট আরও উত্তেজিত হয়ে না পড়েন।

ভবিষ্যতের পদক্ষেপ ও বিশেষজ্ঞ মতামত

যুদ্ধবিরতির আলোচনায় অগ্রগতি হলেও জনগণকে স্বস্তি দিতে বিভিন্ন দেশের সরকারকে আরও পদক্ষেপ নিতে হবে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। ইতালির মিলানের বক্কোনি বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক টিটো বোয়েরি বলেন, ‘এ পর্যন্ত যা হয়েছে, তাতে জ্বালানি অবকাঠামো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাই হরমুজ প্রণালি খুলে গেলেও এসব দেশের পুরো সক্ষমতায় ফিরতে সময় লাগবে।’

যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের গতকালই পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোতে সফর শুরু করার কথা। সফরে তিনি মিত্রদের সঙ্গে দেখা করে হরমুজ প্রণালি আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের জন্য কীভাবে স্থায়ীভাবে খোলা রাখা যায়, তা নিয়ে আলোচনা করবেন। যুদ্ধবিরতি ঘোষণার আগেই স্টারমারের এ সফরের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। এর আগে গত সপ্তাহে যুক্তরাজ্যের উদ্যোগে ৪০টির বেশি দেশের কূটনীতিক ও সামরিক পরিকল্পনাবিদেরা প্রণালিটি কীভাবে আবার খোলা যায়, তা নিয়ে আলোচনা করেন, কিন্তু এখন পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ কোনো কর্মপরিকল্পনা আসেনি।