মধ্যপ্রাচ্যে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি: পাকিস্তানের কূটনৈতিক সাফল্য ও চ্যালেঞ্জ
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধবিরতি: পাকিস্তানের ভূমিকা ও প্রভাব

মধ্যপ্রাচ্যে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি: পাকিস্তানের কূটনৈতিক সাফল্য

মধ্যপ্রাচ্যে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সৈয়দ আব্বাস আরাগচি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পোস্ট শেয়ার করেছেন। এই পোস্টে তিনি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এবং ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরকে 'আমার প্রিয় ভাই' সম্বোধন করে তাদের অক্লান্ত পরিশ্রমের জন্য গভীর কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আরাগচির এই বার্তাটি নিজের মালিকানাধীন 'ট্রুথ সোশ্যাল' প্ল্যাটফর্মে শেয়ার করেছেন, যা শান্তি আলোচনায় ইসলামাবাদের ভূমিকার প্রতি ওয়াশিংটনের সম্মতির একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত বলে বিবেচিত হচ্ছে।

পাকিস্তানি প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা ও আমন্ত্রণ

এর পরপরই পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এক্স প্ল্যাটফর্মে একটি পোস্টে লিখেছেন, 'অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে আমি ঘোষণা করছি, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র তাদের মিত্রদের নিয়ে লেবাননসহ সব জায়গায় অবিলম্বে যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে, যা এখনই কার্যকর হবে।' শরিফ এই দূরদর্শী পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়ে দুই দেশের নেতৃত্বের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে তিনি বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য চূড়ান্ত আলোচনার লক্ষ্যে ১০ এপ্রিল শুক্রবার উভয় দেশের প্রতিনিধিদলকে ইসলামাবাদে আমন্ত্রণ জানান। শরিফ আশা প্রকাশ করেন যে, 'ইসলামাবাদ আলোচনা' টেকসই শান্তি অর্জনে সফল হবে।

মার্কিন মিডিয়ার প্রতিবেদন ও যোগাযোগ

মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিবিএস নিউজ জানিয়েছে, দুই সপ্তাহের এই যুদ্ধবিরতি চূড়ান্ত করার আগে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও পাকিস্তানের ফিল্ড মার্শাল মুনিরের সঙ্গে কথা বলেছেন। প্রতিবেদন অনুযায়ী, পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল মুনির রাতভর মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাগচির সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করেছেন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

কূটনৈতিক সাফল্যে ছোট ভুল ও বিতর্ক

তবে ইসলামাবাদের এই কূটনৈতিক সাফল্যের মধ্যে একটি ছোট ভুল বিতর্ক তৈরি করেছে। শাহবাজ শরিফ প্রথমে একটি পোস্ট করেছিলেন, যেখানে তিনি ট্রাম্পকে সময়সীমা বাড়ানোর অনুরোধ জানান। সেই পোস্টে ভুলবশত লেখা ছিল, 'ড্রাফট-এক্স-এ পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর বার্তা।' পরে এটি সংশোধন করা হলেও স্ক্রিনশট ছড়িয়ে পড়ে এবং দাবি করা হয় যে, পাকিস্তানি প্রধানমন্ত্রী হোয়াইট হাউসের পাঠানো বার্তা 'কাট-পেস্ট' করেছেন।

যুদ্ধবিরতির পেছনের কূটনীতি

পাকিস্তানের কূটনৈতিক তৎপরতা যুদ্ধবিরতির কয়েক ঘণ্টা আগে ট্রাম্প বলেছিলেন, 'আজ রাতে পুরো সভ্যতা মারা যাবে, যা আর কখনো ফিরে আসবে না।' তাহলে ওয়াশিংটন ও তেহরান কীভাবে একমত হলো? এর উত্তর হলো, মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাগচি ও মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তানের ফিল্ড মার্শাল মুনিরের দক্ষ কূটনীতি। ইসলামাবাদ মার্চ মাসের শেষ দিক থেকেই উপসাগরীয় অঞ্চলে শান্তির জন্য চেষ্টা করছিল। গত ২৯ মার্চ তারা তুরস্ক, সৌদি আরব ও মিসরের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের নিয়ে একটি বৈঠক করে।

যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় যখন দুই পক্ষই একটি সম্মানজনক প্রস্থানের পথ খুঁজছিল, তখন পাকিস্তান নেপথ্য আলোচনার প্রধান মাধ্যম হয়ে ওঠে। পাকিস্তানই যুক্তরাষ্ট্রের ১৫ দফার প্রস্তাব ইরানের কাছে পৌঁছে দেয় এবং পরে ইরানের জবাব ওয়াশিংটনকে জানায়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান কেন ইসলামাবাদকে বিশ্বাস করে? মধ্যস্থতাকারী হতে হলে দুই পক্ষেরই আস্থা থাকা জরুরি। আরবের প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের গভীর সম্পর্কের কারণে ইরান তাদের আর বিশ্বাস করছে না। উপরন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলার জবাবে ইরান উপসাগরীয় কিছু দেশে হামলাও চালিয়েছে।

পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কের গুরুত্ব

অন্যদিকে পাকিস্তানের সঙ্গে ইরানের সীমান্ত রয়েছে। দেশ দুটির মধ্যে ঘনিষ্ঠ কূটনৈতিক সম্পর্ক বিদ্যমান, যা আরাগচির 'প্রিয় ভাই' সম্বোধন থেকেই স্পষ্ট। এ ছাড়া ফিলিস্তিন ইস্যুতে ইসরায়েলের সঙ্গে পাকিস্তানের কোনো কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই, যা ইরানের আস্থার একটি বড় কারণ। যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও গত এক বছরে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কের বেশ উন্নতি হয়েছে। ইসলামাবাদ ট্রাম্পের 'বোর্ড অব পিস'-এ যোগ দিয়েছে, যা গাজায় শান্তি প্রতিষ্ঠায় কাজ করছে। ট্রাম্প ইতিমধ্যে আসিম মুনিরকে তাঁর 'প্রিয় ফিল্ড মার্শাল' হিসেবে অভিহিত করেছেন। মুনিরের সঙ্গে মার্কিন ও ইরানি প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাদের গভীর যোগাযোগ থাকায় পাকিস্তান এই আলোচনায় বাড়তি সুবিধা পেয়েছে।

পাকিস্তানের যুদ্ধবিরতি প্রয়োজন কেন?

পাকিস্তানের এই আগ্রহ কেবল ভূরাজনৈতিক নয়; বরং জীবন-মরণ সমস্যা। দেশটি তার অধিকাংশ তেল মধ্যপ্রাচ্য থেকে পায়। তা ছাড়া বহু পাকিস্তানি মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে কাজ করে রেমিট্যান্স পাঠান। যুদ্ধের ফলে এবং ইরানের হরমুজ প্রণালি অবরোধের কারণে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়ে গিয়েছিল, যা শাহবাজ সরকারের ওপর প্রচণ্ড চাপ তৈরি করেছিল। এ ছাড়া পাকিস্তানের বর্তমান অর্থনৈতিক সংকট ও প্রতিবেশী আফগানিস্তানের সঙ্গে বিরোধ তো আছেই। ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক এমনিতেই উত্তপ্ত। এর মধ্যে অন্য প্রতিবেশী ইরানের অস্থিরতা পাকিস্তানের জন্য মোটেও সুখকর নয়। দেশের ভেতরেও স্থিতিশীলতার সংকট ছিল। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি হামলায় আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুর খবরে পাকিস্তানে ব্যাপক বিক্ষোভ হয় এবং বেশ কয়েকজন প্রাণ হারান।

ভবিষ্যত চ্যালেঞ্জ ও উদ্‌যাপনের সময়

দুই সপ্তাহের এই যুদ্ধবিরতি এখনো অত্যন্ত নড়বড়ে। যদি এই শান্তি আলোচনা ভেস্তে যায়, তবে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তানের ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এমনকি কোনো ভুল না থাকলেও দুই পক্ষের যেকোনো একটি পক্ষ ইসলামাবাদকে দায়ী করতে পারে। সবচেয়ে বড় কথা হলো, পাকিস্তান এই যুদ্ধবিরতি কার্যকর রাখার মতো শক্তিশালী ভূরাজনৈতিক শক্তি নয়। যদি আবার যুদ্ধ শুরু হয়, তবে পাকিস্তান উভয়সংকটে পড়বে। যুক্তরাষ্ট্রের দিকে ঝুঁকলে দেশের ভেতরে অস্থিরতা বাড়বে আর ইরানকে সমর্থন দিলে ওয়াশিংটন ও উপসাগরীয় বন্ধুদের হারাবে।