ইরান-যুক্তরাষ্ট্র দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি: ইসলামাবাদে আলোচনার সূচনা
মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে। বুধবার ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ এই ঘোষণা দেয়, যা বৈশ্বিক শান্তি প্রক্রিয়ায় নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে। তেহরানের ১০ দফা প্রস্তাবকে ভিত্তি করে আগামী শুক্রবার পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হবে বলে নিশ্চিত করা হয়েছে।
ট্রাম্পের হুমকি স্থগিত ও যুদ্ধবিরতির শর্ত
ইরানের এই ঘোষণার পূর্বে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে একটি পোস্টে জানান, তিনি ইরানি সভ্যতা ধ্বংসের হুমকি আপাতত স্থগিত করেছেন। ট্রাম্প স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, যুক্তরাষ্ট্র দুই সপ্তাহের জন্য ইরানের ওপর সামরিক হামলা বন্ধ রাখবে। তবে এই যুদ্ধবিরতির সাফল্য নির্ভর করছে ইরান হরমুজ প্রণালিকে ‘পুরোপুরি ও নিরাপদে’ খুলে দেওয়ার ওপর।
হরমুজ প্রণালি পারস্য উপসাগরকে আরব সাগরের সঙ্গে যুক্তকারী একটি কৌশলগত জলপথ, যা বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ বহন করে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার প্রতিক্রিয়ায় তেহরান আংশিকভাবে এই প্রণালি বন্ধ করে দেয়, যার ফলে বৈশ্বিক বাণিজ্যে বিঘ্ন, তেলের দাম বৃদ্ধি এবং জ্বালানিসংকট দেখা দিয়েছিল।
ইরানের পাল্টা হামলা ও আঞ্চলিক প্রভাব
ইরানের পাল্টা হামলা উপসাগরীয় অঞ্চলে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে, যেখানে লেবাননের হিজবুল্লাহ এবং ইয়েমেনের হুতি গোষ্ঠী সংঘাতে জড়িয়ে ইসরায়েলের ওপর হামলা চালায়। এই ঘটনায় আঞ্চলিক সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছিল। ট্রাম্প দাবি করেন যে, যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যে সব সামরিক লক্ষ্য ‘পূরণ করেছে এবং ছাড়িয়ে গেছে’ এবং একটি দীর্ঘমেয়াদি শান্তিচুক্তির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া পোস্টে নিশ্চিত করেন যে, ইরানের ওপর হামলা বন্ধ হলে দেশটির সশস্ত্র বাহিনীও প্রতিরক্ষামূলক কার্যক্রম বন্ধ করবে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে নিরাপদ চলাচল সম্ভব হবে এবং ট্রাম্প ইরানের ১০ দফা প্রস্তাবকে আলোচনার ভিত্তি হিসেবে মেনে নেওয়ায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
পাকিস্তানের ভূমিকা ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এক্সে দেওয়া পোস্টে জানান, যুদ্ধরত পক্ষগুলো ‘তাত্ক্ষণিকভাবে সর্বত্র যুদ্ধবিরতিতে’ সম্মত হয়েছে, যার মধ্যে লেবাননসহ অন্যান্য অঞ্চলও অন্তর্ভুক্ত। তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে ধন্যবাদ জানিয়ে ১০ এপ্রিল ইসলামাবাদে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর প্রতিনিধিদলকে আমন্ত্রণ জানান, যাতে সব বিরোধ চূড়ান্তভাবে সমাধান এবং একটি চুক্তিতে পৌঁছানো যায়।
ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের তথ্যমতে, তাদের ১০ দফা প্রস্তাবে হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের প্রাধান্য ও তদারকির দাবি রয়েছে, যা দেশটিকে একটি ‘বিশেষ অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক অবস্থান’ দেবে। প্রস্তাবের অন্যান্য দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে:
- মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সব যুদ্ধরত বাহিনীকে ঘাঁটি থেকে প্রত্যাহার
- ইরানের মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান বন্ধ করা
- যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণ ক্ষতিপূরণ প্রদান
- যুক্তরাষ্ট্র, জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ এবং আইএইএর সব নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার
- বিদেশে জব্দ করা ইরানের সম্পদ মুক্ত করা
- চূড়ান্ত চুক্তিকে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের মাধ্যমে অনুমোদন করানো
আলোচনার ভবিষ্যৎ ও ইরানের সতর্কতা
জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, তেহরান আলোচনায় সম্মত হলেও মার্কিনপক্ষের প্রতি তাদের সম্পূর্ণ অবিশ্বাস রয়ে গেছে। আলোচনার জন্য দুই সপ্তাহ সময় নির্ধারণ করা হয়েছে, যা পক্ষগুলোর সম্মতিতে বৃদ্ধি করা যেতে পারে। তবে পরিষদ সতর্ক করে দিয়ে বলেছে, যদি শত্রুপক্ষ ‘সামান্যতম ভুল’ করে, তাহলে ইরান পূর্ণ শক্তি দিয়ে প্রতিক্রিয়া জানাতে প্রস্তুত আছে।
এ বিষয়ে ইসরায়েলের পক্ষ থেকে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য পাওয়া যায়নি, যা আঞ্চলিক শান্তি প্রক্রিয়ার একটি অনিশ্চিত দিক হিসেবে রয়ে গেছে। এই যুদ্ধবিরতি ও আলোচনা মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।



