যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলায় ইরানের উপাসনালয় ধ্বংস, ট্রাম্পের হুমকিতে বিশ্ববাজারে অস্থিরতা
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ বন্ধে চুক্তি করতে এবং হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বেঁধে দেওয়া সময়সীমা শেষ হওয়ার আগেই ইরানের বেসামরিক স্থাপনায় ব্যাপক হামলা শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। এই হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে বেসামরিক সেতু, রেল, কারখানা এবং ধর্মীয় উপাসনালয়ও। ইতিমধ্যে, ট্রাম্প হুমকি দিয়ে বলেছেন যে ইরানের 'পুরো সভ্যতা ধ্বংস' করা হবে, যা আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞদের মতে যুদ্ধাপরাধের আশঙ্কা সৃষ্টি করেছে।
সময়সীমা ও হুমকির প্রেক্ষাপট
ট্রাম্পের সময়সীমা শেষ হওয়ার কথা ছিল যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় গত মঙ্গলবার রাত আটটায়, যা বাংলাদেশের সময় আজ বুধবার সকাল ছয়টা। এর আগে তিনি একাধিকবার হুমকি দিয়ে জানিয়েছিলেন যে, সময়সীমার মধ্যে ইরান চুক্তি না করলে এবং হরমুজ প্রণালি খুলে না দিলে দেশটির সেতু ও বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ বেসামরিক স্থাপনায় হামলা চালানো হবে। তিনি দাবি করেন যে ইরানে 'নরক নামিয়ে' আনা হবে, যদিও এই বক্তব্যকে অনেক বিশ্লেষক 'নিন্দনীয় ও বেআইনি' বলে উল্লেখ করেছেন।
হামলার বিস্তারিত ও প্রভাব
সময়সীমা শেষ হওয়ার আগেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিভিন্ন স্থানে হামলা চালিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে:
- কাশান শহরে একটি রেলসেতুতে হামলা, যেখানে দুজন নিহত হয়েছেন।
- ইসরায়েলের দাবি অনুযায়ী আটটি সেতুতে হামলা, যেগুলো তেহরান, কারাজ, তাবরিজ ও কোম শহরে অবস্থিত।
- খোররামবাদ বিমানবন্দর ও শিরাজ শহরের একটি পেট্রোকেমিক্যাল কারখানায় হামলা।
- তেহরানে ইহুদিদের রাফিনিয়া সিনাগগ ধ্বংস, যা ইরানের ইহুদি সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি হোমায়ুন সামেহের মতে একটি 'জঘন্য ঘটনা'।
এই হামলায় ইরানে এখন পর্যন্ত ২ হাজারের বেশি মানুষ নিহত এবং ২৬ হাজারের বেশি আহত হয়েছেন। তবে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান দাবি করেছেন যে ১ কোটি ৪০ লাখের বেশি ইরানি দেশকে রক্ষার জন্য নিজেদের জীবন উৎসর্গ করতে প্রস্তুত রয়েছেন।
বিশ্ববাজারে অর্থনৈতিক প্রভাব
ট্রাম্পের হুমকি এবং হামলার প্রভাবে বিশ্ববাজারে ব্যাপক অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। গতকাল প্রতি ব্যারেল জ্বালানি তেলের দাম ১১০ ডলারের ওপরে উঠেছে, যা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য একটি উদ্বেগজনক সংকেত। এছাড়া, জাপানের নিক্কেই-২২৫ সূচক এবং সিঙ্গাপুরের স্ট্রেইটস টাইমস সূচকেও পতন হয়েছে, যা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে শঙ্কা বাড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রেও গ্যাসোলিনের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে, যা দেশটির অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করছে।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও আইনি দিক
যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিকরা ইরানের বেসামরিক স্থাপনায় হামলাকে 'কালো দাগ' এবং যুদ্ধাপরাধ বলে উল্লেখ করেছেন। অ্যারিজোনার ডেমোক্র্যাট সিনেটর মার্ক কেলি এবং কানেকটিকাটের ডেমোক্র্যাট সিনেটর ক্রিস মার্ফি সরাসরি এই হামলাকে নিন্দা জানিয়েছেন। জাতিসংঘের জেনেভা সনদ অনুযায়ী, যুদ্ধের সময় বেসামরিক স্থাপনায় হামলা চালানো যুদ্ধাপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। ইরানি রেড ক্রিসেন্ট গতকাল এক বিবৃতিতে জানিয়েছে যে ১৭টি বেসামরিক স্থাপনায় হামলা হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন।
ভবিষ্যত সম্ভাবনা ও কূটনৈতিক প্রচেষ্টা
যুদ্ধ বন্ধের চুক্তি নিয়ে কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে, তবে পাকিস্তানের পাঠানো প্রস্তাব কোনো পক্ষই গ্রহণ করেনি। ইরানের ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড কোর (আইআরজিসি) হুমকি দিয়েছে যে, যদি ইরানের বেসামরিক স্থাপনায় হামলা অব্যাহত থাকে, তাহলে তারা মধ্যপ্রাচ্যের বাইরেও হামলা চালাতে পারে। এদিকে, হরমুজ প্রণালি নিয়ে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে একটি প্রস্তাব চীন ও রাশিয়ার ভেটোয় বাতিল হয়েছে, যা ইরানের পক্ষে গেছে বলে মনে করা হচ্ছে।
ইউনিভার্সিটি অব তেহরানের অধ্যাপক হাসান আহমাদিয়ান মনে করেন যে, ইরানের অনড় অবস্থান ট্রাম্পকে ক্ষুব্ধ করছে এবং তিনি চান ইরানিরা তাঁর হুমকিকে গুরুত্বের সঙ্গে নিক। তবে যুদ্ধের শুরু থেকেই ইরানিরা দৃঢ় অবস্থান বজায় রেখেছে, যা ট্রাম্পের লক্ষ্য পূরণে বাধা সৃষ্টি করছে। এই সংঘাতের ফলে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠা কঠিন হয়ে পড়ছে এবং বিশ্বব্যাপী তারল্য ঝুঁকি বাড়ছে।



