হরমুজ প্রণালীতে ট্রাম্পের হুমকি সত্ত্বেও ইরানের সঙ্গে চুক্তি করে এশিয়ার দেশগুলো
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হরমুজ প্রণালি খুলে না দিলে ইরানকে "এক রাতেই গুঁড়িয়ে দেওয়ার" হুমকি দিয়েছেন। তবে এই হুমকির মধ্যেই ভারত, পাকিস্তান, ফিলিপাইন ও চীনসহ এশিয়ার বেশ কয়েকটি দেশ তেহরানের সঙ্গে আলাদা চুক্তি করে এই কৌশলগত নৌপথ দিয়ে তাদের জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে। বিশ্বের মোট জ্বালানি সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ এই সরু জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয় বলে এই অঞ্চল বর্তমানে বৈশ্বিক উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
এশিয়ার দেশগুলোর জ্বালানি নিরাপত্তায় ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক চুক্তি
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোয় পাকিস্তান, ভারত, ফিলিপাইন ও চীন তেহরানের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে জাহাজ চলাচলের অনুমতি পেয়েছে। ফিলিপাইনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী তেরেসা লাজারো জানান, ইরান ফিলিপাইনের পতাকাবাহী জাহাজগুলোর "নিরাপদ, নিরবচ্ছিন্ন ও দ্রুত" যাতায়াতের আশ্বাস দিয়েছে। দেশটি তাদের চাহিদার ৯৮ শতাংশ তেল মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি করে এবং ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনার কারণে তেলের দাম বৃদ্ধি পেয়ে তারা জাতীয় জ্বালানি জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছিল।
পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার বলেছেন, ইরান তাদের ২০টি জাহাজ চলাচলের অনুমতি দিয়েছে এবং সংলাপ ও কূটনীতিই সামনের দিকে এগোনোর একমাত্র পথ। ভারতও এই পথে তাদের জাহাজ চলাচলে ইরানের সমর্থন পেয়েছে, যার বিষয়ে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর নিশ্চিত করেছেন।
ট্রাম্পের হুমকি ও যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান
যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় মঙ্গলবার রাত ৮টার মধ্যে হরমুজ প্রণালি খুলে না দিলে ইরানকে ধ্বংস করার হুমকি দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে গত সপ্তাহে ট্রাম্প বলেছিলেন, মধ্যপ্রাচ্যের তেলের প্রয়োজন যুক্তরাষ্ট্রের নেই এবং যেসব দেশ এই অঞ্চলের জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল, তাদের নিজেদের জাহাজ সুরক্ষায় এই প্রণালিতে যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর আহ্বান জানিয়েছেন।
ইরান যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলার জবাবে এই প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন ঘটানোর হুমকি দেওয়ায় এলাকাটিতে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। নৌপথটিতে এই অস্থিরতার কারণে বিশ্ববাজারে তেলের দাম ইতিমধ্যেই উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে, যা বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতামত ও অনিশ্চয়তা
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইরানের সঙ্গে এই চুক্তিগুলো বড় কূটনৈতিক সাফল্য হলেও এটি স্থায়ী সমাধান নয়। শিপিং কনসালটেন্সি প্রতিষ্ঠান মারিস্কের দিমিত্রিস মানিয়াতিস বলেন, এই নিরাপত্তা কি কেবল নির্দিষ্ট কিছু জাহাজের জন্য, নাকি কোনো দেশের পতাকাবাহী সব জাহাজের জন্য, তা এখনো পরিষ্কার নয়। ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি সিডনির রোক শি বলেছেন, যে দেশগুলোর উপসাগরীয় জ্বালানি প্রয়োজন, তারা এখন বুঝতে পারছে যে জাহাজ চলাচল সচল রাখতে হলে ইরানের সঙ্গে আলোচনা ছাড়া উপায় নেই।
ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুরের এনার্জি স্টাডিজ ইনস্টিটিউটের রজার ফকেট বলেন, ইরান দাবি করেছে যে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা বাদে সবার জন্য এই পথ খোলা। ফিলিপাইন যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র হওয়া সত্ত্বেও তাদের সঙ্গে চুক্তি করাটা ইঙ্গিত দেয় যে ইরান কৌশলগতভাবে বিষয়টি দেখছে এবং হয়তো কোনো দেশের মিত্রতা ও যুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণের মধ্যে পার্থক্য করছে।
অন্যান্য দেশের অবস্থান ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
চীন ইরানি তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা এবং গত সপ্তাহে তারা তাদের জাহাজ চলাচলের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। বেইজিংয়ের সঙ্গে তেহরানের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে এবং চীন ও পাকিস্তান মিলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর করার চেষ্টা করছে। মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমও তাঁদের জাহাজ চলাচলের সুযোগ দেওয়ায় ইরানের প্রেসিডেন্টকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন, কারণ দেশটির দুই-তৃতীয়াংশ তেল এই অঞ্চল থেকে আসে।
জাহাজগুলো কোন শর্তে বা কোনো শুল্ক দিয়ে পার হচ্ছে কি না, তা এখনো অস্পষ্ট থেকে যাচ্ছে। গত সপ্তাহান্তে জাপানের একটি এলএনজি জাহাজ এই প্রণালি পার হয়েছে, তবে জাপানি কোম্পানি ‘মিতসুই ওএসকে লাইনস’ কোনো শুল্ক দেওয়া হয়েছে কি না, সে বিষয়ে মন্তব্য করেনি। এখন প্রশ্ন উঠছে, নিরাপত্তা না পাওয়া দেশগুলোর জাহাজ কি অন্য দেশের পতাকা ব্যবহার করে পারাপার করবে, যেমন বর্তমানে অনেক ট্যাংকার পানামা বা মার্শাল আইল্যান্ডের পতাকা ব্যবহার করে থাকে।
অর্থনীতিবিদ রোক শি সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি এই নিশ্চয়তাকে কত দিন টিকিয়ে রাখবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে এবং এই চুক্তিগুলো দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নাও হতে পারে। হরমুজ প্রণালি নিয়ে এই উত্তেজনা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে চলমান অস্থিরতা বাড়িয়ে তুলছে, যা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।



