ইয়েমেনের সানায় হুথি-ইসরায়েল উত্তেজনায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তা
সানার ঘিঞ্জি গলিতে ইয়াসিরের ছোট্ট আইসক্রিমের দোকানটি তার পরিবারের একমাত্র ভরসা। ১০ বাই ১০ ফুটের এই দোকানে তিনটি ফ্রিজে ঠাসা বরফ করা পণ্য রয়েছে। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধে হুথি বিদ্রোহীদের জড়িয়ে পড়া এখন ইয়াসিরের মতো সাধারণ মানুষের কপালে গভীর চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ইসরায়েল যখন হুথিদের ওপর পাল্টা হামলা শুরু করবে, তখন আমাদের এই সামান্য স্বস্তিটুকুও কেড়ে নেওয়া হবে। ভয়, আকাশচুম্বী দাম আর জ্বালানি সংকট আমাদের শ্বাসরোধ করে ফেলবে।
হুথিদের হামলা ঘোষণা ও সাধারণ মানুষের প্রতিক্রিয়া
গত ২৮ মার্চ ইরানের সমর্থনে ইসরায়েলে প্রথম হামলার দাবি করে সানা নিয়ন্ত্রণকারী হুথি বিদ্রোহীরা। তারা ঘোষণা করেছে, লক্ষ্য অর্জন না হওয়া পর্যন্ত এই হামলা চলবে। যদিও এখন পর্যন্ত এই হামলাগুলো সীমিত এবং ইসরায়েল তা প্রতিহত করেছে, তবুও সানার সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক এখন চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। ইয়েমেনের মানুষের জন্য ইসরায়েলি হামলা নতুন কিছু নয়। ২০২৪ ও ২০২৫ সালেও ইসরায়েল ইয়েমেনে বারবার হামলা চালিয়েছে। সানার ট্যাক্সি ড্রাইভার আম্মার আহমেদ (২৮) সেই হামলার স্মৃতি ভুলতে পারছেন না। তিনি বলেন, বিস্ফোরণের বিকট শব্দে মনে হয় কোনও জায়গাই নিরাপদ নয়। আমাদের কোনও সতর্ক সংকেত দেওয়ার ব্যবস্থাও নেই।
শহর থেকে গ্রামে পালানোর চিন্তা ও ভাড়াটিয়া নির্বাচনে সতর্কতা
হুথিরা ইসরায়েলে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার ঘোষণা দেওয়ার পর থেকেই আম্মার তার স্ত্রী ও চার সন্তানকে নিয়ে গ্রামে চলে যাওয়ার কথা ভাবছেন। তার মতে, শহরগুলো হামলার জন্য বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। এদিকে, সানার বাড়ির মালিকরা এখন ভাড়াটিয়া নির্বাচনের ক্ষেত্রেও সাবধানী হয়ে উঠেছেন। দুই তলা বাড়ির মালিক আবদুর রহমান বলেন, আমি এখন সাধারণ মানুষকে ভাড়া দিতে পছন্দ করি। যদি কোনও হুথি কর্মকর্তা আমার বাড়িতে থাকে এবং ইসরায়েলি গোয়েন্দারা তা জানতে পারে, তবে তাকে মারতে গিয়ে পুরো ভবনটিই উড়িয়ে দেওয়া হবে।
অর্থনীতির ওপর মারাত্মক আঘাত ও বিশ্লেষকদের মতামত
ইয়েমেনের অর্থনীতি এমনিতেই পঙ্গু অবস্থায় রয়েছে। হুথিদের এই যুদ্ধে জড়ানোকে অর্থনীতির জন্য মারাত্মক আঘাত বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। অর্থনৈতিক গবেষক ওয়াসিক সালেহ বলেন, এর ফলে লোহিত সাগরের বাব আল-মান্দেব প্রণালি একটি বিপজ্জনক সামরিক অঞ্চলে পরিণত হবে। খাদ্য, জ্বালানি ও ওষুধের দাম বহুগুণ বেড়ে যাবে। তিনি আরও জানান, সমুদ্রের এই উত্তেজনায় মৎস্য খাত পঙ্গু হয়ে পড়বে, যার ওপর প্রায় ৫ লাখ ইয়েমেনি নির্ভরশীল। এছাড়া হুদাইদাহ বন্দরে হামলা হলে মানবিক সহায়তা পৌঁছানোও বাধাগ্রস্ত হবে।
হুথি সমর্থকদের অবস্থান ও সাধারণ মানুষের হতাশা
জনগণের মধ্যে উদ্বেগ থাকলেও হুথি সমর্থকদের একাংশ এখনও তাদের নেতৃত্বের ওপর আস্থাশীল। ২৬ বছর বয়সী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী মোহাম্মদ আলী বলেন, আমরা এক দশকেরও বেশি সময় ধরে যুদ্ধ সহ্য করছি। আমরা প্রতিরোধ ছাড়ব না। বৃহস্পতিবার এক ভাষণে হুথি প্রধান আবদেল-মালেক আল-হুথি বলেন, এই সংঘাতের বাইরে থাকা কোনও বুদ্ধিমানের কাজ নয়। তার দাবি, ইসরায়েলি পরিকল্পনা পুরো মধ্যপ্রাচ্য বদলে দেওয়া। এমন সময়ে তারা হাত গুটিয়ে বসে থাকতে পারেন না। তবে ইয়াসিরের মতো সাধারণ মানুষ এখন প্রতি রাতে টিভির খবরের দিকে তাকিয়ে থাকেন আর দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। ইয়াসির বলেন, আমরা এই যুদ্ধের পরিণতি ভোগ করার জন্য মোটেও প্রস্তুত নই। নিজেদের অভ্যন্তরীণ লড়াইয়ে আমরা আগেই ক্লান্ত হয়ে পড়েছি।



