ইরানে মার্কিন এফ-১৫ই বিমানের দ্বিতীয় ক্রু সদস্য জীবিত উদ্ধার, যুদ্ধ ষষ্ঠ সপ্তাহে
ইরানের আকাশসীমায় ভূপাতিত মার্কিন যুদ্ধবিমান এফ-১৫ই থেকে নিখোঁজ হওয়া দ্বিতীয় ক্রু সদস্যকেও জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। দীর্ঘ শ্বাসরুদ্ধকর তল্লাশি ও উদ্ধার অভিযানের পর রবিবার ভোরে দুজন মার্কিন কর্মকর্তা এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। এর আগে শুক্রবার বিমানটি ভূপাতিত হওয়ার পরপরই অন্য এক ক্রু সদস্যকে উদ্ধার করা হয়েছিল। মার্কিন বার্তা সংস্থা এপি এ খবর জানিয়েছে।
যুদ্ধের ষষ্ঠ সপ্তাহে উত্তেজনা ও হতাহতের পরিসংখ্যান
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বিমান হামলার মাধ্যমে শুরু হওয়া এই যুদ্ধ এখন ষষ্ঠ সপ্তাহে পদার্পণ করেছে। এই সংঘাতের ফলে হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে, বিশ্ববাজার ও জ্বালানি তেলের দামে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে এবং গুরুত্বপূর্ণ নৌপথগুলো বন্ধ হয়ে গেছে। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইরানে ১ হাজার ৯০০-এর বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া উপসাগরীয় দেশগুলো ও পশ্চিম তীরে ২৪ জন, ইসরায়েলে ১৯ জন এবং ১৩ জন মার্কিন সেনাসদস্য প্রাণ হারিয়েছেন। লেবাননে মৃতের সংখ্যা ১ হাজার ৪০০ ছাড়িয়েছে এবং সেখান থেকে ১০ লাখেরও বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। লেবাননে ১০ জন ইসরায়েলি সেনাও নিহত হয়েছেন।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের হুমকি ও ইরানের পাল্টা জবাব
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত সপ্তাহে দাবি করেছিলেন যে ইরান ‘ধ্বংস’ হয়ে গেছে এবং যুদ্ধ খুব দ্রুত শেষ হবে। কিন্তু তার দুই দিন পরই ইরান দুটি মার্কিন সামরিক বিমান (এফ-১৫ই এবং এ-১০) ভূপাতিত করে নিজেদের পাল্টা আঘাত হানার সক্ষমতা জানান দেয়। ইরানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় পাহাড়ি এলাকায় এই উদ্ধার অভিযান চলাকালে তেহরান ‘শত্রু পাইলট’কে ধরিয়ে দিতে পুরস্কারের ঘোষণাও দিয়েছিল। বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম ধমনী হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে ইরানকে সোমবার পর্যন্ত সময় দিয়েছেন ট্রাম্প। শনিবার সোশ্যাল মিডিয়ায় তিনি এক চরম বার্তায় বলেন, ‘মনে আছে, আমি ১০ দিন সময় দিয়েছিলাম? সময় শেষ হয়ে আসছে, আর মাত্র ৪৮ ঘণ্টা, এরপর তাদের ওপর নরক নেমে আসবে।’ এর জবাবে ইরানের জয়েন্ট মিলিটারি কমান্ডের জেনারেল আলী আবদুল্লাহি আলিয়াবাদি রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে বলেছেন, যদি ইরানের অবকাঠামোতে কোনও আক্রমণ করা হয়, তবে ‘তোমাদের জন্য নরকের দরজা খুলে যাবে’। তিনি এই অঞ্চলে মার্কিন সামরিক বাহিনীর ব্যবহৃত সব অবকাঠামোতে পাল্টা হামলার হুমকি দিয়েছেন।
ইরানের সামরিক দাবি ও নৌপথের হুমকি
ইরানের সামরিক কমান্ডের দাবি, তারা শুক্রবার দুটি মার্কিন ব্ল্যাক হক হেলিকপ্টারেও আঘাত হেনেছে। তবে এই তথ্যের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। হরমুজ প্রণালির পর এবার এই অঞ্চলের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ বাব আল-মানদেব নিয়েও প্রচ্ছন্ন হুমকি দিয়েছেন ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের ঘালিবাফ। লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরকে যুক্তকারী এই পথ দিয়ে বিশ্বের ১০ শতাংশ তেল এবং ২৫ শতাংশ কন্টেইনার জাহাজ চলাচল করে। ঘালিবাফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশ্ন তুলেছেন, কোন দেশ বা কোম্পানিগুলো এই পথ সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করে? এর মাধ্যমে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন যে ইরান চাইলে এই পথেও জাহাজ চলাচল বিঘ্নিত করতে পারে।
নেপথ্যে আলোচনার আশা ও কূটনৈতিক প্রচেষ্টা
রণক্ষেত্রে উত্তেজনা থাকলেও নেপথ্যে আলোচনার আশা এখনও ফুরিয়ে যায়নি। পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র তাহির আনদ্রাবি জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনার আয়োজন করার প্রচেষ্টা ‘সঠিক পথেই’ আছে। তুরস্ক, মিসর ও পাকিস্তান যৌথভাবে দুই পক্ষকে আলোচনার টেবিলে আনার কাজ করছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচিও জানিয়েছেন, ইরানি কর্মকর্তারা ইসলামাবাদে আলোচনায় বসতে ‘কখনও অস্বীকার করেননি’। একটি সম্ভাব্য আপস প্রস্তাবের মাধ্যমে যুদ্ধ বন্ধ করে কূটনৈতিক সমাধানের পথ খোঁজা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট কূটনীতিকরা জানিয়েছেন।



