ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় রাশিয়ার তেল রফতানি ও যুদ্ধক্ষেত্রে অগ্রযাত্রা ব্যাহত
গত এক সপ্তাহে ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় রাশিয়ার তেল রফতানি সক্ষমতা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যুদ্ধক্ষেত্রে রুশ বাহিনীর অগ্রযাত্রা রুখে দেওয়ার পাশাপাশি দখলকৃত বেশ কিছু এলাকা পুনরুদ্ধার করেছে কিয়েভ। আল জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত তিন মাসে রাশিয়ার অগ্রসর হওয়ার হার অর্ধেকে নেমে এসেছে, যা ইউক্রেনের জন্য একটি উল্লেখযোগ্য সাফল্য হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে।
জেলেনস্কির নতুন ড্রোন চুক্তি ও যুদ্ধক্ষেত্রের উন্নতি
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বুধবার এক ভিডিও বার্তায় জানান, বর্তমানে যুদ্ধক্ষেত্রের পরিস্থিতি গত ১০ মাসের মধ্যে সবচেয়ে ভালো অবস্থায় রয়েছে। তিনি ড্রোন প্রযুক্তি রফতানি এবং যৌথভাবে ড্রোন উৎপাদনের বিষয়ে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতারের সঙ্গে চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার কথা উল্লেখ করেন। জর্ডান, কুয়েত, ইরাক ও বাহরাইনের সঙ্গেও এ নিয়ে আলোচনা চলছে, যেখানে আধুনিক হুমকি মোকাবিলায় ইউক্রেনের বহুস্তরী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অভিজ্ঞতায় এই দেশগুলো আগ্রহ প্রকাশ করছে।
ড্রোন হামলার প্রভাব ও রুশ ক্ষয়ক্ষতি
ইউক্রেনীয় সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান ওলেক্সান্ডার সিরস্কি জানান, ড্রোন বিধ্বংসী অভিযানের সংখ্যা ফেব্রুয়ারির তুলনায় মার্চ মাসে প্রায় ৫৫ শতাংশ বেড়েছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, বর্তমানে রাশিয়ার ৯০ শতাংশ হতাহতের ঘটনা ঘটছে রিমোট-নিয়ন্ত্রিত এফপিভি ড্রোনের মাধ্যমে, যা যুদ্ধের গতিপথ পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
প্রতিরক্ষামন্ত্রী মিখাইলো ফেদোরভের মতে, ২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসেই গত বছরের অর্ধেকের বেশি ড্রোন ও গোলাবারুদ কেনা হয়েছে। তিনি বলেন, ড্রোন প্রযুক্তির মাধ্যমে এখন ব্যয়বহুল বড় ক্যালিবারের কামানের গোলা ছাড়াই নিখুঁতভাবে শত্রুপক্ষের পদাতিক বাহিনী ও হালকা সরঞ্জামে আঘাত হানা সম্ভব হচ্ছে। ফেদোরভ আরও জানান, ইউক্রেন বর্তমানে ২০ কিলোমিটার পর্যন্ত উড়ে গিয়ে কয়েক দশ কেজি ওজনের বোমা ফেলতে সক্ষম নতুন প্রজন্মের ড্রোন পরীক্ষা করছে, যা ভবিষ্যতের যুদ্ধ কৌশলে বিপ্লব আনতে পারে।
তেল রফতানিতে বড় ধাক্কা ও রুশ কৌশলগত পরিবর্তন
ইউক্রেন গত এক সপ্তাহে রাশিয়ার বাল্টিক সাগরের প্রধান দুটি তেল রফতানি টার্মিনাল উস্ত-লুগা ও প্রিমরস্কে দফায় দফায় ড্রোন হামলা চালিয়েছে। রাশিয়ার মোট তেল রফতানির সক্ষমতার ৬০ শতাংশই এই দুটি বন্দরের ওপর নির্ভরশীল, এবং রয়টার্সের মতে, এই হামলার ফলে রাশিয়া তাদের তেল রফতানি সক্ষমতার প্রায় ৪০ শতাংশ হারিয়েছে। ব্লুমবার্গের তথ্য অনুযায়ী, রাশিয়ার দৈনিক তেল রফতানি ৪০ লাখ ব্যারেল থেকে কমে ২৩ লাখ ব্যারেলে দাঁড়িয়েছে, যা দেশটির অর্থনীতিতে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করছে।
অভ্যন্তরীণ বাজারে তেলের দাম স্থিতিশীল রাখতে রাশিয়া ১ এপ্রিল থেকে ৩১ জুলাই পর্যন্ত সব ধরনের পরিশোধিত পেট্রোল রফতানি নিষিদ্ধ করেছে। এ ছাড়া, সামারা অঞ্চলের একটি সামরিক বিস্ফোরক কারখানাতেও হামলা চালিয়েছে ইউক্রেন, যা বছরে ৩০ হাজার টন বিস্ফোরক তৈরি করত। ইউক্রেনীয় গোয়েন্দাদের দাবি, রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন ক্ষমতাও ৪৫ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে, যা যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে।
যুদ্ধক্ষেত্রে ইউক্রেনের অর্জন ও রুশ প্রতিক্রিয়া
গত ২৬ মার্চ ইউক্রেনের এয়ার অ্যাসল্ট ফোর্স ডনেস্ক ও দিনিপ্রোপেত্রোভস্ক অঞ্চলের সীমান্তে রুশ অগ্রযাত্রা রুখে দিয়ে বেরেজোভ গ্রামটি মুক্ত করেছে। সিরস্কির মতে, চলতি বছর ইউক্রেন ৪৭০ বর্গকিলোমিটার এলাকা পুনরুদ্ধার করেছে, যা ২০২৩ সালের পর তাদের প্রথম বড় কোনও সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ওয়াশিংটনভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক আইএসডব্লিউ জানিয়েছে, গত ১৮ মাসে রাশিয়ার অগ্রযাত্রার গতি দুই-তৃতীয়াংশ কমেছে। ২০২৪ সালের শেষ দিকে রাশিয়া দিনে গড়ে ১৪.৯ বর্গকিলোমিটার এলাকা দখল করলেও ২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসে তা মাত্র ৫.৫ বর্গকিলোমিটারে নেমে এসেছে। পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় রাশিয়ার রিয়াজান অঞ্চলের গভর্নর একটি ডিক্রি জারি করেছেন, যেখানে ১৫০ জনের বেশি কর্মী আছে এমন প্রতিটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে ২ থেকে ৫ জন কর্মীকে রুশ সামরিক বাহিনীতে যোগ দিতে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যা দেশটির অভ্যন্তরীণ চাপের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
ইরানের ভূমিকা ও কৌশলগত পরিবর্তন
ইউক্রেন ও ইরান যুদ্ধের মধ্যে রাশিয়ার সঙ্গে তেহরানের এক ধরনের কৌশলগত বিনিময় লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আগে রাশিয়া মূলত রাতে ড্রোন হামলা চালাত, কিন্তু গত ২৪ মার্চ থেকে তারা দিনের বেলাতেও ড্রোন হামলা শুরু করেছে। গত বুধবার রাশিয়া ইউক্রেনে ৭০০-এর বেশি ড্রোন ছুড়েছে, যার মধ্যে ৩৩৯টি রাতে ও ৩৬১টি দিনে নিক্ষেপ করা হয়েছে। ইউক্রেন এর ৯০ শতাংশই ভূপাতিত করেছে। আইএসডব্লিউ-এর মতে, সারাক্ষণ সতর্ক সংকেত বাজিয়ে বেসামরিক মানুষের মনে মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করতেই এই কৌশল নেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, হিজবুল্লাহর মতো ইরানি প্রক্সি গোষ্ঠীগুলো এখন ইসরায়েলি ট্যাংকে হামলার জন্য ইউক্রেনের উদ্ভাবিত এফপিভি ড্রোন প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। ধারণা করা হচ্ছে, রুশ প্রশিক্ষক বা ওয়াগনার গ্রুপের সদস্যরা এসব গোষ্ঠীকে এই প্রযুক্তিগত সহায়তা দিচ্ছে, যা আঞ্চলিক সংঘাতে নতুন মাত্রা যোগ করছে।



