আজ বিশ্ব পরিবেশ দিবস। সমগ্র বিশ্বব্যাপী প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা এবং পরিবেশ সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে এই দিবসটি উদ্যাপিত হয়। চলতি বছরে এই দিবসের মূল প্রতিপাদ্য হলো: 'প্রকৃতির অনুপ্রেরণায়, জলবায়ুর জন্য, আমাদের ভবিষ্যতের জন্য' (Inspired by Nature. For Climate. For Our Future.)। মূলত মানবসভ্যতার লাগামহীন লোভ এবং প্রকৃতির উপর অবিচারের ফলে আজ সমগ্র বিশ্ব এক মহাবিপর্যয়ের সম্মুখীন। তাই এই বিশেষ দিবস উপলক্ষ্যে আমাদের সঠিক আত্মোপলব্ধি ও ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা নির্ধারণের সময় এসেছে।
জলবায়ু পরিস্থিতি ও বাংলাদেশের ঝুঁকি
বর্তমানে বিশ্ব জলবায়ু পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। শিল্পোন্নত দেশসমূহের লাগামহীন কার্বন নিঃসারণের ফলে বৈশ্বিক উষ্ণতা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। মেরু অঞ্চলের বরফগলন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং অসময়ে অতিবৃষ্টি বা অনাবৃষ্টির মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ এখন নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের চরম ঝুঁকিতে থাকা দেশসমূহের মধ্যে অন্যতম। গ্রীষ্মের প্রচণ্ড দাবদাহ, আকস্মিক বন্যা এবং সাইক্লোনের মতো বিপর্যয় আমাদের জনজীবন ও অর্থনীতিকে বিপর্যস্ত করে তুলছে। সুপার এল নিনো নিয়েও আলোচনা চলমান। এই পরিস্থিতিতে বিশ্বনেতৃবৃন্দের কেবল কথার ফুলঝুরি নয়; বৈশ্বিক উষ্ণতা হ্রাসে তাদের প্রয়োজন আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক উদ্যোগ গ্রহণ ও তার বাস্তবায়ন।
প্রকৃতির প্রতিশোধ ও পরিত্রাণের উপায়
প্রকৃতপক্ষে প্রকৃতি তার আপন নিয়মেই চলতে ভালোবাসে। কিন্তু মানবজাতি যখন সেই নিয়মে হস্তক্ষেপ করেছে, প্রকৃতি তার নির্মম প্রতিশোধ নিয়েছে। বর্তমান জলবায়ু বিপর্যয় তারই এক জ্বলন্ত প্রমাণ। তবে এই মহাসংকট থেকে পরিত্রাণের অন্যতম এবং সবচেয়ে সহজ উপায় হলো ব্যাপকভাবে বৃক্ষরোপণ। বিশেষ করে, আসন্ন বর্ষাকাল গাছ লাগানোর জন্য সর্বাপেক্ষা উপযুক্ত সময়। বর্ষার পরিমিত বৃষ্টিপাত এবং আর্দ্র আবহাওয়া চারা গাছের দ্রুত বৃদ্ধি ও শিকড় ছড়ানোর জন্য সহায়ক। এই সময়ে রোপিত চারা গাছের বেঁচে থাকার হার বছরের অন্য যে কোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি থাকে।
বৃক্ষ কেবল আমাদের অক্সিজেনই প্রদান করে না, এটি বায়ুমণ্ডল থেকে ক্ষতিকারক কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে বৈশ্বিক উষ্ণতা হ্রাসে প্রধান ভূমিকা পালন করে। এছাড়া বৃক্ষের শিকড় মাটিকে দৃঢ়ভাবে ধরে রাখে, যা বর্ষাকালের অন্যতম প্রধান সমস্যা-ভূমিধস ও মৃত্তিকা ক্ষয় রোধে অত্যন্ত কার্যকরী। তবে পরিবেশ রক্ষায় বৃক্ষরোপণ শুধু সরকারের একার দায়িত্ব নয়। এই ক্ষেত্রে সকল নাগরিককে আন্তরিকভাবে এগিয়ে আসতে হবে।
সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ
উল্লেখ্য, প্রতি বছর সরকার বিভিন্ন প্রকারের বৃক্ষ রোপণ করেন। কিন্তু সেই গাছ আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে চুরি হয়ে যায়। ঠিকমতো যত্ন না নেওয়ার কারণেও অকালে মারা যায়। তারপরও এই কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, বিগত বিভিন্ন সরকারের নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করার ফলে এই দেশে গাছ লাগানো অনেকটা সহজাত অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। সরকার যেমন গাছের চারা বিতরণ করে, তেমনি বেসরকারি নানা উদ্যোগেও বৃক্ষরোপণ করা হয়। এমনকি আজকাল বাজারে গাছের চারা আগের যে কোনো সময়ের তুলনায় বেশি সংখ্যায় বিক্রয় হয়। এতে নার্সারি ব্যবসায়েরও প্রসার ঘটেছে। এখন প্রায় প্রতিটি বাড়িতে শিক্ষিত লোক রয়েছে। নতুন প্রজন্মের মধ্যেও গাছ লাগানোর ব্যাপারে তৈরি হয়েছে সচেতনতা। এই সবই ইতিবাচক এবং পরিবেশ রক্ষার ক্ষেত্রে সহায়ক। এখন শুধু গাছ লাগালেই চলবে না, গাছের যত্নের ব্যাপারে সর্বাধিক গুরুত্বারোপ করতে হবে।
আমাদের করণীয়
অতএব, কেবল দিবসভিত্তিক আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে, এই বর্ষায় আমাদের প্রত্যেককে অন্তত একটি করে ফলদ, বনজ বা ভেষজ চারা রোপণ করতে হবে। সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে খালি জায়গা, রাস্তার পার্শ্ব এবং নদীর তীরবর্তী অঞ্চলে ব্যাপক বনায়ন কর্মসূচি গ্রহণ করা আবশ্যক। তাই আজকের পরিবেশ দিবসে আমাদের শপথ হোক-আমরা নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার খাতিরে প্রকৃতিকে রক্ষা করব, যাতে প্রকৃতি আমাদের নিরাপদ ও সুন্দর ভবিষ্যৎ উপহার দিতে পারে। তা ছাড়া ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য পৃথিবী রেখে যাওয়া আমাদের নৈতিক ও মহান দায়িত্ব।



