ইরানে মার্কিন এফ-১৫ই যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত, পাইলট উদ্ধারে তল্লাশি অভিযান চলছে
ইরানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি এফ-১৫ই স্ট্রাইক ঈগল যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হয়েছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম আইআরআইবি বিমানের ধ্বংসাবশেষের ছবি প্রকাশ করেছে এবং জানিয়েছে, সাধারণ মানুষ ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ে দুর্ঘটনাস্থলের দিকে রওনা হয়েছেন। এই ঘটনাটি ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ইরানের অভ্যন্তরে প্রথম মার্কিন জেট বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার খবর হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে।
পাইলট উদ্ধারে তল্লাশি অভিযান ও পুরস্কার ঘোষণা
ইরানের স্থানীয় টেলিভিশন চ্যানেলগুলি ঘোষণা করেছে যে সামরিক বাহিনী ভূপাতিত মার্কিন যুদ্ধবিমানের পাইলট বা পাইলটদের খুঁজে বের করতে তল্লাশি অভিযান শুরু করেছে। কোহগিলুয়েহ ও বোয়ের-আহমদ প্রদেশের নাগরিকদের উদ্দেশ্যে বলা হয়েছে, যদি তারা শত্রু পাইলটদের জীবিত ধরে পুলিশ বা সামরিক বাহিনীর হাতে তুলে দেন, তবে তাদের মূল্যবান পুরস্কার ও বোনাস দেওয়া হবে। এই প্রদেশটি অত্যন্ত গ্রামীণ ও পাহাড়ি অঞ্চল, যা প্রায় ১৫ হাজার ৫০০ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তৃত।
ইরানি কর্তৃপক্ষ জনসাধারণকে পার্শ্ববর্তী চাহারমহল ও বখতিয়ারি প্রদেশেও সন্ধান চালানোর অনুরোধ জানিয়েছে। টিভির পর্দায় আলাদাভাবে চলা একটি স্ক্রলে জনসাধারণকে অনুরোধ করা হয়েছে, 'তাঁদের দেখলে গুলি করুন।' তবে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী জনগণকে অনুরোধ করেছে, যাতে কেউ পাইলটের সঙ্গে খারাপ আচরণ না করে।
মার্কিন উদ্ধার অভিযান ও ক্রুদের অবস্থা
মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলোর দাবি অনুযায়ী, বিমানে থাকা দুই ক্রু সদস্যের মধ্যে একজনকে ইতিমধ্যেই মার্কিন বিশেষ বাহিনী উদ্ধার করেছে এবং দ্বিতীয় সদস্যের সন্ধানে তল্লাশি চলছে। বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে এক মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ভূপাতিত মার্কিন যুদ্ধবিমানের ক্রুদের খুঁজে বের করতে উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে। দ্য নিউইয়র্ক টাইমস ও ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের তথ্যমতে, বিধ্বস্ত বিমানটি ছিল এফ-১৫ই যুদ্ধবিমান, যেখানে একজন পাইলট এবং পেছনের আসনে একজন অস্ত্রব্যবস্থা কর্মকর্তা থাকেন।
ইরানের অতিরিক্ত দাবি ও মার্কিন প্রতিক্রিয়া
ইরানের সংবাদমাধ্যম দাবি করেছে যে ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) মধ্য ইরানের আকাশে একটি এফ-৩৫ স্টেলথ ফাইটার ভূপাতিত করেছে। ইরানের তাসনিম নিউজ এজেন্সি একটি মার্কিন জেটের ধ্বংসাবশেষের ছবি প্রকাশ করে বলেছে, পাইলটের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা খুবই কম। আইআরআইবি আলাদাভাবে দাবি করেছে, যুক্তরাজ্যের আরএএফ লাকেনহিথভিত্তিক ৪৯৪তম ফাইটার স্কোয়াড্রনের এফ-১৫ই স্ট্রাইক ইগল ভূপাতিত হয়েছে।
২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর এ নিয়ে তৃতীয়বার ইরান এফ-৩৫ ভূপাতিত করার দাবি করল। তেহরান এর আগে ২৩ মার্চ এবং ২ এপ্রিলও একই দাবি করেছিল। তবে আগের দুটি দাবিই মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড নাকচ করে দিয়েছিল। কেশম দ্বীপের কাছে একটি বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার ভিডিওর জবাবে সেন্টকম-এর অফিশিয়াল এক্স অ্যাকাউন্টে দাবি করেছে, 'যুক্তরাষ্ট্রের সব যুদ্ধবিমানের হিসাব আমাদের কাছে আছে। ইরানের আইআরজিসি অন্তত আধা ডজনবার এমন মিথ্যা দাবি করেছে।' এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত সর্বশেষ ইরানি দাবির বিষয়ে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড, পেন্টাগন বা হোয়াইট হাউস থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
যুদ্ধের প্রেক্ষাপট ও মানবিক ক্ষয়ক্ষতি
২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া যুদ্ধ ৩৫তম দিনে গড়িয়েছে। ওই দিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ আগ্রাসনে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ বেশ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতা নিহত হন। এর পর থেকে যুদ্ধ পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে। ইরান ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মাধ্যমে পাল্টা জবাব দিচ্ছে এবং মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে মার্কিন ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে।
যুদ্ধে সব পক্ষেই মানবিক ক্ষয়ক্ষতি বাড়ছে। ইরানে এ পর্যন্ত ১ হাজার ৯০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন, যাঁদের অধিকাংশই বেসামরিক নাগরিক। ইসরায়েলে ১৯ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এ ছাড়া উপসাগরীয় দেশগুলো এবং অধিকৃত পশ্চিম তীরে ২ ডজনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন এবং ১৩ জন মার্কিন সেনাসদস্য নিহত হয়েছেন। এই বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনা যুদ্ধের উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে, এবং উভয় পক্ষের মধ্যে কূটনৈতিক ও সামরিক উত্তেজনা চলমান রয়েছে।



