ইরানের ড্রোন প্রযুক্তি: মৌমাছি দর্শনের আধুনিক বিজয়
ইরানের নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি স্বল্প খরচের ড্রোন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে গভীর দুশ্চিন্তায় ফেলে দিয়েছে। এই ড্রোনগুলো সামরিক ক্ষেত্রে একটি নতুন অধ্যায় সৃষ্টি করেছে, যা ঐতিহাসিক 'উইনিং বাই আ থাউজেন্ড কাটস' বা হাজার ক্ষতের মাধ্যমে জয়লাভের ধারণাকে প্রতিফলিত করে। এই দর্শন মূলত চীনের লিংচি প্রথা থেকে উদ্ভূত, যেখানে ধীরে ধীরে কৌশলগত আঘাতের মাধ্যমে শত্রুকে পরাজিত করা হয়।
অপ্রতিসম যুদ্ধের দর্শন
অপ্রতিসম যুদ্ধ বা অ্যাসিমেট্রিক্যাল ওয়ার হলো এমন একটি কৌশল, যেখানে দুর্বল পক্ষ শক্তিশালী শত্রুর বিরুদ্ধে বিজয়ী হয়। মাও সে-তুং এই ধারণাটি একটি গল্পের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করেছিলেন, যেখানে সিংহের মতো বিশাল শত্রুর বিরুদ্ধে মৌমাছিরা বারবার হুল ফুটিয়ে তাকে ব্যতিব্যস্ত করে এবং শেষ পর্যন্ত জয়ী হয়। ইরান আজ ঠিক এই দর্শনকেই আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে বাস্তবায়ন করছে।
ডেভিড ও গোলিয়াথের গল্পেও আমরা একই কৌশল দেখি, যেখানে ছোট্ট ডেভিড দৈত্য গোলিয়াথকে দূর থেকে পাথর ছুড়ে পরাজিত করে। আজ ইসরায়েল, যার আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার নাম 'ডেভিডস স্লিং', নিজেই একটি গোলিয়াথে পরিণত হয়েছে, আর ইরান আবির্ভূত হয়েছে ডেভিড হিসেবে।
ইরানের রণকৌশল ও প্রযুক্তির সাফল্য
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কাছে রয়েছে বিশাল সামরিক শক্তি, যার মধ্যে রয়েছে বিমানবাহী জাহাজ, ফাইটার জেট, এবং হাজার হাজার মিসাইল। অন্যদিকে, ইরান দুই দশক ধরে ভূগর্ভস্থ মিসাইল ও ড্রোন শহর তৈরি করেছে। গত কয়েক সপ্তাহে হাজার হাজার বোমা ফেলেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের এই স্থাপনাগুলো ধ্বংস করতে পারেনি। বরং ইরান নির্ভুলভাবে মিসাইল ও ড্রোন ছুড়ে প্রতিপক্ষকে পর্যুদস্ত করছে।
ইরানের ড্রোনগুলো শত্রুর ব্যয়বহুল তেল স্থাপনা ও সামরিক ঘাঁটিতে আঘাত হানছে, যা একটি চরম অপ্রতিসম পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। তারা সরাসরি সংঘর্ষ এড়িয়ে লেবানন, ইয়েমেন, বা ইরাকি প্রক্সি বাহিনীর মাধ্যমে কাজ করছে, যা আধুনিক রিমোট কন্ট্রোল গেরিলা যুদ্ধের উদাহরণ।
বাংলাদেশের জন্য শিক্ষণীয় দিক
এই যুদ্ধ থেকে বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর অনেক কিছু শেখার আছে। আমরা একটি বড় আণবিক শক্তিসম্পন্ন প্রতিবেশী দেশের পাশে অবস্থান করছি, তাই আমাদের প্রচলিত সামরিক সক্ষমতায় ঘাটতি থাকা স্বাভাবিক। এ ক্ষেত্রে মাও সে-তুংয়ের মৌমাছি দর্শন আমাদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মডেল হতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য প্রস্তাবিত কৌশল:
- একটি 'হাইব্রিড প্রতিরক্ষা মডেল' গ্রহণ করা, যেখানে প্রচলিত ও অপ্রতিসম কৌশল একত্রিত হবে।
- একটি শক্তিশালী ড্রোন কমান্ড গঠন, যা তথ্য সংগ্রহ ও আক্রমণ করতে সক্ষম।
- জাহাজবিধ্বংসী মিসাইলসহ কোস্টাল প্রতিরক্ষাব্যবস্থা উন্নত করা।
- সাইবার কমান্ড ও বিশেষায়িত গেরিলা বাহিনী গড়ে তোলা।
- নৌবাহিনীতে ছোট ফাস্ট মিসাইল ক্র্যাফট ও সাবমেরিন ব্যবস্থার উন্নতি ঘটানো।
ইরান দেখিয়েছে যে দামি ফাইটার জেটের চেয়ে সাশ্রয়ী প্রযুক্তি দিয়ে শত্রুর বিশাল আয়োজন ব্যাহত করা সম্ভব। বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি শিক্ষা, যা আমাদের প্রতিরক্ষা কৌশলে আমূল পরিবর্তন আনতে পারে।
লেখক: তুষার কান্তি চাকমা, অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা (ব্রিগেডিয়ার জেনারেল)। মতামত লেখকের নিজস্ব।



