ট্রাম্পের ইরান যুদ্ধে নিক্সনের ভিয়েতনাম 'সম্মানজনক শান্তি'র ছায়া
ট্রাম্পের ইরান যুদ্ধে নিক্সনের ভিয়েতনাম 'সম্মান'র ছায়া

ট্রাম্পের ইরান যুদ্ধে নিক্সনের ভিয়েতনাম 'সম্মানজনক শান্তি'র ছায়া

হোয়াইট হাউসের ইস্ট রুমে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছ থেকে বিদায় নিচ্ছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন। পাশে দাঁড়িয়ে তাঁর কথা শুনছিলেন ফার্স্ট লেডি প্যাট নিক্সন এবং কন্যা ট্রিসিয়া নিক্সন। ১৯৭৪ সালের ৯ আগস্টের সেই দৃশ্য আজও ইতিহাসের পাতায় স্মরণীয়।

ভিয়েতনাম থেকে ইরান: একই কাহিনির পুনরাবৃত্তি

ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার যৌক্তিকতা প্রমাণে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বর্তমান চেষ্টা রিচার্ড নিক্সনের ভিয়েতনামে 'সম্মানজনক শান্তি' খোঁজার কথা স্পষ্টভাবে মনে করিয়ে দিচ্ছে। এই অধরা লক্ষ্যের পিছনে ছুটতে গিয়ে নিক্সন বছরের পর বছর ধরে মৃত্যু ও ভোগান্তি ডেকে এনেছিলেন। এখন প্রশ্ন উঠছে, ক্ষতি মেনে নেওয়ার আগে ট্রাম্প আর কতদিন এই অর্থহীন সংঘাত চালিয়ে যাবেন?

১৯৬৮ সালে রিপাবলিকান ন্যাশনাল কনভেনশনে নিজের মনোনয়ন গ্রহণের ভাষণে নিক্সন প্রথমবারের মতো ভিয়েতনাম যুদ্ধের 'সম্মানজনক সমাপ্তি'র ডাক দিয়েছিলেন। এটি তাঁর পুরো নির্বাচনী প্রচারাভিযান এবং প্রেসিডেন্ট পদে থাকাকালীন সময়ের মূল বিষয় হয়ে উঠেছিল। যখন স্পষ্ট হয়ে গেল যে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পর দক্ষিণ ভিয়েতনামের সরকার টিকতে পারবে না, তখন নিক্সন ওয়াশিংটনের বিশ্বাসযোগ্যতা রক্ষার চেষ্টা চালান।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

রক্তপাতের বিনিময়ে 'সম্মান' অর্জনের চেষ্টা

১৯৭৩ সালের জানুয়ারির প্যারিস শান্তিচুক্তি থেকে ১৯৭৫ সালের এপ্রিলে সাইগনের পতন পর্যন্ত দুই বছরের বিরতি নিশ্চিত করতে নিক্সন ও তাঁর জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হেনরি কিসিঞ্জার ভিয়েতনামের জনগণের ওপর চার বছর ধরে অবিরাম বোমাবর্ষণ চালান। এই হামলা প্রতিবেশী দেশ কম্বোডিয়া ও লাওসেও ছড়িয়ে পড়েছিল। এই সময়কালে:

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
  • ২০ হাজারের বেশি মার্কিন সেনা প্রাণ হারায়
  • ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া ও লাওসের মানুষের মৃত্যুর সংখ্যা ছিল এর বহুগুণ
  • লক্ষ লক্ষ বেসামরিক মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়

ট্রাম্পের ইরান নীতি: উদ্দেশ্যহীন যুদ্ধের ধারাবাহিকতা

এবার ট্রাম্পের ইরান নীতির দিকে নজর দিলে দেখা যায়, তাঁর সামরিক অভিযানের পেছনে কোনো স্পষ্ট লক্ষ্য নেই। ইরানের দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ধ্বংসের জন্য এই হামলা নয়, কারণ হোয়াইট হাউস নিজেই দাবি করছে যে 'ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা কার্যত ধ্বংস হয়ে গেছে'

ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি কমানোর জন্যও এই হামলা নয়, কারণ ট্রাম্পের দাবি অনুযায়ী গত জুনের মার্কিন ও ইসরায়েলি বোমাবর্ষণের পর তা 'পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন' হয়ে গেছে। শাসকগোষ্ঠী পরিবর্তনের লক্ষ্যও ট্রাম্প সম্ভবত পরিত্যাগ করেছেন, কারণ আকাশপথে হামলা চালিয়ে কোনো সরকার পতনের নজির ইতিহাসে নেই।

হরমুজ প্রণালি ও বিদ্যুৎ অবকাঠামো হুমকি

ট্রাম্পের বর্তমান মনোযোগ ইরানের ট্যাংকারগুলোর অবরোধ এবং হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণের ওপর কেন্দ্রীভূত। এই প্রণালি দিয়ে বিশ্বের ২০ শতাংশ তেল ও গ্যাস সরবরাহ করা হয়। ট্রাম্পের সর্বশেষ হুমকি হলো, তেহরান যদি এই প্রণালি খুলে দিতে রাজি না হয়, তবে চলতি সপ্তাহের শেষ নাগাদ ইরানের বিদ্যুৎ অবকাঠামো ধ্বংস করে দেওয়া হবে।

ইরানের বিদ্যুৎ অবকাঠামোতে হামলা চালানো একটি স্পষ্ট যুদ্ধাপরাধ হবে, কারণ বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো বেসামরিক স্থাপনা। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত ইতিমধ্যেই একই কাজ করার দায়ে চারজন রুশ কমান্ডারের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেছেন।

ইরানের অবস্থান ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা

ভাগ্যের নির্মম পরিহাস হলো, ট্রাম্প-নেতানিয়াহুর আগ্রাসী যুদ্ধের আগের তুলনায় ইরান বর্তমানে দর–কষাকষিতে সম্ভবত বেশি শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। দেশটি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে—নেতৃত্ব শূন্য হয়েছে, সামরিক বাহিনীর বড় অংশ ধ্বংস হয়েছে এবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর হামলা হয়েছে। ফলে এই শাসকগোষ্ঠীর হারানোর মতো আর তেমন কিছু বাকি নেই।

ইরানের নেতারা তাঁদের 'অসম সামরিক কৌশল' এর সাফল্যে আরও সাহসী হয়ে উঠেছেন। তারা উপসাগরীয় আরব দেশগুলোয় মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা চালিয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে পারে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ধস নামাতে সক্ষম।

আলোচনা ও শান্তির সম্ভাবনা

ট্রাম্প এখন সংঘাত অবসানে ইরানের সঙ্গে 'অত্যন্ত ভালো ও ফলপ্রসূ আলোচনা'র কথা বলছেন, কিন্তু ইরান এই আলোচনার কথা সরাসরি অস্বীকার করেছে। তাদের দাবি, ওই অঞ্চলে জ্বালানি স্থাপনায় তেহরানের হামলার হুমকির কারণেই ট্রাম্প পিছু হটছেন।

অঘোষিত একটি যুদ্ধবিরতি হতে পারে উত্তেজনা কমানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায়। ট্রাম্পের উচিত স্রেফ বোমাবর্ষণ বন্ধ করা এবং নেতানিয়াহুকেও একই কাজ করতে বাধ্য করা। ইরান সরকার যদি টিকে থাকাকেই নিজেদের বিজয় হিসেবে দেখে, তবে তারা এই সুযোগটি লুফে নিতে পারে।

রাজনৈতিক লক্ষ্য বনাম সামরিক বাস্তবতা

ট্রাম্প যুদ্ধ 'জয়' করতে চান। তিনি বলেছেন, তিনি 'নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ' চান। তিনি ইরানের শাসকগোষ্ঠীর 'ছেড়ে দে, কেঁদে বাঁচি' অবস্থা চান। কিন্তু এগুলো কোনো সামরিক লক্ষ্য নয়, এগুলো তাঁর রাজনৈতিক লক্ষ্য। মধ্যপ্রাচ্যের কাউকে রক্ষার চেয়ে এগুলো ট্রাম্পের নিজেকে রক্ষারই চেষ্টা মাত্র।

এই কারণেই ট্রাম্প সাবেক প্রেসিডেন্ট নিক্সনের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছেন। নিক্সন যে 'সম্মান' খুঁজছিলেন, তা মার্কিন জনগণের ছিল না। ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় বেশির ভাগ মার্কিন নাগরিক যুদ্ধ থেকে দূরে থাকতে চেয়েছিলেন, ঠিক যেমন আজকের দিনে বেশির ভাগ মানুষ ইরানে ট্রাম্প-নেতানিয়াহুর যুদ্ধ থেকে দূরে থাকতে চায়।

ভিয়েতনাম যুদ্ধে নিক্সন যে সম্মান খুঁজছিলেন, তা ছিল তাঁর একান্তই নিজস্ব। তিনি ভিয়েতনাম 'হারানোর' রাজনৈতিক মূল্য চোকাতে চাননি। একইভাবে ট্রাম্পও কোনো বৈধ কারণ ছাড়া এই যুদ্ধ শুরু করে এখন মুখ রক্ষার পথ খুঁজছেন। কিন্তু ট্রাম্পকে শুধু বিজয়ী ঘোষণা করার জন্য আর কত ইরানিকে প্রাণ দিতে হবে? এই অর্থহীন যুদ্ধ আর কত ধ্বংসযজ্ঞ চালাবে? আর কত দারিদ্র্য ও অর্থনৈতিক দুর্ভোগ এই বিশ্বকে সহ্য করতে হবে?

ট্রাম্প তাঁর ভিত্তিহীন সাফল্য দাবির জন্য কুখ্যাত। এখন ইতিহাসের শিক্ষা নেওয়া এবং এই ধ্বংসাত্মক চক্র থেকে বেরিয়ে আসার উপযুক্ত সময়।