হরমুজ প্রণালীতে ইরানের কর্তৃত্ব: যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞাকে মোকাবিলায় ছায়া বহরের সাফল্য
ইরান প্রায় এক দশক ধরে পশ্চিমা অর্থনীতি ও বিমা ব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন একটি ছায়া বহর বা তেলবাহী ট্যাংকার নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর নিষেধাজ্ঞা এড়াতে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। বর্তমানে এই জাহাজগুলো হরমুজ প্রণালী দিয়ে স্বাধীনভাবে চলাচল করলেও, পশ্চিমা সহযাত্রী জাহাজগুলোর জন্য পথ রুদ্ধ হয়ে পড়েছে, ফলে আঞ্চলিক নিয়ন্ত্রণে ইরানের প্রভাব উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
নিষেধাজ্ঞার জবাবে ইরানের কৌশলগত পাল্টা আঘাত
যুক্তরাষ্ট্র যখন তার বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে ইরান ও রাশিয়ার মতো দেশগুলোর ওপর সীমাবদ্ধতা আরোপ করেছিল, ইরান এখন ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করে সমুদ্রপথে প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করছে। ফেব্রুয়ারির ২৮ তারিখ থেকে শুরু হওয়া সংঘাতে উপসাগরীয় এলাকায় ইরান অন্তত ১৭টি জাহাজ আক্রমণ করেছে, যা হরমুজ প্রণালী পার করতে চাওয়া পশ্চিমা শিপিং কোম্পানিগুলোকে আকাশচুম্বী বিমা প্রিমিয়াম দিতে বাধ্য করছে।
এই যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরান প্রতিদিন গড়ে ১.০২ মিলিয়ন ব্যারেল তেল রপ্তানি করতে সক্ষম হয়েছে, যার সিংহভাগই চীনকে সরবরাহ করা হচ্ছে। উল্লেখ্য, গত বছর ইরান গড়ে ১.৬৯ মিলিয়ন ব্যারেল তেল রপ্তানি করেছিল। ইরানের ছায়া বহর আরও স্বাধীনভাবে তেল পরিবহণে সক্ষম হওয়ায়, এটি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি বড় অর্থনৈতিক ও কৌশলগত আঘাত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
২০১৮ সালের পটভূমি ও বর্তমান উন্নয়ন
২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র একতরফাভাবে পারমাণবিক চুক্তি থেকে সরে দাঁড়িয়ে ইরানের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে, ইরান তার তেল শিল্পের ওপর কেন্দ্রিত এই সীমাবদ্ধতাগুলো মোকাবিলায় ছায়া বহর গড়ে তোলে। সেই থেকে ইরান ধীরে ধীরে তার সামুদ্রিক নেটওয়ার্ক শক্তিশালী করে চলেছে, যা এখন হরমুজ প্রণালীতে তার নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় সহায়ক হয়েছে।
অন্যদিকে, পাকিস্তান, ভারত ও চীনের মতো দেশগুলোও হরমুজ প্রণালীতে নিরাপদে তেল পরিবহণে আগ্রহী হয়ে উঠেছে। সম্প্রতি পাকিস্তান-অধিকৃত ‘করাচি’ নামক একটি জাহাজ, যা সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে তেল বহন করছে, এই সপ্তাহে প্রথমবারের মতো হরমুজ প্রণালী সফলভাবে অতিক্রম করেছে, যা আঞ্চলিক বাণিজ্যে নতুন সম্ভাবনার দিক নির্দেশ করছে।
বিশ্লেষকদের দৃষ্টিভঙ্গি ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
বিশ্লেষকরা মত প্রকাশ করেছেন যে, ইরান এর মাধ্যমে হরমুজ প্রণালীতে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ শক্তিশালী করার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব কমিয়ে দিয়েছে। তারা সতর্ক করে দিয়েছেন যে, ‘এটি বিশ্বের সমুদ্রপথে নতুন শক্তি বিন্যাসের সূচনা হতে পারে,’ যা ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও অর্থনীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন আনতে সক্ষম। ইরানের এই কৌশলগত সাফল্য নিষেধাজ্ঞা মোকাবিলায় অন্যান্য দেশের জন্যও একটি মডেল হিসেবে কাজ করতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
