ইরান যুদ্ধে মার্কিন 'সাম্রাজ্যবাদী ফাঁদ' ও রাশিয়া-চীনের সুবিধা
ইরানের বিরুদ্ধে শুরু হওয়া মার্কিন যুদ্ধের দুই সপ্তাহ পেরিয়ে গেছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন মার্কিন প্রশাসন জয়ের দাবি করলেও, আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা এই সংঘাতকে একটি ভয়াবহ 'সাম্রাজ্যবাদী ফাঁদ' হিসেবে চিহ্নিত করছেন। তাদের মতে, ইরানকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যের এই গোলকধাঁধায় মার্কিন শক্তি পুনরায় জড়িয়ে পড়ায় প্রকৃত লাভবান হচ্ছে রাশিয়া ও চীন। মার্কিন প্রশাসনের দাবি অনুযায়ী ইরানের সামরিক শক্তি অনেকখানি ধ্বংস করা হলেও, বিশ্লেষকদের মতে ইরানের গেরিলা যুদ্ধের সক্ষমতা এখনও শেষ হয়ে যায়নি। ফলে এই যুদ্ধ অদূর ভবিষ্যতে আরও জটিল ও দীর্ঘস্থায়ী রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে।
ঐতিহাসিক তুলনা ও প্রযুক্তিগত পিছিয়ে পড়ার শঙ্কা
ওয়াশিংটন পোস্টের কলামিস্ট ফারিদ জাকারিয়া এই যুদ্ধের প্রেক্ষাপটকে বিংশ শতাব্দীর শুরুতে ব্রিটেনের পতনের সঙ্গে তুলনা করেছেন। তিনি বলেছেন, ব্রিটেন যখন মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার প্রান্তিক সংকট নিয়ে ব্যস্ত ছিল, তখন আটলান্টিকের ওপারে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত শিল্প অর্থনীতি গড়ে তুলছিল। আজ ঠিক একইভাবে যুক্তরাষ্ট্র যখন তেহরানে বিমান হামলা আর ড্রোন নিয়ে ব্যস্ত, চীন তখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং এবং রোবোটিক্সের মতো অত্যাধুনিক প্রযুক্তিতে ব্যাপক বিনিয়োগ করে বিশ্বশক্তির ভারসাম্য বদলে দিচ্ছে। জাকারিয়ার মতে, মহান শক্তিগুলো পরাধীন হওয়ার কারণে ধ্বংস হয় না, বরং প্রান্তিক অঞ্চলে নিজেদের অতিরিক্ত প্রসারিত করার ফলে মূল শক্তি হারিয়ে ফেলে।
ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর সমালোচনা
দ্য গার্ডিয়ানের বিশ্লেষক সাইমন টিসডল প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কড়া সমালোচনা করে তাকে 'বিশ্বের এক নম্বর গণশত্রু' হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেন, ট্রাম্পের কোনও সুস্পষ্ট পরিকল্পনা নেই। তিনি নিজেকে ঘটনার নিয়ন্ত্রক ভাবলেও আসলে তিনি পরিস্থিতির দাসে পরিণত হয়েছেন। হরমুজ প্রণালি রক্ষা করতে তার ব্যর্থতা বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় আঘাত হেনেছে। টিসডল আরও বলেছেন, ট্রাম্পের ধর্মীয় আবেগ উস্কে দেওয়া প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ হয়তো দ্রুত 'মিশন সফল' ঘোষণা করতে চাইবেন, কিন্তু শরীরভর্তি কফিন যখন দেশে ফিরবে, তখন ভোটাররা তাকে ক্ষমা করবে না।
মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক গোলকধাঁধা
ব্রিটিশ-তিউনিসীয় লেখক সুমাইয়া ঘান্নুশি মনে করেন, ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সফলভাবে মার্কিন শক্তিকে মধ্যপ্রাচ্যের গোলকধাঁধায় টেনে এনেছেন। তিনি বলেন, এটি ট্রাম্পের জন্য কোনও 'ভেনেজুয়েলা পরিস্থিতি' নয়। ঘান্নুশি সতর্ক করে বলেন, মার্কিন ঘাঁটিগুলোকে রক্ষার নামে উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার নেওয়া হয়েছে, কিন্তু আজ সেই ঘাঁটিগুলোই এই দেশগুলোর জন্য বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কুয়েতি বিশ্লেষক মুসায়েদ আল-মাগনামের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেন, মানুষ ভাবত আমেরিকানরা আমাদের রক্ষা করছে, কিন্তু আজ আমরাই আমেরিকানদের রক্ষা করছি।
ধর্মীয় আদর্শ ও আন্তর্জাতিক আইনের প্রশ্ন
কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জোসেফ মাসাদ এই যুদ্ধের পেছনে উগ্র ধর্মীয় আদর্শের প্রভাব দেখছেন। তিনি জানান, যুদ্ধের শুরুতে মার্কিন কমান্ডাররা তাদের সেনাদের বলেছিলেন এটি 'আরমাগেডন' বা যিশুর প্রত্যাবর্তনের যুদ্ধ। মাসাদ বলেন, আরব দেশগুলো ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন-ইসরায়েলি আগ্রাসনের নিন্দা না জানিয়ে নিরব থেকেছে। ওমান ছাড়া আর কেউ আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের কথা বলেনি। তার মতে, আরব দেশগুলো তাদের সার্বভৌমত্ব যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বিলিয়ে দিয়েছে। মাসাদ প্রশ্ন তোলেন, ইরান যদি রাশিয়া বা চীনের ঘাঁটি ব্যবহার করে উপসাগরীয় দেশগুলোতে হামলা চালাত, তবে কি তারা সেটাকে তাদের অধিকার হিসেবে দেখত না?
অর্থনৈতিক ব্যয় ও কৌশলগত বিপর্যয়ের আশঙ্কা
বিশ্লেষকদের মতে, এই যুদ্ধের যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক ব্যয় প্রথম সপ্তাহে ১১ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। তেলের দাম আকাশচুম্বী হওয়ায় দরিদ্র দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের সুজান ম্যালোনি সতর্ক করেছেন যে, যতক্ষণ ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা এবং যুদ্ধের সমাপ্তি ঘোষণার ক্ষমতা তাদের হাতে থাকবে, ততক্ষণ এটি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি 'কৌশলগত বিপর্যয়' হয়েই থাকবে। সামগ্রিকভাবে, এই সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতা ও বৈশ্বিক নিরাপত্তার জন্য একটি গভীর হুমকি হিসেবে দেখা দিয়েছে।
