ট্রাম্প-নেতানিয়াহুর যুদ্ধে ইরান: ১৯৯১ সালের বুশের ভাষণ ও অভ্যুত্থানের ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি?
ট্রাম্প-নেতানিয়াহুর যুদ্ধে ইরান: বুশের ভাষণ ও অভ্যুত্থানের ইতিহাস

ট্রাম্প-নেতানিয়াহুর যুদ্ধে ইরান: ১৯৯১ সালের বুশের ভাষণ ও অভ্যুত্থানের ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি?

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযানে ইরানের বিরুদ্ধে তৃতীয় উপসাগরীয় যুদ্ধের সূচনা হয়েছে। এই যুদ্ধে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইরানি জনগণকে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের বিরুদ্ধে গণ-অভ্যুত্থানের ডাক দিচ্ছেন। কিন্তু ১৯৯১ সালের প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধের সময় প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশের ভাষণের মতোই, এবারও সরাসরি সামরিক সমর্থনের কোনো প্রতিশ্রুতি দেওয়া হচ্ছে না। ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হতে পারে বলে বিশ্লেষকরা আশঙ্কা প্রকাশ করছেন।

১৯৯১ সালের বুশের ভাষণ ও ইরাকি বিদ্রোহের পরিণতি

১৯৯১ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি, প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র কারখানা পরিদর্শনকালে একটি ভাষণ দেন। তিনি ইরাকি সেনাবাহিনী ও জনগণকে স্বৈরশাসক সাদ্দাম হোসেনকে পদত্যাগে বাধ্য করার আহ্বান জানান। শ্রমিকরা উচ্ছ্বসিত হয়ে চিৎকার ও হাততালি দিলেও, মার্কিন প্রশাসন ইরাকি শিয়াদের বিদ্রোহে সরাসরি হস্তক্ষেপ করেনি। এর ফলে ইরাকি সরকার হেলিকপ্টার ব্যবহার করে হাজার হাজার কুর্দি ও শিয়া মুসলিমকে হত্যা করে। কুর্দিস্তানের বরফঢাকা পর্বতে শিশুদের মৃতদেহ নামানো এবং শরণার্থীদের দুর্দশার চিত্র সেসময় বিশ্ব মিডিয়ায় প্রকাশিত হয়েছিল।

ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর বর্তমান কৌশল

বর্তমানে ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু ইরানের জনগণকে এক প্রজন্মের মধ্যে ইসলামি প্রজাতন্ত্র উৎখাতের সুযোগ দেওয়ার কথা বলছেন। কিন্তু তারা ইরানি বিদ্রোহীদের সরাসরি সামরিক সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন না। ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরান নিজেই তাদের একটি স্কুলে টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে ১৬৫ জনের বেশি মানুষকে হত্যা করেছে, যদিও ইরানের কাছে এমন অস্ত্র নেই বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ ইউরোপীয় দেশগুলোর অনিচ্ছার সমালোচনা করেছেন, কিন্তু যুদ্ধের পরিণতি অজানা ও বিপজ্জনক হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন।

ইতিহাসের শিক্ষা ও ভবিষ্যতের সম্ভাব্য পরিণতি

২০০৩ সালে ইরাকে মার্কিন আগ্রাসনের পর মহাবিপর্যয়ের সৃষ্টি হয়েছিল, যেখানে কার্যকর শাসনব্যবস্থা স্থাপনের পরিকল্পনা ছাড়াই সাদ্দাম হোসেনকে উৎখাত করা হয়। এর ফলে সাম্প্রদায়িক হত্যাকাণ্ড, গৃহযুদ্ধ এবং ইসলামিক স্টেটের উত্থান ঘটে। এবারের যুদ্ধেও অনুরূপ পরিণতি হতে পারে, বিশেষ করে যদি ইরানে ক্ষমতার শূন্যতা তৈরি হয়। নেতানিয়াহু বহুবার ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের পরিকল্পনা করলেও, ট্রাম্পের মতো একজন মার্কিন প্রেসিডেন্টের সমর্থন পেয়েছেন। পূর্ববর্তী মার্কিন প্রেসিডেন্টরা ইরানকে সীমার মধ্যে রাখতে চেয়েছিলেন, কিন্তু ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু সরাসরি সামরিক পদক্ষেপ নিচ্ছেন।

আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক প্রভাব

এই যুদ্ধে ইসরায়েলের লক্ষ্য হলো ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্র ধ্বংস করা এবং লেবাননে হিজবুল্লাহকে চিরতরে নির্মূল করা। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র রাষ্ট্রগুলো, যেমন সৌদি আরব, যুদ্ধের পরিণতিতে মার্কিন মিত্রতা পুনর্মূল্যায়ন করতে পারে। চীন এই সংকটকে কাজে লাগানোর সুযোগ খুঁজতে পারে, যা বৈশ্বিক রাজনীতিকে প্রভাবিত করবে। ট্রাম্প যদি যুদ্ধ থেকে সরে আসেন, তবে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সৈন্য রাখার প্রয়োজন হতে পারে, যদিও তিনি অন্তহীন যুদ্ধে জড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।

বিবিসির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক জেরেমি বোয়েন উল্লেখ করেছেন, যুদ্ধ শুরু করা শেষ করার চেয়ে সহজ, এবং যুক্তরাষ্ট্র একটি সুসংগঠিত পরিকল্পনা ছাড়াই যুদ্ধে জড়িয়েছে। ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি রোধ করতে সতর্কতা ও কূটনৈতিক প্রচেষ্টা জরুরি বলে বিশেষজ্ঞরা মত দিচ্ছেন।