ইসরাইলে হিজবুল্লাহর রকেট বৃষ্টি: ইরানের সমন্বিত হামলায় উত্তপ্ত মধ্যপ্রাচ্য
মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্রে উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছে। বুধবার রাতে ইসরাইলের উত্তরাঞ্চল ও মধ্যাঞ্চল লক্ষ্য করে নজিরবিহীন ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইরান এবং লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ। লেবানন সীমান্ত থেকে হিজবুল্লাহ অন্তত ১৫০টি রকেট নিক্ষেপ করেছে, যা চলতি মাসে সংঘাত তীব্র হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত তাদের সবচেয়ে বড় আক্রমণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সমন্বিত অভিযানের রূপ
একই সময়ে ইরান থেকে ধেয়ে আসা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এই হামলাকে একটি সমন্বিত অভিযানে রূপ দেয়। ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) জানিয়েছে, এই জোরালো আক্রমণের ফলে দেশটির বিশাল এলাকাজুড়ে সাইরেন বেজে ওঠে এবং লাখ লাখ মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে বাধ্য হয়।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইরান ও ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ বিমান বাহিনীর মধ্যে শুরু হওয়া প্রচণ্ড লড়াইয়ের প্রেক্ষাপটে হিজবুল্লাহ এই নতুন অভিযান শুরু করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, তাদের প্রধান পৃষ্ঠপোষক ইরানের ওপর চলমান হামলা ঠেকাতেই লেবানন থেকে এই পাল্টা আক্রমণ চালানো হয়েছে।
হামলার বিস্তার ও প্রভাব
ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কোর (আইআরজিসি) এক বিবৃতিতে নিশ্চিত করেছে, ইসরাইলের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে বিভ্রান্ত করতে তারা হিজবুল্লাহর সঙ্গে একযোগে এই অভিযান পরিচালনা করেছে। হামলার তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে গ্যালিলি থেকে শুরু করে হাইফা এবং সীমান্ত থেকে ৫০ কিলোমিটার ভেতরের জনপদগুলোতেও সতর্কতা সংকেত জারি করা হয়।
ইসরাইলি বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বেশিরভাগ ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র এবং হিজবুল্লাহর রকেট রুখে দিতে সক্ষম হলেও বেশ কিছু স্থানে আঘাতের খবর পাওয়া গেছে। উত্তর ইসরাইলের বি'ইনা শহরে রকেটের আঘাতে একটি বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং এর ফলে অন্তত দুজন আহত হয়েছেন। এছাড়া বেশ কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দাকে তীব্র আতঙ্কিত অবস্থায় প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে বলে উদ্ধারকারী দল নিশ্চিত করেছে।
হিজবুল্লাহর দাবি ও ইসরাইলের পাল্টা হামলা
বুধবার রাত থেকে শুরু হওয়া এই তাণ্ডব বৃহস্পতিবার ভোর পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। উত্তরাঞ্চলীয় শহর নাহারিয়া, একর এবং হাইফার উপকণ্ঠে ড্রোনের অনুপ্রবেশ ঠেকাতে বারবার সাইরেন বাজানো হয়। হিজবুল্লাহ দাবি করেছে, তারা তেলআবিবের উপকণ্ঠে অবস্থিত ইসরাইলি সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা ইউনিট ৮২০০-এর সদর দপ্তর লক্ষ্য করে উন্নত ক্ষেপণাস্ত্রের একটি ব্যারেজ নিক্ষেপ করেছে।
জবাবে ইসরাইলি বিমান বাহিনী লেবাননের রাজধানী বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলীয় দাহিয়েহ এলাকায় হিজবুল্লাহর শক্তিশালী ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে ভয়াবহ বিমান হামলা চালিয়েছে। আইডিএফ জানিয়েছে, তারা হিজবুল্লাহর কমান্ড সেন্টার এবং অস্ত্র গুদামগুলো গুঁড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে এই অভিযান পরিচালনা করছে।
পরিস্থিতির ভয়াবহতা ও ভবিষ্যৎ আশঙ্কা
লেবাননের স্থানীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে, বৈরুত এবং পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলোতে ইসরাইলি হামলায় বেশ কিছু হতাহতের ঘটনা ঘটেছে এবং ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ইসরাইলি সামরিক কর্মকর্তারা সতর্ক করেছেন, হিজবুল্লাহর হামলা আরও বাড়তে পারে এবং পরিস্থিতি একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের দিকে ধাবিত হচ্ছে।
ইসরাইলের এক ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, লেবানন সরকার যদি হিজবুল্লাহর এই কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হয়, তবে ইসরাইল দেশটির বেসামরিক অবকাঠামোতেও হামলা শুরু করতে পারে। এর আগে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন এবং ইসরাইলের চ্যানেল ১২ রিপোর্ট করেছিল যে ইরান ও হিজবুল্লাহর পক্ষ থেকে একটি বড় ধরনের আক্রমণের আশঙ্কা করছে তেল আবিব।
হিজবুল্লাহ তাদের বিবৃতিতে বলেছে, লেবাননের ডজনখানেক শহর এবং বৈরুতের শহরতলিতে ইসরায়েলি হামলার পাল্টা জবাব হিসেবেই তারা এই রকেট হামলা চালিয়েছে। তারা এই অভিযানকে একটি নতুন পর্যায়ের শুরু হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। অন্যদিকে ইসরাইলের অভ্যন্তরীণ ফ্রন্ট কমান্ড উত্তরাঞ্চলের বাসিন্দাদের পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বোম্ব শেল্টার বা নিরাপদ আশ্রয়ের কাছাকাছি থাকার পরামর্শ দিয়েছে।
অনেক স্থানে রকেটের আঘাতে খোলা জায়গায় আগুনের সূত্রপাত হয়েছে এবং ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা রাতভর সেই আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করেছেন। এই সংঘাতের প্রেক্ষাপটে মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি ও স্থিতিশীলতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
