ইরানে যুদ্ধের ১০ম দিনে তেহরানে মার্কিন-ইসরায়েলি বোমা হামলা, ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ
ইরানে যুদ্ধ শুরুর ঠিক ১০ দিনের মাথায় রাজধানী তেহরান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের এক ভয়াবহ বোমা হামলার মুখে পড়েছে। গভীর রাত থেকে ভোর পর্যন্ত চলা এই বিমান হামলায় শহরজুড়ে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের খবর পাওয়া গেছে। আলজাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, সোমবার গভীর রাত থেকে মঙ্গলবার (১০ মার্চ) ভোর পর্যন্ত তেহরানের আকাশে নিচু দিয়ে উড়ে যুদ্ধবিমানগুলো একের পর এক ভারী বোমা নিক্ষেপ করে। প্রায় ১ কোটিরও বেশি মানুষের এই মহানগরের বিভিন্ন এলাকায় বিস্ফোরণের তীব্র শব্দে কেঁপে ওঠে পুরো নগরী।
রাতভর বিমান হামলা ও বাসিন্দাদের ভীতিকর অভিজ্ঞতা
হামলার আতঙ্কে অনেক বাসিন্দা ঘরেই অবস্থান করলেও রাতভর চরম ভীতিকর পরিস্থিতির মধ্যে কাটাতে হয়েছে তাদের। দিনের বেলাতেও হামলা অব্যাহত থাকে বলে স্থানীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে। পশ্চিম তেহরানের ৩৮ বছর বয়সী বাসিন্দা সিমা (ছদ্মনাম) জানান, রাতের হামলার সময় মনে হচ্ছিল কয়েক ডজন যুদ্ধবিমান তাদের মাথার ওপর দিয়ে উড়ছে। প্রায় ১৫ মিনিট ধরে একটানা বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়, এরপর কিছুক্ষণ বিরতি দিয়ে আবার হামলা শুরু হয়।
সিমা বলেন, ‘মাটি, জানালা—সবকিছু কাঁপছিল। আমরা ভয়ে বাথরুমে আশ্রয় নিয়েছিলাম এবং সেখানেই রাত কাটিয়েছি।’ আরও কয়েকজন বাসিন্দা জানিয়েছেন, বিমান হামলার সময় তীব্র আলোয় রাতের আকাশ মুহূর্তের জন্য দিনের মতো উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। কেউ কেউ বাড়ির ছাদ বা বারান্দা থেকে সেই দৃশ্য ভিডিও ধারণ করেন।
বিদ্যুৎ বিপর্যয় ও সরকারি নিষেধাজ্ঞা
সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে কোথাও কোথাও নীলাভ আলো দেখা গেছে, যা বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণে হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। হামলার পর তেহরানের কিছু এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলেও সরকার জানিয়েছে, কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তা পুনরুদ্ধার করা হয়েছে। এদিকে যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে দেশজুড়ে প্রায় সম্পূর্ণ ইন্টারনেট বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইরান সরকার।
টানা ১১ দিন ধরে চলা এই নিষেধাজ্ঞার ফলে মানুষ মূলত অভ্যন্তরীণ নেটওয়ার্কেই সীমাবদ্ধ রয়েছে এবং তথ্যপ্রবাহও অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। অনেকেই ভিপিএন বা প্রক্সি সংযোগ ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক ইন্টারনেটে ঢোকার চেষ্টা করছেন, তবে সরকার সেগুলোর অনেকগুলো বন্ধ করে দিচ্ছে। তাছাড়া এসব সংযোগের খরচও বেশ বেশি এবং গতি ধীর বলে অভিযোগ ব্যবহারকারীদের। বিশ্বব্যাপী ইন্টারনেট পর্যবেক্ষক সংস্থা নেটব্লকস জানিয়েছে, বর্তমান পরিস্থিতি সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে কঠোরভাবে সরকারি ইন্টারনেট বন্ধ করা হয়েছে।
নিরাপত্তা জোরদার ও কঠোর সতর্কতা
অন্যদিকে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে নিরাপত্তা জোরদার করেছে কর্তৃপক্ষ। ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) অধীনস্থ বাসিজ বাহিনী শহরের গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে মোড়ে চেকপোস্ট বসিয়েছে। ইরানের বিচার বিভাগ সতর্ক করে জানিয়েছে, বিদেশি গণমাধ্যমে হামলার ভিডিও বা তথ্য পাঠালে কঠোর শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের সঙ্গে সহযোগিতার অভিযোগ প্রমাণিত হলে মৃত্যুদণ্ড ও সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার বিধানও রয়েছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ গতকাল মঙ্গলবার বলেছেন, ইরানের ভেতরে এটিই হতে পারে ‘সবচেয়ে তীব্র হামলার দিন’। স্থানীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, তেহরান ছাড়াও ইসফাহান ও কারাজ শহরেও হামলার লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। এই হামলাগুলো যুদ্ধের মাত্রা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।



