ইরান যুদ্ধে ট্রাম্পের দ্বিধা: যুক্তরাষ্ট্রের চূড়ান্ত লক্ষ্য কী?
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে হামলা শুরু হয়, যা এখন দ্বিতীয় সপ্তাহে প্রবেশ করেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ফ্লোরিডার মার–এ–লাগো রিসোর্টে বসে এই হামলা শুরু দেখেন, কিন্তু তাঁর বক্তব্য ক্রমাগত পরিবর্তনশীল। যুক্তরাষ্ট্রের চাওয়া নিয়ে পরস্পরবিরোধী বিবৃতি একটি প্রশ্ন উত্থাপন করছে: ওয়াশিংটনের আসল উদ্দেশ্য কী?
হামলার পরিসংখ্যান ও প্রভাব
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় ইরানে প্রায় দুই হাজার লক্ষ্যবস্তু আক্রান্ত হয়েছে। সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ শীর্ষ কর্মকর্তারা নিহত হয়েছেন, পারমাণবিক স্থাপনা ও তেল শোধনাগারের মতো গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইরান পাল্টা হামলায় শত শত ক্ষেপণাস্ত্র ও হাজার হাজার ড্রোন পাঠিয়েছে। এখন পর্যন্ত ১,২০০-এর বেশি ইরানি নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে ১৬০ শিশু একটি স্কুলে হামলায় প্রাণ হারিয়েছে। সাত মার্কিন সেনাও নিহত হয়েছেন।
ট্রাম্পের কৌশল ও বিশ্লেষণ
ট্রাম্প প্রশাসন ইরানে শাসকগোষ্ঠী পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ না করলেও, বিশ্লেষকরা মনে করেন তাদের লক্ষ্য ছিল ক্ষমতাশালী পক্ষকে ভেঙে দেওয়া। পাকিস্তান-চায়না ইনস্টিটিউটের মুস্তফা হায়দার সায়েদ বলেন, হামলার উদ্দেশ্য ছিল শাসনব্যবস্থাকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করা ও গণবিদ্রোহ সৃষ্টি করা। তবে দোহা ইনস্টিটিউটের মুহানাদ সেলুমের মতে, ট্রাম্পের একটি 'অঘোষিত কৌশল' কাজ করছিল, যা বাস্তবে সফল হয়নি।
নেতৃত্ব পরিবর্তন ও প্রতিক্রিয়া
খামেনির উত্তরসূরি হিসেবে তাঁর পুত্র মোজতবা খামেনিকে নতুন সর্বোচ্চ নেতা ঘোষণা করা হয়েছে। ট্রাম্প তাঁকে স্বীকার করেননি এবং ইরানে নেতা নির্বাচনে নিজের সিদ্ধান্ত চেয়েছেন। সেলুম বলেন, এই নিয়োগ প্রমাণ করে যে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়েছে। ইরান যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, আত্মসমর্পণ হবে না এবং বাইরের চাপে নেতা নির্বাচিত হবেন না।
সামরিক লক্ষ্য ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
ট্রাম্প ইরানের সামরিক সক্ষমতা ধ্বংসকে মূল লক্ষ্য বলে উল্লেখ করেছেন, যুদ্ধজাহাজ ও ক্ষেপণাস্ত্র অবকাঠামোতে হামলা চালানো হয়েছে। তবে সেলুম সতর্ক করেছেন যে কেবল সামরিক শক্তি দিয়ে রাজনৈতিক সাফল্য পাওয়া যাবে না। কিংস কলেজ লন্ডনের আন্দ্রিয়াস ক্রিগের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের বাস্তবসম্মত বিকল্প হলো ইরানকে সমঝোতার জন্য চাপ দেওয়া, স্থলযুদ্ধ নয়।
ইসরায়েলের ভূমিকা ও আঞ্চলিক প্রভাব
ইসরায়েল দীর্ঘদিন ইরানকে প্রধান শত্রু বিবেচনা করে আসছে। কাতার বিশ্ববিদ্যালয়ের মাহবুব জোয়েইরি বলেন, ইসরায়েল মধ্যপ্রাচ্য পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে, যা হামাসের হামলার পর শুরু হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, ইসরায়েল সম্ভাব্য সব প্রতিপক্ষকে নির্মূল করতে চায়, যার মধ্যে ইরানও অন্তর্ভুক্ত।
ট্রাম্পের রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ
সায়েদের মতে, ট্রাম্প বাস্তববাদী এবং চুক্তির মাধ্যমে যুদ্ধ শেষ করতে চাইবেন, কিন্তু স্থল অভিযান চালানো হলে তা তাঁর রাজনৈতিক ভিত্তিতে ধাক্কা দিতে পারে। নিউ লাইন্স ইনস্টিটিউটের কামরান বোখারি বলেন, ইরাক ও আফগানিস্তানের যুদ্ধের প্রভাব বিবেচনায় ইরানে স্থল হামলা ট্রাম্পের জন্য কঠিন হবে।
সামগ্রিকভাবে, ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের চূড়ান্ত লক্ষ্য অস্পষ্ট থেকে যাচ্ছে, এবং ট্রাম্পের দ্বিধাদ্বন্দ্ব যুদ্ধের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত করে তুলেছে। বিশ্লেষকরা মনে করেন, রাজনৈতিক সমঝোতা ছাড়া এই সংঘাতের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
