মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন-ইসরায়েলি কৌশল: ইরানকে বিভক্ত করার পরিকল্পনা ও যুদ্ধের পেছনের গোপন ইতিহাস
মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে বিভক্ত করার মার্কিন-ইসরায়েলি পরিকল্পনা

মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন-ইসরায়েলি কৌশল: ইরানকে বিভক্ত করার পরিকল্পনা

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল অর্ধশতকেরও বেশি সময় ধরে একটি অভিন্ন পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে। এই পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হলো মধ্যপ্রাচ্যের আরব দেশগুলোকে হয় নিজেদের প্রভাববলয়ে নিয়ে আসা, অথবা যাদের আনা সম্ভব নয়, তাদের ছোট ছোট অংশে বিভক্ত করে দুর্বল করে ফেলা। ইরাকে মার্কিন যুদ্ধ এই কৌশলেরই একটি অংশ ছিল, এরপর লিবিয়া, সুদান ও সিরিয়ায় একই পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছে। উপসাগরীয় আরব দেশগুলো ইতিমধ্যে ইসরায়েলের সঙ্গে মিত্রতা স্থাপন করেছে, কিন্তু ইরান এখনো বাকি ছিল। সাম্প্রতিক ঘটনাবলি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে ইরানকে বাগে আনার কাজ প্রায় সম্পন্ন হতে চলেছে।

যুদ্ধের ব্যাখ্যায় ট্রাম্পের পরিবর্তনশীল বক্তব্য

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক হামলার জন্য বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন কারণ উল্লেখ করেছেন। প্রথমে তিনি দাবি করেছিলেন যে ইরানের পারমাণবিক অস্ত্রাগার যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের জন্য আশু হুমকি। কিন্তু ছয় মাস আগে তিনি নিজেই বলেছিলেন যে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা ধ্বংস করা হয়েছে। এই যুক্তি টিকতে না পেরে তিনি ইরানের ব্যালিস্টিক মিসাইল প্রকল্পের কথা তুলে ধরেন। ট্রাম্প দাবি করেন যে, এখনই যদি ইরানের মিসাইল ধ্বংস না করা হয়, তাহলে তা সমুদ্র পেরিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে আঘাত হানতে পারে। অথচ মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্বীকার করেছেন যে ইরানের এই সক্ষমতা অর্জনে কমপক্ষে আট বছর সময় লাগবে।

নেতানিয়াহুর ভূমিকা ও গোপন আলোচনা

নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানে হামলার পেছনে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনজামিন নেতানিয়াহু মুখ্য ভূমিকা পালন করেছেন। নেতানিয়াহু ট্রাম্পকে বোঝাতে সক্ষম হন যে সামরিক হামলাই ইরান প্রশ্ন চিরতরে সমাধানের একমাত্র যৌক্তিক পথ। ফ্লোরিডার মার-আ-লাগোতে ট্রাম্পের ব্যক্তিগত ক্লাবে এবং পরে হোয়াইট হাউসে অনুষ্ঠিত আলোচনায় নেতানিয়াহু ট্রাম্পকে এই হামলায় অংশ নেওয়ার জন্য রাজি করান। হামলার তারিখও জানুয়ারি থেকে ফেব্রুয়ারিতে এগিয়ে আনা হয়, কারণ ইরানের পাল্টা ড্রোন হামলা ঠেকাতে প্রয়োজনীয় ইন্টারসেপ্টর ইসরায়েলের অস্ত্রাগারে পর্যাপ্ত পরিমাণে মজুত ছিল না।

মার্কিন পররাষ্ট্রনীতিতে ইসরায়েলি প্রভাব

শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জন মিয়ার্শহাইমার তাঁর গবেষণায় উল্লেখ করেছেন যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ইসরায়েল লবির প্রভাব এতটাই প্রবল যে অনেক সময় মার্কিন স্বার্থের বদলে ইসরায়েলের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে ইরানকে বিবেচনা করে। সৌদি আরব ও উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে ইসরায়েলের মিত্রতা স্থাপিত হওয়ায়, ইরানকে কবজা করতে পারলে এই অঞ্চলে ইসরায়েলের আধিপত্য আরো সুদৃঢ় হবে। মিয়ার্শহাইমারের মতে, এই যুদ্ধ ইরান বা যুক্তরাষ্ট্র চায়নি, বরং ইসরায়েল ও নেতানিয়াহুই এটিকে এগিয়ে নিয়েছেন।

ইরানকে বিভক্ত করার কৌশল

ইরান একটি জনবহুল, অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী ও সামরিকভাবে সক্ষম দেশ, তাই শুধুমাত্র আকাশ হামলার মাধ্যমে এটিকে পরাজিত করা সহজ নয়। ট্রাম্পের রেজিম চেঞ্জ এর ধারণাও বাস্তবায়ন করা কঠিন, কারণ এর জন্য পদাতিক সৈন্য বাহিনীর প্রয়োজন। বিকল্প হিসেবে, ইরানকে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীতে বিভক্ত করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। ইরানে ফারসি, কুর্দি, আজেরি ও বালুচ জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব বিদ্যমান। এই বিভাজনকে কাজে লাগিয়ে লিবিয়া ও সিরিয়ার মতো ইরানকেও দুর্বল করার চেষ্টা চলছে।

কুর্দিদের ব্যবহার ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা

নিউইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে যে, সিআইএ ইরাকি কুর্দিদের ইরানি কুর্দিদের সঙ্গে সমন্বয় করে হামলা চালানোর জন্য প্রস্তুত করছে। ট্রাম্প ইরাকের মার্কিনপন্থী কুর্দি নেতা মাসুদ বারজানি ও বাফেল তালাবানির সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা করেছেন। এই কুর্দিদের মাধ্যমে ইরানের সামরিক বাহিনীকে ব্যস্ত রাখার পরিকল্পনা করা হয়েছে, যদিও ভারী অস্ত্র সরবরাহের অভাবে এর সাফল্য অনিশ্চিত। ইসরায়েলি সামরিক বিশেষজ্ঞ ওদেদ ইয়ানন ও গিয়োরা ইলান্দের মতে, ইরানকে বিভক্ত করে দুর্বল করা ইসরায়েলের জন্য একটি বুদ্ধিমান রণনীতি।

সামগ্রিকভাবে, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন-ইসরায়েলি কৌশল জটিল ও দীর্ঘমেয়াদি। ইরানে হামলা ও বিভক্ত করার প্রচেষ্টা এই অঞ্চলের ভূরাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলছে, এবং ভবিষ্যতে এর ফলাফল অনিশ্চিত রয়ে গেছে।