সিরিয়ায় পাহারায় সশস্ত্র কুর্দি নারী: একটি রাষ্ট্রহীন জাতির দীর্ঘ সংগ্রাম
কুর্দিরা পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ জাতিগোষ্ঠী হিসেবে পরিচিত, যাদের এখনো নিজস্ব কোনো সার্বভৌম রাষ্ট্র গঠন করা সম্ভব হয়নি। বিশ্বজুড়ে তাদের মোট জনসংখ্যা প্রায় তিন থেকে চার কোটি বলে অনুমান করা হয়। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর বেশিরভাগই বাস করে আর্মেনিয়া, ইরাক, ইরান, সিরিয়া এবং তুরস্কের সীমান্তজুড়ে বিস্তৃত পাহাড়ি অঞ্চলে, যা ঐতিহাসিকভাবে কুর্দিস্তান নামে পরিচিত।
প্রাচীন ঐতিহ্য থেকে আধুনিক সংঘাত
কুর্দিরা নিজেদের প্রাচীন মধ্যপ্রাচ্যের একটি জাতি ‘মিডস’-এর সঙ্গে যুক্ত করে দেখে, যা তাদের সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ভিত্তি নির্দেশ করে। প্রায় এক শতাব্দী আগে অটোমান সাম্রাজ্যের পতনের পর, আধুনিক মধ্যপ্রাচ্যের নতুন সীমানা নির্ধারণের সময় কুর্দিরা রাষ্ট্রহীন হয়ে পড়ে। সেই সময় থেকে, এই অস্থির অঞ্চলের রক্তাক্ত রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে তারা বারবার আটকা পড়েছে এবং নিজেদের নিরাপত্তার জন্য প্রায়ই ভরসা করতে হয়েছে নিজেদের গড়ে তোলা মিলিশিয়া বাহিনী পেশমার্গার ওপর।
ইতিহাস থেকে কুর্দিরা একটি কঠিন শিক্ষা পেয়েছে—তাদের ‘বন্ধু বলতে পাহাড় ছাড়া আর কেউ নেই’। এই উক্তি তাদের ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা এবং রাজনৈতিক সংগ্রামের প্রতীক হয়ে উঠেছে।
স্বতন্ত্র সংস্কৃতি ও ভাষার বৈচিত্র্য
ভৌগোলিকভাবে বিচ্ছিন্ন থাকলেও কুর্দিদের একটি স্বতন্ত্র এবং সমৃদ্ধ সংস্কৃতি রয়েছে। তাদের ভাষা পারসিয়ান ভাষার সঙ্গে সম্পর্কিত এবং এর বহু উপভাষা আছে, যা আঞ্চলিক বৈচিত্র্যকে তুলে ধরে। কুর্দিদের নিজস্ব ঐতিহ্যবাহী পোশাক, সংগীত, খাবার এবং আলাদা সাংস্কৃতিক পরিচয় রয়েছে, যা শতাব্দী ধরে টিকে আছে।
সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে কুর্দিদের ভূমিকা
সিরিয়ায় গত দশকের গৃহযুদ্ধের সময় কুর্দিরা সেখানে একটি স্বশাসিত অঞ্চল গড়ে তোলার চেষ্টা করেছিল। তারা যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন জোটের হয়ে ইসলামিক স্টেটের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই উদ্যোগ সফল হয়নি। এর একটি বড় কারণ ছিল যুক্তরাষ্ট্রের নীতিগত সিদ্ধান্ত, যেখানে ওয়াশিংটন নতুন একটি সিরীয় রাষ্ট্র গঠনের প্রক্রিয়া এবং তুরস্কের সঙ্গে সম্পর্ককে কুর্দিদের আকাঙ্ক্ষার চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়।
পেশমার্গা: মৃত্যুকে খোঁজা যোদ্ধারা
ইসলামিক স্টেটের বিরুদ্ধে যুদ্ধ কুর্দিদের বহু প্রাণ কেড়ে নিয়েছে, কিন্তু এই যুদ্ধ পেশমার্গাদের একটি দক্ষ যোদ্ধা বাহিনী হিসেবে পরিচিতি আরও শক্ত করেছে। ‘পেশমার্গা’ শব্দের অর্থ যারা মৃত্যুকে খুঁজে নেয়। কঠিন ভূখণ্ড সম্পর্কে তাদের গভীর জ্ঞান, দ্রুত চলাচলের ক্ষমতা এবং প্রবল মনোবল অনেক সময় ভারী অস্ত্রে সজ্জিত শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধেও তাদের টিকিয়ে রেখেছে।
আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে কুর্দিদের অবস্থান
কুর্দি জাতীয়তাবাদের সূচনা উনিশ শতকের শেষভাগে, এবং গত এক শতাব্দীতে ব্রিটেন থেকে শুরু করে পরে যুক্তরাষ্ট্র পর্যন্ত বিভিন্ন পরাশক্তি কুর্দিদের জাতীয় আকাঙ্ক্ষাকে সমর্থনের প্রতিশ্রুতি দিলেও তা শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়নি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে এই অঞ্চলের বিভিন্ন স্বৈরশাসক ও সরকার কুর্দিদের ওপর কঠোর দমন-পীড়ন চালিয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে পুরো সম্প্রদায়কেই উচ্ছেদ বা হত্যা করা হয়েছে।
বাইরের শক্তিগুলো প্রায়ই নিজেদের কৌশলগত সুবিধার জন্য কুর্দিদের ব্যবহার করার চেষ্টা করেছে, যা কুর্দি সমাজের ভেতর বিভক্তি ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা তৈরি করেছে এবং শেষ পর্যন্ত তার মাশুল দিতে হয়েছে কুর্দিদেরই।
তুরস্ক ও ইরাকে কুর্দি সংঘাত
তুরস্কে দীর্ঘদিন ধরে নিরাপত্তা বাহিনী ও কুর্দিস্তান ওয়ার্কার্স পার্টি বা পিকেকের মধ্যে সংঘাত চলছে, যেখানে এখন পর্যন্ত ৪০ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে। ইরাকে সাবেক শাসক সাদ্দাম হোসেন উত্তরাঞ্চলের কুর্দিদের বিরুদ্ধে রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার করেছিলেন, কিন্তু ১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধের পর কুর্দিরা সেখানে একটি আধা-স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গড়ে তুলতে সক্ষম হয়।
ইরানে কুর্দি অঞ্চলের অস্থিরতা
ইরানের কুর্দি অধ্যুষিত অঞ্চলগুলোতেও কেন্দ্রীয় কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে, যার সূচনা ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের সময় থেকেই। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই অঞ্চল অস্থিরতার কেন্দ্র হয়ে উঠেছে, যেমন ২০২২ সালে ইরানি-কুর্দি তরুণী মাহসা আমিনির হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনায় দেশজুড়ে বিক্ষোভ এবং ২০২৫-২০২৬ সালের সরকারবিরোধী আন্দোলনে হাজার হাজার মানুষ নিহত হওয়ার ঘটনা।
যুক্তরাষ্ট্রের কৌশল ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
এই যুদ্ধের মধ্য দিয়েই যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও কূটনৈতিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে কুর্দিদের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, ট্রাম্প প্রশাসন যদি তেহরানের বর্তমান শাসনকে দুর্বল করতে চায়, তাহলে ইরানের কুর্দিবিরোধী গোষ্ঠীগুলোর যোদ্ধাদের ব্যবহার করার চেষ্টা করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের আকাশ সমর্থন এবং মাটিতে সামরিক উপদেষ্টাদের সহায়তা থাকলে পেশমার্গারা ইরানের কুর্দি অধ্যুষিত অঞ্চলে কিছু এলাকা দখল ও নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হতে পারে, কিন্তু বিশ্লেষকদের মতে, সীমান্ত অতিক্রম করে অনেক দূর এগিয়ে যাওয়ার মতো সামর্থ্য তাদের নেই।
বরং লক্ষ্য হতে পারে ইরানের সামরিক বাহিনীকে সীমান্তবর্তী অঞ্চলে ব্যস্ত রাখতে বাধ্য করা, যাতে তাদের গুরুত্বপূর্ণ সেনা ও সম্পদ সেখানেই আটকে পড়ে। একই সঙ্গে ইরানের অন্য জাতিগত গোষ্ঠীগুলোকেও নিজেদের আন্দোলন শুরু করতে উৎসাহিত করা হতে পারে, যা সম্ভবত যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তাও পেতে পারে।
ঝুঁকি ও নিরপেক্ষতার প্রয়োজন
তবে এই পরিকল্পনার ঝুঁকিও কম নয়, এবং কুর্দি নেতারা তা খুব ভালোভাবেই জানেন। আপাতত ইরাকের উত্তরাঞ্চলের মূলধারার কুর্দি নেতৃত্ব বলছে, তারা নিরপেক্ষ অবস্থানে থাকবে। ইতিহাস বলছে, বড় কোনো যুদ্ধ শুরু হলেই কুর্দিরা প্রায়ই দুই পক্ষের সংঘর্ষের মাঝখানে পড়ে যায়, এবং তখন আবারও প্রমাণিত হয় যে শেষ পর্যন্ত তাদের প্রকৃত আশ্রয় একটাই—পাহাড়ের উঁচু চূড়াগুলো।
এই গভীর বিশ্লেষণটি দ্য গার্ডিয়ানের আন্তর্জাতিক নিরাপত্তাবিষয়ক সংবাদদাতা জেসন বার্কের রিপোর্টের উপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে, যা প্রথম আলোতে প্রকাশিত হয়েছে।



