ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলা: ট্রাম্পের গণনা ভুল, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার শঙ্কা
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক হামলা শুরু হয়েছে। তেহরানে হামলার পর ধোঁয়া উড়তে দেখা গেছে, যা আন্তর্জাতিক সংঘাতের নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ধারণা ছিল যে এই অভিযানে কম মার্কিন নাগরিকের প্রাণহানি হবে এবং অর্থনীতিতে সামান্যই প্রভাব পড়বে, কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র তুলে ধরছে।
প্রাথমিক গণনার বিপরীত ফলাফল
হামলার শুরুর দিনগুলোতেই ট্রাম্পের পূর্বাভাস চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। ইতিমধ্যেই ছয়জন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন, উপসাগরীয় অঞ্চলের মিত্রদেশগুলো হামলার মুখে পড়েছে, শেয়ারবাজার টালমাটাল হয়ে গেছে এবং গ্যাসের দাম বাড়ছে। প্রতিদিন লাখ লাখ ডলার খরচ করছে মার্কিন সামরিক বাহিনী, যা ট্রাম্প প্রশাসনের প্রাথমিক অনুমানকে ভুল প্রমাণ করছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম ও স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের দাবি অনুযায়ী, একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নির্বিচার বিমান হামলায় ১৭৫ জন নিহত হয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন এই হামলার জন্য কে দায়ী তা তদন্ত করছে, যদিও মার্কিন তদন্তে ইঙ্গিত মিলেছে যে সম্ভবত যুক্তরাষ্ট্রই দায়ী।
সেনা মোতায়েন ও দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের সম্ভাবনা
এখন পর্যন্ত কোনো মার্কিন স্থল সেনা ইরানের অভ্যন্তরে ঢোকেনি, তবে ট্রাম্প প্রশাসন সেনা মোতায়েনের সম্ভাবনাকে পুরোপুরি নাকচ করেনি। মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দিয়েছেন যে এই সংঘাত অল্প সময়ের মধ্যে শেষ হওয়ার সম্ভাবনা কম। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, 'আমরা গতি কমাচ্ছি না, বরং আরও বাড়াচ্ছি। আজই আরও বোমারু বিমান এবং যুদ্ধবিমান এসে পৌঁছাচ্ছে।'
গত শনিবার থেকে ইরানের বিরুদ্ধে নতুন দফায় আগ্রাসন শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ট্রাম্প প্রশাসন পূর্ববর্তী সামরিক সাফল্য থেকে সাহস পেয়েছিল, যেমন ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে আটক করা, ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা এবং ইয়েমেনে হুতি যোদ্ধাদের লক্ষ্য করে অভিযান। তবে বর্তমান পরিস্থিতি ভেনেজুয়েলার চেয়ে মৌলিকভাবে ভিন্ন, কারণ খরচ ইতিমধ্যেই বাড়ছে এবং প্রাণহানি ঘটছে।
বিশ্লেষকদের সতর্কতা ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
কলোরাডোর ডেমোক্র্যাট রাজনীতিবিদ জ্যাসন ক্রো, যিনি ইরাক ও আফগানিস্তানে মার্কিন সেনা কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন, সতর্ক করে বলেছেন যে যুক্তরাষ্ট্র 'অনন্ত যুদ্ধের পথে' এগোচ্ছে। তিনি বলেন, 'আবারও সেই লাখো কোটি ডলার খরচ, হাজার হাজার মার্কিন নাগরিকের প্রাণহানি, কয়েক দশকের অন্তহীন সংঘাতের দিকেই আমরা এগিয়ে যাচ্ছি।'
ক্যাটো ইনস্টিটিউটের জন হফম্যান উল্লেখ করেছেন যে ট্রাম্প কম খরচে চমকপ্রদ বিজয় পছন্দ করেন, কিন্তু ইরান পরিস্থিতি ভিন্ন। ইউরোপের প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম প্রায় ৪০ শতাংশ বেড়ে গেছে এবং পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তিনি সতর্ক করেছেন যে ইরানে বিভক্তি তৈরি করার পরিকল্পনা মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য নজিরবিহীন মাত্রার ছায়া যুদ্ধ সৃষ্টি করতে পারে, যা বিশৃঙ্খলা, শরণার্থীপ্রবাহ এবং আইএসআইএসের মতো গোষ্ঠীর উত্থানের সুযোগ তৈরি করবে।
অন্যদিকে, কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস-এর এলিয়ট আব্রামস বিশ্বাস করেন যে ইরানের নেতাদের হত্যা ও সামরিক সক্ষমতা ভেঙে ফেলার মাধ্যমে সুবিধা অর্জন করা যাবে। তিনি বলেন, 'এই শাসকগোষ্ঠী ৪০ বছরেরও বেশি সময় ধরে মার্কিন নাগরিকদের হত্যার চেষ্টা করেছে। যদি শাসকগোষ্ঠীর অবশিষ্টাংশ ক্ষমতায় থেকে যায়, তাহলেও তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি থাকবে না।'
রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া ও ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা
হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলাইন লেভিট বলেছেন যে ট্রাম্প ইরানের জনগণকে তাদের দেশের 'নিয়ন্ত্রণ' নেওয়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করেছেন, তবে সরকারবিরোধী লড়াইয়ে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য কোনো নির্দিষ্ট সত্তাকে সমর্থন করেননি। হামলা শুরু করার পর থেকে ট্রাম্প কুর্দি নেতাদের সঙ্গে কথা বলেছেন, কিন্তু ইরানি সরকারকে উৎখাত করার জন্য তাদের অস্ত্র দেওয়ার কোনো পরিকল্পনায় তিনি একমত হননি।
মোটকথা, ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলা ট্রাম্প প্রশাসনের প্রাথমিক গণনাকে চ্যালেঞ্জ করছে। অর্থনৈতিক প্রভাব, সেনা প্রাণহানি এবং দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের সম্ভাবনা এই সংকটকে জটিল করে তুলছে, যা আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক স্তরে গুরুতর পরিণতি বয়ে আনতে পারে।
