দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর প্রথমবার: মার্কিন সাবমেরিনের টর্পেডোয় ইরানি যুদ্ধজাহাজ ধ্বংস
মার্কিন সাবমেরিনের টর্পেডোয় ইরানি যুদ্ধজাহাজ ধ্বংস

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর প্রথমবার: মার্কিন সাবমেরিনের টর্পেডোয় ইরানি যুদ্ধজাহাজ ধ্বংস

শ্রীলঙ্কার কাছে ভারত মহাসাগরে গত বুধবার মার্কিন হামলায় ইরানি যুদ্ধজাহাজ 'আইআরআইএস ডেনা' তলিয়ে গেছে। এই ঘটনাটি ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এই প্রথমবারের মতো কোনো মার্কিন নৌবাহিনীর সাবমেরিন থেকে ছোড়া টর্পেডোর আঘাতে কোনো যুদ্ধজাহাজ সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়েছে। পেন্টাগন এখন পর্যন্ত হামলাকারী সাবমেরিনটির নাম প্রকাশ করেনি, তবে প্রতিরক্ষা দপ্তর একটি ভিডিও প্রকাশ করেছে, যেখানে স্পষ্ট দেখা যায় ইরানের যুদ্ধজাহাজটির পেছনের অংশে একটি টর্পেডো আঘাত হানছে এবং বিশাল জলরাশি আকাশের দিকে উঠে যাচ্ছে।

হামলার বিস্তারিত বিবরণ ও প্রতিক্রিয়া

হামলার ফলে যুদ্ধজাহাজটির মূল কাঠামো দ্বিখণ্ডিত হতে দেখা যায়, যা মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ 'নীরব মৃত্যু' বলে অভিহিত করেছেন। জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন বিষয়টিকে পেশাদার দৃষ্টিভঙ্গিতে ব্যাখ্যা করে বলেন, টর্পেডোটি 'তাৎক্ষণিক প্রভাব' সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছে। শ্রীলঙ্কার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তারা ৩২ জন ইরানি নাবিককে উদ্ধার করতে পেরেছেন, যদিও জাহাজটিতে প্রায় ১৮০ জন ক্রু ছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও টর্পেডোর প্রযুক্তি

ইউএস নেভি হিস্ট্রি অ্যান্ড হেরিটেজ কমান্ডের তথ্যমতে, সর্বশেষ ১৯৪৫ সালের ১৪ আগস্ট মার্কিন সাবমেরিন 'ইউএসএস টর্স্ক' থেকে শত্রুপক্ষের জাহাজে টর্পেডো ছোড়া হয়েছিল, যা জাপানের একটি ৭৫০ টনের জাহাজ ডুবিয়ে দিয়েছিল। এরপর থেকে স্নায়ুযুদ্ধ থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত মার্কিন সাবমেরিনগুলো অত্যন্ত বিপজ্জনক এবং সংবেদনশীল গোয়েন্দা মিশনে নিয়োজিত থাকলেও কোনো জাহাজ ডোবানোর কাজে টর্পেডো ব্যবহার করেনি। তবে ১৯৯১ সালের 'অপারেশন ডেজার্ট স্টর্ম' থেকে শুরু করে ইরাক, আফগানিস্তান, সোমালিয়া, লিবিয়া, ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহী এবং গত জুনে ইরানের ইস্পাহানে পারমাণবিক কেন্দ্রে হামলায় সাবমেরিন থেকে নিয়মিত ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র বা টমাহক মিসাইল ব্যবহার করা হয়েছে।

জেনারেল কেইন জানান, ইরানি যুদ্ধজাহাজ ডোবাতে 'মার্ক-৪৮' হেভিওয়েট টর্পেডো ব্যবহার করা হয়েছে। ১৯৭২ সালে প্রথম অন্তর্ভুক্ত হওয়া এই টর্পেডোটি সময়ের সঙ্গে আধুনিকায়ন করা হয়েছে। প্রায় ৩,৮০০ পাউন্ড ওজনের এই টর্পেডো সোনার ব্যবহার করে লক্ষ্যবস্তু খুঁজে বের করে এবং জাহাজের নিচে গিয়ে বিস্ফোরিত হয়। এই বিস্ফোরণে সৃষ্ট গ্যাসের বুদ্বুদ জাহাজের মেরুদণ্ড ভেঙে দেয়, ফলে জাহাজটি দ্রুত দুই টুকরো হয়ে ডুবে যায়। প্রতিরক্ষা দপ্তরের শেয়ার করা একটি ছবিতে দেখা যায়, পানিতে তলিয়ে যাওয়ার আগে যুদ্ধজাহাজটির সামনের অংশটি খাড়াভাবে ওপরের দিকে উঠে আছে, যা হামলার তীব্রতা নির্দেশ করে।

আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক প্রভাব

এই ঘটনা মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে উত্তেজনা বৃদ্ধির ইঙ্গিত দিচ্ছে, বিশেষ করে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে চলমান সংঘাত এবং যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকার প্রেক্ষিতে। এটি আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও নৌ কৌশলে নতুন মাত্রা যোগ করেছে, যেখানে মার্কিন নৌবাহিনীর সাবমেরিনের ক্ষমতা পুনরায় প্রমাণিত হলো। ভবিষ্যতে অনুরূপ হামলার সম্ভাবনা এবং এর রাজনৈতিক ও কৌশলগত পরিণতি নিয়ে বিশ্বব্যাপী আলোচনা শুরু হয়েছে।