ইরান-ইসরাইল যুদ্ধে পুতিনের ভূ-রাজনৈতিক বিজয়ের দাবি: বিশ্লেষণ
ইরান-ইসরাইল যুদ্ধে পুতিনের ভূ-রাজনৈতিক বিজয়

ইরানের আকাশে ইসরাইলি যুদ্ধবিমানের গর্জন এবং সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির হত্যাকাণ্ডে পুরো মধ্যপ্রাচ্য উত্তপ্ত অবস্থায় রয়েছে। এই সংকটের মধ্যেও দূরের মস্কোয় বসে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এক ভিন্ন সমীকরণ তৈরি করছেন বলে বিশ্লেষকরা মত দিচ্ছেন।

পুতিনের কৌশলগত সুবিধা

আপাতদৃষ্টিতে ইরানের এই বিপর্যয় রাশিয়ার জন্য অস্বস্তির কারণ মনে হলেও, পুতিনের দৃষ্টিতে এটি তার দীর্ঘদিনের ভূ-রাজনৈতিক পূর্বাভাসের প্রতিফলন। ২০১১ সালে লিবিয়ায় মুয়াম্মার গাদ্দাফির নৃশংস পরিণতি পুতিনকে যে সতর্কবার্তা দিয়েছিল, ইরানের বর্তমান ধ্বংসযজ্ঞ যেন সেই আশঙ্কারই জীবন্ত দলিল হিসেবে কাজ করছে।

পশ্চিমা বিশ্বের প্রতি জবাব

ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনকে যারা আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন বলে অভিযুক্ত করছেন, তাদের জন্য পুতিন ইরানের এই পরিস্থিতিকে এক মোক্ষম জবাব হিসেবে দেখছেন। তিনি একে মার্কিন নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা বিশ্বের ‘উচ্ছৃঙ্খল ও অযৌক্তিক’ আচরণের প্রমাণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

একদিকে বিশ্ববাজারে তেলের চড়া দাম রাশিয়ার কোষাগারকে সমৃদ্ধ করছে, অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের নতুন সংঘাতে আমেরিকার ব্যস্ততা ইউক্রেন যুদ্ধে মস্কোকে কৌশলগত সুবিধা দিচ্ছে। বিশ্লেষক লিওনিদ রাগো জিনের মতে, পুতিন ইরানের এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতকে দাবার ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহার করে বিশ্বমঞ্চে রাশিয়ার দাপট বাড়াচ্ছেন।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

পুতিনের কাছে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের এই যুদ্ধ ২০১১ সালের লিবিয়া সংকটের প্রতিচ্ছবি। সেই বছর ন্যাটোর হস্তক্ষেপে গাদ্দাফি ক্ষমতাচ্যুত হন, যা পুতিনের নিরাপত্তাঝুঁকির ধারণাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। লিবিয়ায় ন্যাটোর হামলায় রাশিয়ার ভোটদান থেকে বিরত থাকার সিদ্ধান্ত পুতিনকে আবারও প্রেসিডেন্ট হওয়ার পথে ঠেলে দিয়েছিল।

গাদ্দাফির মৃত্যুর পর লিবিয়ায় গণতন্ত্র বা সমৃদ্ধি না এনে গৃহযুদ্ধ সৃষ্টি হওয়ায় পুতিনের কাছে এটি স্পষ্ট সতর্কবার্তা হয়ে দাঁড়ায়। তিনি মনে করেন, পশ্চিমা বিশ্বের ‘গণতন্ত্রায়ন’ অভিযান রাশিয়ার জন্যও হুমকি সৃষ্টি করতে পারে।

ইউক্রেন যুদ্ধের প্রাসঙ্গিকতা

ইরানের বর্তমান ঘটনাপ্রবাহ পর্যবেক্ষণ করে পুতিন সম্ভবত আত্মতৃপ্তি বোধ করছেন যে, ইউক্রেনে তার পদক্ষেপগুলো সঠিক ছিল। তিনি সোভিয়েত পূর্বসূরিদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন, যারা পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডার তৈরি করে রাশিয়ার সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করেছিলেন।

ক্রেমলিনের মতে, ইউক্রেনে রাশিয়ার আক্রমণ একটি ‘প্রতিরোধমূলক’ পদক্ষেপ, যা ইরাক, লিবিয়া ও সিরিয়ার মতো হস্তক্ষেপ থেকে রক্ষা পেতে নেওয়া হয়েছে। এই যুদ্ধে ইউক্রেনকে চূড়ান্ত যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত করে রাশিয়ার জনগণকে প্রত্যক্ষ প্রভাব থেকে আড়াল করা সম্ভব হয়েছে।

রাশিয়া-ইরান সম্পর্ক

ঐতিহাসিক বৈরীতা সত্ত্বেও, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইরান রাশিয়ার অপ্রত্যাশিত মিত্র হয়ে উঠেছে। ইরান গুরুত্বপূর্ণ ড্রোন প্রযুক্তি সরবরাহ করেছিল, যদিও এটি নিঃস্বার্থ বন্ধুত্বের নিদর্শন ছিল না—বিনিময়ে তেহরানকে বিলিয়ন ডলার দেওয়া হয়েছিল।

তবে রাশিয়া ও ইরানের সম্পর্ক এখনও এতটা গভীর নয় যে মস্কো সরাসরি হস্তক্ষেপ করবে। ইসরাইলের সঙ্গে ক্রেমলিনের একটি অলিখিত ‘অনাক্রমণ চুক্তি’ রয়েছে, এবং ইসরাইল ইউক্রেনকে অস্ত্র সরবরাহ বা নিষেধাজ্ঞায় যোগ দেয়নি।

অর্থনৈতিক প্রভাব

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের অভিযান স্বল্পমেয়াদে রাশিয়ার উপকার করছে। তেল ও গ্যাসের দাম বৃদ্ধি রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় কোষাগারে বেশি অর্থ জমা করছে। জ্বালানির চড়া দাম ইউরোপীয় ইউনিয়নের সামর্থ্যেও আঘাত হানবে, যা ইউক্রেনকে সহায়তা দেওয়ার সক্ষমতা কমাতে পারে।

মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ আমেরিকার অস্ত্রভাণ্ডারে টান পড়াবে, বিশেষ করে আকাশ প্রতিরক্ষা মিসাইলগুলো এখন ইসরাইলকে দিতে হচ্ছে। এটি ইউক্রেনের সঙ্গে আলোচনায় মস্কোকে সুবিধাজনক অবস্থানে রাখবে।

ঘরোয়া রাজনীতিতে প্রভাব

পুতিন ইরানের ধ্বংসযজ্ঞ থেকে ঘরোয়া রাজনীতিতে ফায়দা লুটবেন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল এই যুদ্ধকে ইরানিদের জন্য সুযোগ হিসেবে প্রচার করলেও, এটি সাধারণ রুশদের মনে ‘অবরুদ্ধ দুর্গের’ আশঙ্কা জাগাবে। এতে পুতিনের ইমেজ স্বৈরাচারী শাসক নয়, বরং জাতির ‘ত্রাতা’ বা রক্ষক হিসেবে সুসংহত হবে।

সামগ্রিকভাবে, ইরান-ইসরাইল যুদ্ধ পুতিনের ভূ-রাজনৈতিক কৌশলের বিজয় হিসেবে দেখা হচ্ছে, যা রাশিয়াকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে যাচ্ছে।