ইরান-ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত: হামলা ও পাল্টা হামলায় উত্তপ্ত মধ্যপ্রাচ্য
মধ্যপ্রাচ্যে ইরান, ইসরাইল এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান সংঘাত ক্রমাগত তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। কোনো পক্ষই পিছু হটতে নারাজ, বরং একে অপরের স্বার্থে আঘাত হানার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। এই সংঘাতের ফলে প্রতিদিন মানুষ মারা যাচ্ছে, অবকাঠামো ধ্বংস হচ্ছে এবং বিশ্ব অর্থনীতি মারাত্মক বিপর্যয়ের মুখোমুখি হচ্ছে। পরোক্ষভাবে দুই পক্ষের যুদ্ধ থামানোর প্রচেষ্টাও ব্যর্থ হচ্ছে, বরং উভয় পক্ষ কঠোর আঘাত হানার প্রতিজ্ঞা করেছে।
হামলার মাত্রা বৃদ্ধি ও বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতি
ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনিকে হত্যার পর থেকে ইরান হামলার মাত্রা কয়েক গুণ বাড়িয়েছে। ইসরাইল এবং মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিতে হামলা অব্যাহত রেখেছে। ইসরাইলও পাল্টা হামলা হিসেবে ইরানসহ লেবাননে দেশটির প্রক্সি বাহিনী হিজবুল্লাহ গোষ্ঠীর ওপর তীব্র আক্রমণ চালাচ্ছে। ইরান যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইলের সঙ্গে আলোচনায় বসতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। এরপর গতকাল মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, ইরানের সঙ্গে আলোচনা নয়, প্রয়োজনে ইরানে স্থল অভিযান চলানো হবে।
ইরানের রাজধানী তেহরান, বুশেহর এবং উর্মিয়াসহ বিভিন্ন শহরে আমেরিকা-ইসরাইলের আক্রমণ অব্যাহত রয়েছে। কয়েক ঘণ্টা ধরে ইরানের কয়েকটি বড় শহরের মতো পারদিস এবং পারচিনের মতো এলাকাগুলোতেও অব্যাহতভাবে আক্রমণ চালানো হয়েছে। ইসফাহানের গভর্নরেট জানিয়েছে, ইসফাহানে মঙ্গলবারের হামলায় তিন জন নাগরিক নিহত হয়েছেন। ইরানের কেরমানে সেনা বিমানঘাঁটিতে হামলায় ১৩ জন নিহত হয়েছেন। এছাড়া মিনাব স্কুলে চালানো হামলার সময় ৩৫ জন শিক্ষক ও কর্মচারী ছিলেন, যাদের মধ্যে ১৪ জন নিহত হয়েছেন। যুদ্ধের শুরু থেকে প্রায় পাঁচটি বড় হাসপাতাল, বেশ কয়েকটি জরুরি কেন্দ্র এবং মোট ১০টি স্বাস্থ্য ও চিকিত্সাকেন্দ্র লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। তেহরানের জরুরি বিভাগের প্রধান জানিয়েছেন, সোমবারের বিমান হামলায় আটটি অ্যাম্বুলেন্স এবং সহায়তাকারী যানবাহন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা পদক্ষেপ
লেবাননে স্থল অভিযান চালানোর ঘোষণা দিয়েছে ইসরাইল। ওমান উপসাগরে ইরানের নৌবাহিনীর ১১টি জাহাজ ধ্বংসের দাবি করেছে মার্কিন সেনাবাহিনী। এবার ইরানের প্রেসিডেন্ট কার্যালয়ে হামলা চালানোর দাবি করেছে ইসরাইলি বিমান বাহিনী। ইসরাইল সামরিক বাহিনী এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ইরানের প্রেসিডেন্টের কার্যালয় এবং সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলে অসংখ্য গোলাবারুদ নিক্ষেপ করা হয়েছে। বার্তায় আরো বলা হয়েছে, ইরানের একটি সামরিক প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান এবং দেশটির শাসন ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতেও হামলা করা হয়েছে। আইডিএফ জানিয়েছে, খামেনি এই কম্পাউন্ডটি ব্যবহার করেছিলেন।
যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক ইরানের মানবাধিকার সংস্থা এইচআরএএনএ জানিয়েছে, ১৭৬ জন শিশুসহ ৭৪২ জন বেসামরিক নাগরিক মারা গেছেন। এদিকে ইসরাইলি হামলায় ইরানের নাতাঞ্জ পারমাণবিক কমপ্লেক্সের তিনটি ভবনে বেশ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। তবে হামলার পর তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়ার প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ)।
অঞ্চলজুড়ে হামলা ও উত্তেজনা বৃদ্ধি
পালটা হামলা চালাচ্ছে তেহরান। রিয়াদে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস গতকাল সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলে একটি আসন্ন হামলার বিষয়ে সতর্কবার্তা জারি করে। এর আগে সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, রিয়াদে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসে দুটি ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে। এক বিবৃতিতে মন্ত্রণালয় জানায়, এ ঘটনায় সীমিত মাত্রার অগ্নিকাণ্ড এবং ভবনের সামান্য ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। সৌদি আরবে জেদ্দা, রিয়াদ এবং জাহরানে যুক্তরাষ্ট্রের মিশনের কর্মীদের জন্য পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত নিরাপদ আশ্রয়ে থাকার নির্দেশনা জারি করেছে এবং জানিয়েছে যে তারা অঞ্চলে অবস্থিত যে কোনো সামরিক স্থাপনায় অপ্রয়োজনীয় ভ্রমণ সীমিত করবে। কুয়েতেও মার্কিন দূতাবাস বন্ধের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
উপসাগরীয় অঞ্চলে আমেরিকার সবচেয়ে বড় রেডার ব্যবস্থা এফপিএস ১৩২-কে নষ্ট করে দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেছে ইরান। বাহরাইনে যুক্তরাষ্ট্রের বিমানঘাঁটি ধ্বংসের দাবি করেছে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম। ফার্স নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, দূরবর্তী লক্ষ্যবস্তুতে একের পর এক রকেট বিস্ফোরিত হয়। সংস্থাটির দাবি, আইআরজিসির ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় বাহরাইনের শেখ ঈসা অঞ্চলে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিতে একটি কমান্ড ও স্টাফ বিল্ডিং ধ্বংস হয়েছে এবং জ্বালানির ট্যাংকে বিস্ফোরণ ঘটেছে। ঘটনা সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্র এখনো কোনো মন্তব্য করেনি। এর আগে বাহরাইনে যুক্তরাষ্ট্র পরিচালিত একটি নৌঘাঁটি থেকে ধোঁয়া উঠতে দেখা যায়। কাতারের দোহা শহর জুড়ে বিস্ফোরণের প্রচণ্ড শব্দ শোনা যায় গতকাল। এর আগে ইরানের হামলার জেরে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস উত্পাদন বন্ধ করার ঘোষণাও দিয়েছে দেশটি। ওমানের দুকম বন্দরের একটি জ্বালানি ট্যাংক ড্রোন হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে বলে জানিয়েছে দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা।
আলোচনা ব্যর্থ ও ভবিষ্যতের হুমকি
ইরানের পাশাপাশি ইসরাইলে লেবাননের হিজবুল্লাহ হামলা চালিয়েছে। দেশটির সামরিক স্থাপনায় হামলার দাবি করেছে হিজবুল্লাহ। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কোর (আইআরজিসি)। তারা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, এই পথ দিয়ে কোনো জাহাজ পার হওয়ার চেষ্টা করলে সেটি পুড়িয়ে দেবে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে আলোচনার সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছেন। তার দাবি, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ হামলা শুরু হওয়ার পর ইরান আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছিল। ট্রাম্প তার ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া পোস্টে বলেন, এখন ইরানের সঙ্গে আলোচনার সময় পার হয়ে গেছে। অনন্তকাল ধরে লড়াই করা যেতে পারে এত পরিমাণ অস্ত্রের মজুত তাদের কাছে রয়েছে বলে মন্তব্য করেন ট্রাম্প। কেবল নেটওয়ার্ক নিউজনেশনকে দেওয়া সাক্ষাত্কারে ট্রাম্প বলেন, রিয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসে হামলা এবং মার্কিন সেনাসদস্যদের মৃত্যুর ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্র শিগগিরই পালটা ব্যবস্থা নেবে। এর আগের দিন ইরানও জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো সমঝোতা হবে না। যুক্তরাষ্ট্র সোমবার রাতে জানায়, এখন পর্যন্ত ছয় জন সেনাসদস্য নিহত এবং ১৮ জন আহত হয়েছে। ট্রাম্প বলেন, ইরানে স্থলবাহিনী মোতায়েনের প্রয়োজন হবে বলে তিনি মনে করেন না। তবে দরকার হলে সেটা করতেও দ্বিধা করবে না ওয়াশিংটন।
এদিকে মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের হামলার তীব্রতা বাড়ার ফলে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর তাদের নাগরিকদের ১৪টি দেশ অবিলম্বে ছেড়ে যাওয়ার জন্য সতর্ক করেছে। এই দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে—বাহরাইন, মিশর, ইরান, ইরাক, ইসরাইল ও ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড, জর্ডান, কুয়েত, লেবানন, ওমান, কাতার, সৌদি আরব, সিরিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং ইয়েমেন। এই সতর্কতা সংঘাতের ব্যাপকতা এবং ভবিষ্যতের সম্ভাব্য ঝুঁকির ইঙ্গিত দিচ্ছে।
