ইরানের সামরিক সংঘাত: চতুর্থ দিনে উত্তাল মধ্যপ্রাচ্য, বিশ্লেষণে উঠে এলো বড় চ্যালেঞ্জ
ইরানের যুদ্ধ: চতুর্থ দিনে উত্তাল মধ্যপ্রাচ্য, বিশ্লেষণে চ্যালেঞ্জ

ইরানের সামরিক সংঘাত: চতুর্থ দিনে উত্তাল মধ্যপ্রাচ্য, বিশ্লেষণে উঠে এলো বড় চ্যালেঞ্জ

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে তেহরানের সরাসরি সামরিক সংঘাত চতুর্থ দিনে প্রবেশ করেছে। ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা-পাল্টা হামলায় এখন উত্তাল গোটা মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চল। কিন্তু এই যুদ্ধ কত দিন চালিয়ে নিতে পারবে ইরান? সামরিক বিশ্লেষক ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে, ইরানের সামনে অপেক্ষা করছে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ, যা তার সামরিক সক্ষমতা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে পরীক্ষায় ফেলেছে।

সামরিক সক্ষমতা: বিশাল ভাণ্ডার, কিন্তু স্থায়িত্ব সীমিত

ইরানের সবচেয়ে বড় শক্তি তার বিশাল ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার এবং ড্রোন তৈরির সক্ষমতা। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার তথ্য অনুসারে, সংঘাত শুরুর সময় ইরানের কাছে প্রায় ২ হাজার ৫০০ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং হাজার হাজার ড্রোন মজুত ছিল। তবে ২০২৫ সালের জুনে ইসরায়েলের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধে ইরানের প্রতিরক্ষা ও আক্রমণ সক্ষমতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। রাশিয়া তখন ইরানের বিধ্বস্ত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পুনর্গঠনে সহায়তা করতে অস্বীকার করে, যা তেহরানের দুর্বলতা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

হিব্রু বিশ্ববিদ্যালয়ের সামরিক ইতিহাসবিদ অধ্যাপক ড্যানি অরবাখ মনে করেন, বিমানবাহিনীর দুর্বলতা ইরানের জন্য বড় প্রতিবন্ধকতা। অত্যাধুনিক মার্কিন স্টিলথ বিমানের তুলনায় ইরানের বিমানবাহিনী অনেক পিছিয়ে। ফলে আকাশযুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে এই বৈষম্য আরও প্রকট হবে।

তবে ইরান কৌশল পরিবর্তন করেছে। ২০২৫ সালের যুদ্ধে তারা একসঙ্গে ডজনখানেক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করলেও এখন ছোট ছোট সংখ্যায় দীর্ঘ সময় ধরে হামলা চালাচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, এর কারণ হতে পারে তাদের সীমিত উৎক্ষেপণ সক্ষমতা। ভূগর্ভস্থ বাঙ্কারে লুকানো ক্ষেপণাস্ত্রগুলো রক্ষা করাও তাদের জন্য জরুরি, কারণ একবার নিঃশেষ হয়ে গেলে পুনরুদ্ধারের সুযোগ নেই।

অর্থনৈতিক চাপ: যুদ্ধ চালানোর সামর্থ্য কতটা?

ইরানের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা তার অর্থনীতি। ২০১৮ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমলে জেসিপিওএ থেকে বেরিয়ে আসার পর থেকে ইরানের ওপর কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা জারি রয়েছে। তেল রফতানি অস্থিতিশীল হয়েছে, মুদ্রার মান তলানিতে ঠেকেছে। মুদ্রাস্ফীতি ৩০ থেকে ৪০ শতাংশের ওপর রয়েছে এবং খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি ৭০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুসারে, ২০২৫ সাল থেকে ইরানের অর্থনীতি সঙ্কুচিত হতে শুরু করেছে।

এই অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ তেহরানের জন্য বড় মাথাব্যথা। টানা যুদ্ধ অর্থনীতিকে আরও চাপে ফেলবে এবং জনগণের মধ্যে অসন্তোষ বাড়াবে। ২০২৫ সালের শেষ দিকে ইরানের ৩১টি প্রদেশেই অর্থনৈতিক অসন্তোষ থেকে বিক্ষোভ হয়েছে, যা অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার ইঙ্গিত দেয়।

নেতৃত্বশূন্যতা ও অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা

খামেনির মৃত্যুর পর ইরানের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। জেরুজালেম পোস্টের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বিমান হামলা দিয়ে সরকার উৎখাতের দৃষ্টান্ত ইতিহাসে বিরল। ইরানের শাসনব্যবস্থা এমন নেতৃত্বশূন্যতার জন্য তৈরি ছিল। বহুস্তরীয় কমান্ড কাঠামো এবং ভূগর্ভস্থ স্থাপনা দীর্ঘদিন ধরে তৈরি করে রেখেছে তারা। তা সত্ত্বেও, যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে পড়া এবং ক্রমাগত চাপের মুখে অভ্যন্তরীণ পতন ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসবিদ আরাশ আজিজির মতে, খামেনির মৃত্যু ইরানের রাজনীতিতে বড় পরিবর্তন আনতে পারে। এমনকি বর্তমান শাসনব্যবস্থা টিকে গেলেও তার কিছু ধ্বংসাত্মক নীতি পরিত্যাগের সম্ভাবনা আছে, যা আঞ্চলিক সমীকরণে প্রভাব ফেলতে পারে।

মার্কিন সীমাবদ্ধতা ও আন্তর্জাতিক সমীকরণ

ইরানের পক্ষে আশার খবর হলো, যুক্তরাষ্ট্রেরও কিছু সীমাবদ্ধতা আছে। উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন মিত্রদের পর্যাপ্ত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নেই এবং ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের মজুতও সীমিত। ইরানের ২ হাজারের বেশি স্বল্পপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র আমেরিকার প্রতিরক্ষা ভাণ্ডার নিঃশেষ করে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

অন্যদিকে রাশিয়া ও চীন ইরানের পাশে দাঁড়ানোর কোনও ইঙ্গিত দেয়নি। ২০২৫ সালের জুনের হামলার পরও তারা কার্যত নীরব ছিল, যা আন্তর্জাতিক সমর্থনের অভাব নির্দেশ করে।

শেষ পর্যন্ত কী হতে পারে?

সিডনি মর্নিং হেরাল্ডের বিশ্লেষক ডেভিড ক্রো লিখেছেন, ইরানের কাছে এখনও সপ্তাহখানেকের মতো হামলা চালানোর অস্ত্র আছে। কিন্তু মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন, যুদ্ধ চার থেকে পাঁচ সপ্তাহ চলতে পারে। দুটি সম্ভাব্য পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। প্রথমটি হলো, ক্রমাগত চাপ ও অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার মুখে ইরানের শাসনব্যবস্থার পতন। দ্বিতীয়টি হলো, সরকার টিকে গেলেও সামরিক সক্ষমতা এতটাই ধ্বংস হয়ে যাবে যে আগামী বছরগুলোতে তারা আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে প্রভাব হারাবে।

তবে, ফিচ রেটিংসের বিশ্লেষণ বলছে, দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের সম্ভাবনা অনিশ্চিত এবং এর প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী। ইরানের জনগণের জন্য এর অর্থ হবে আরও অনিশ্চয়তা, আরও দারিদ্র্য এবং আরও অশান্তি, যা পুরো মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলের স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে।