ইরানে মার্কিন অভিযান: 'অপারেশন এপিক ফিউরি' ও যুদ্ধের সম্ভাব্য খরচ বিশ্লেষণ
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের বিরোধে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে গত শনিবার। ওই দিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বিমান হামলা ইরানের ভূখণ্ডে আঘাত হানে, যা দুই পক্ষের পুরোনো সামরিক শত্রুতাকে নতুন করে উসকে দিয়েছে। এর প্রতিক্রিয়ায় ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা চালাচ্ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইতিমধ্যে ইঙ্গিত দিয়েছেন, এই সামরিক অভিযান চার থেকে পাঁচ সপ্তাহ পর্যন্ত চলতে পারে। তাঁর এমন মন্তব্যের পর প্রশ্ন উঠেছে, মধ্যপ্রাচ্যে এই নতুন যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারবে কি ওয়াশিংটন? এবং শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের কতটা আর্থিক খরচ হতে পারে?
'অপারেশন এপিক ফিউরি'র সূচনা ও উদ্দেশ্য
২৮ ফেব্রুয়ারি, ট্রাম্প তাঁর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে একটি ভিডিও পোস্ট করে ঘোষণা দেন যে মার্কিন বাহিনী ইরানের ভূখণ্ডে একটি 'বড় যুদ্ধাভিযান' শুরু করেছে। পরবর্তীতে পেন্টাগন 'এক্স'-এ পোস্ট দিয়ে জানায়, ইরানে চলমান এই সামরিক অভিযানের নাম দেওয়া হয়েছে 'অপারেশন এপিক ফিউরি'। ট্রাম্পের দাবি, ইরান যাতে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে না পারে, সেটা নিশ্চিত করাই এই অভিযানের মূল উদ্দেশ্য। তিনি বলেন, 'আমরা তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করতে যাচ্ছি। তাদের ক্ষেপণাস্ত্রশিল্প মাটিতে মিশিয়ে দেব। এটি সম্পূর্ণরূপে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হবে।'
হামলার পরিসংখ্যান ও প্রভাব
অভিযান শুরুর পর থেকে ইরানের ১ হাজার ২৫০টির বেশি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা হয়েছে বলে মার্কিন সামরিক বাহিনী জানিয়েছে। সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) পৃথক বিবৃতিতে জানায়, তারা হামলা চালিয়ে ১১টি ইরানি জাহাজ ধ্বংস করেছে। এই অভিযানে বিমান হামলা, সাগর থেকে ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ এবং ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে সমন্বিত হামলা চালানো হচ্ছে। পাশাপাশি ইরানের প্রতিরক্ষাসংশ্লিষ্ট উচ্চপর্যায়ের ব্যক্তিদের ওপরও আক্রমণ চলছে। ইরানের রেড ক্রিসেন্টের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ইরানের ১৩০টি জায়গায় ৫৫৫ জন নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিও রয়েছেন, যিনি শনিবারের হামলায় নিহত হন।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক খরচের বিশদ বিশ্লেষণ
ব্রাউন ইউনিভার্সিটির ২০২৫ সালের 'কস্ট অব ওয়ার' প্রতিবেদন অনুসারে, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর থেকে ইসরায়েলকে প্রায় ২ হাজার ১৭০ কোটি ডলারের সামরিক সহায়তা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এই প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে ইয়েমেন, ইরানসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে ইসরায়েলকে সামরিক হামলায় সহায়তা করতে গিয়ে মার্কিন করদাতাদের পকেট থেকে ৯৬৫ কোটি থেকে ১ হাজার ২০৭ কোটি ডলার খরচ হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে যুদ্ধ ও সংঘাতের ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের মোট খরচ ৩ হাজার ১৩৫ কোটি ডলার থেকে বেড়ে ৩ হাজার ৩৭৭ কোটিতে উন্নীত হয়েছে এবং এটি ক্রমাগত বাড়ছে।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের তথ্য অনুযায়ী, 'অপারেশন এপিক ফিউরি'-তে আকাশ, সাগর, ভূমি এবং ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা মিলিয়ে ২০টির বেশি অস্ত্রব্যবস্থা মোতায়েন রয়েছে, যা দিয়ে ইতিমধ্যে ইরানে হাজারের বেশি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা হয়েছে। সেন্টার ফর নিউ আমেরিকান সিকিউরিটির হিসাবে, ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ডের মতো একটি বিমানবাহী রণতরি পরিচালনায় প্রতিদিন আনুমানিক ৬৫ লাখ ডলার খরচ হয়, এবং সরঞ্জামের ক্ষতির খরচও এর সাথে যুক্ত হবে।
ব্যবহৃত অস্ত্রব্যবস্থা ও ভবিষ্যত সম্ভাবনা
এই অভিযানে ব্যবহৃত অস্ত্রব্যবস্থাগুলোর মধ্যে রয়েছে:
- যুদ্ধবিমান: বি-১, বি-২ স্টিলথ, এফ-৩৫, এফ-১৫, এফ-১৬ ফ্যালকন।
- ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র: লুকাস ড্রোন, এমকিউ-৯ রিপার ড্রোন, হিমার্স রকেট সিস্টেম, টমাহক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র।
- ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা: প্যাট্রিয়ট ও থাড সুরক্ষাব্যবস্থা, কাউন্টার ড্রোনব্যবস্থা।
- নৌশক্তি: ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড ও ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন বিমানবাহী রণতরি, পি-৮ পসেইডন টহল উড়োজাহাজ, সি-১৭ গ্লোবমাস্টার পরিবহন বিমান।
গবেষণাপ্রতিষ্ঠান স্টিমসন সেন্টারের জ্যেষ্ঠ ফেলো ক্রিস্টোফার প্রেবেল আল-জাজিরাকে বলেন, 'ইরানিদের আক্রমণের সক্ষমতা যতটা দ্রুত সম্ভব কমিয়ে আনা এখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মূল লক্ষ্য, যাতে ইরান আর ধ্বংসযজ্ঞ চালাতে না পারে।' তিনি আরও যোগ করেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বাজেট এক ট্রিলিয়ন ডলার থেকে দেড় ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার প্রস্তাব রয়েছে, যা উদ্বেগজনক বলে তিনি মনে করেন।
খরচ অনুমান ও ভবিষ্যত দিকনির্দেশনা
তুরস্কের আনাদোলু সংবাদ সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, অপারেশন এপিক ফিউরির প্রথম ২৪ ঘণ্টায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৭৭ কোটি ৯০ লাখ ডলার খরচ হয়েছে। এছাড়া, অভিযানের আগে সামরিক প্রস্তুতির জন্য আরও প্রায় ৬৩ কোটি ডলার খরচ হয়েছে বলে অনুমান করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুদ্ধের মোট খরচ অনুমান করা এখনও কঠিন, কারণ পেন্টাগন এ সম্পর্কে বিশদ তথ্য প্রকাশ করেনি। তবে, কুয়েতে তিনটি মার্কিন যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হওয়ার মতো ঘটনাগুলো আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি সামরিক সরঞ্জামের মজুত সম্পর্কে বড় প্রশ্ন তুলেছে।
সামগ্রিকভাবে, ইরানে মার্কিন এই অভিযান মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বাড়িয়ে দিয়েছে, এবং এর আর্থিক ও কৌশলগত প্রভাব ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।
