ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন ব্যাখ্যা: ইসরায়েলের হুমকি থেকে মার্কিন সেনাদের রক্ষায় ইরানে হামলা
ট্রাম্প প্রশাসন ইরানে আকস্মিক বিমান হামলা চালানোর পেছনে এক নতুন ও চমকপ্রদ ব্যাখ্যা উপস্থাপন করেছে। সোমবার (২ মার্চ) মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও একটি রুদ্ধদ্বার সংবাদ সম্মেলনে দাবি করেছেন যে, ইসরায়েল ইরানে হামলা চালাতে বদ্ধপরিকর ছিল এবং সেই হামলার প্রতিক্রিয়ায় ইরানি বাহিনী মার্কিন সেনাদের লক্ষ্যবস্তু করবে এমন নিশ্চিত গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতেই যুক্তরাষ্ট্র ‘প্রতিরক্ষামূলক’ হিসেবে এই আগাম হামলা শুরু করেছে।
রুবিওর বক্তব্য: মার্কিন সেনাদের রক্ষায় জরুরি পদক্ষেপ
ক্যাপিটাল হিলে কংগ্রেস সদস্যদের সামনে রুবিও স্পষ্ট ভাষায় বলেন, ‘আমরা জানতাম ইসরায়েল পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে এবং সেটি মার্কিন বাহিনীর ওপর পাল্টা আক্রমণ ডেকে আনবে। আমরা যদি আগেভাগে তাদের সক্ষমতা ধ্বংস না করতাম, তবে আমাদের অনেক বেশি ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানি হতো।’ একই সাথে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এই যুদ্ধের মূল লক্ষ্য উল্লেখ করে বলেন, ইরান যাতে কখনোই পরমাণু অস্ত্র তৈরি করতে না পারে তা নিশ্চিত করাই এই অভিযানের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল।
কংগ্রেসে তীব্র বিভক্তি ও রাজনৈতিক বিতর্ক
ট্রাম্প প্রশাসনের এই ব্যাখ্যায় মার্কিন কংগ্রেস দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। রিপাবলিকানরা ট্রাম্পের এই পদক্ষেপকে ‘প্রতিরক্ষামূলক ও যৌক্তিক’ বলে সমর্থন দিলেও ডেমোক্র্যাটরা একে ‘অপ্রয়োজনীয় এবং লক্ষ্যহীন যুদ্ধ’ বলে তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। সিনেটের ডেমোক্র্যাটিক মাইনরিটি লিডার চাক শুমার একে ‘ট্রাম্পের নিজের তৈরি যুদ্ধ’ বলে অভিহিত করেছেন। অন্যদিকে, সিনেট ইন্টেলিজেন্স কমিটির ভাইস-চেয়ারম্যান মার্ক ওয়ার্নার উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের ওপর সরাসরি কোনো হুমকি ছিল না, হুমকি ছিল ইসরায়েলের ওপর। ইসরায়েলের হুমকিকে যুক্তরাষ্ট্রের হুমকি হিসেবে গণ্য করাটা একটি বিপজ্জনক নজির।’
হামলার পরিণতি: প্রাণহানি ও আঞ্চলিক উত্তেজনা
সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিভিন্ন স্থানে কয়েক দফায় বিমান হামলা চালিয়েছে। এই হামলার ফলে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনেয়ীসহ দেশটির শীর্ষ সামরিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব নিহত হয়েছেন। এর জবাবে ইরানও মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন মিত্র দেশগুলোতে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। মার্কিন সামরিক বাহিনী এই যুদ্ধে তাদের ৬ জন সেনার মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে। অন্যদিকে ইরানি রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির তথ্যমতে ইরানে নিহতের সংখ্যা ৫০০ ছাড়িয়েছে, যা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য ও কংগ্রেসের পরবর্তী পদক্ষেপ
ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু জানিয়েছেন, ইরান এমন কিছু ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক মিসাইল সাইট তৈরি করছিল যা কয়েক মাসের মধ্যেই ধ্বংস করা অসম্ভব হয়ে পড়ত, তাই এখনই ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি ছিল। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কংগ্রেসের অনুমতি ছাড়াই এই হামলার প্রেক্ষিতে প্রতিনিধি পরিষদ চলতি সপ্তাহের শেষের দিকে একটি ‘ওয়ার পাওয়ার রেজোলিউশন’ নিয়ে ভোট দেবে, যার উদ্দেশ্য ট্রাম্পকে এই যুদ্ধ বন্ধে বাধ্য করা। তবে রিপাবলিকান নিয়ন্ত্রিত কংগ্রেসে এই প্রস্তাব পাস হওয়া বা প্রেসিডেন্টের ভেটো ক্ষমতা অতিক্রম করা প্রায় অসম্ভব বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
এই সংকটে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও বৈশ্বিক নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে, এবং ট্রাম্প প্রশাসনের এই নতুন ব্যাখ্যা রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি করেছে।
