মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের বিস্তার: ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ইরানে ৫৫৫ নিহত
ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়েছে, যেখানে ইরানের রাজধানী তেহরানে ধোঁয়ার বিশাল কুণ্ডলী ও বিস্ফোরণের বিকট শব্দে আতঙ্কিত হয়ে পাখিরা উড়ে যাচ্ছে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর এই সংঘাত তীব্র আকার ধারণ করেছে, যেখানে তেহরানে দফায় দফায় হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র। পাল্টা জবাবে ইরানও ইসরায়েলসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়ে যাচ্ছে, যা পুরো অঞ্চলে অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে।
হামলার বিস্তার ও ক্ষয়ক্ষতি
গত শনিবার শুরু হওয়া হামলার তৃতীয় দিনে ইরান ও ইসরায়েল ছাড়াও লেবানন, সৌদি আরব, আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন, জর্ডান, ওমান, ইরাক ও সাইপ্রাসে হামলা হয়েছে। ইরানের রেড ক্রিসেন্টের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল পর্যন্ত অন্তত ৫৫৫ জন নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে শুধু একটি মেয়েদের স্কুলে হামলায় ১৮০ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। ইসরায়েলে ১০ জন ও মার্কিন চার সেনা নিহত হয়েছেন, এবং ইরানের বিপ্লবী গার্ড কোর ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন লক্ষ্য করে হামলার দাবি করেছে।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও যুদ্ধের সম্ভাব্য সময়কাল
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, এই যুদ্ধ চার থেকে পাঁচ সপ্তাহ চলতে পারে এবং প্রয়োজনে আরও দীর্ঘায়িত হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের চলমান অভিযানের নাম দিয়েছে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’, আর ইসরায়েল নাম দিয়েছে ‘লায়ন রোর’। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ১৩১টি শহরে হামলা চালিয়েছে, যেখানে তেহরানের প্রাণকেন্দ্রে হামলা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
বেসামরিক স্থাপনায় হামলা ও পরমাণু স্থাপনার লক্ষ্য
ইরানের তাসনিম নিউজ এজেন্সির খবরে বলা হয়, সামরিক স্থাপনার পাশাপাশি বেসামরিক স্থাপনাগুলোতেও হামলা চালাচ্ছে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র, যেমন তেহরানের রেভোল্যুশন স্কয়ারে প্রতিবাদকারীদের ওপর বোমাবর্ষণ। ইরানের আইনপ্রণেতা ফাতেমেহ মোহাম্মদ বেগ নিশ্চিত করেছেন যে নয়টি হাসপাতালে হামলা হয়েছে, এবং মার্কিন বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড আইআরজিসির প্রধান কার্যালয় ধ্বংসের দাবি করেছে। জাতিসংঘের আণবিক শক্তি সংস্থায় নিযুক্ত ইরানের দূত রেজা নাজাফি জানিয়েছেন, নাতাঞ্জ ও ইসফাহান পরমাণু স্থাপনায় হামলা চালানো হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষয়ক্ষতি ও কুয়েতে বিমান বিধ্বস্ত
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড নিশ্চিত করেছে যে কুয়েতে তিনটি ‘এফ-১৫ ইগল’ মডেলের যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হয়েছে, যা ইরানে চলমান অভিযানের অংশ হিসেবে মোতায়েন করা হয়েছিল। কুয়েতের বিমান প্রতিরক্ষা বাহিনীর ভুল করে ছোড়া গুলিতে বিমানগুলো ভূপাতিত হয়েছে, তবে পাইলট ও ক্রু সদস্যরা জীবিত আছেন। ইরানের হামলায় মার্কিন চার সেনা নিহত হয়েছেন, যা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় ধরনের ক্ষতি হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে।
লেবাননে যুদ্ধের বিস্তার ও হিজবুল্লাহর ভূমিকা
খামেনি হত্যার প্রতিশোধ নিতে লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ ইসরায়েলে হামলা চালিয়েছে, যার জবাবে ইসরায়েল লেবাননে ব্যাপক হামলা চালাচ্ছে। ইসরায়েলি বাহিনীর মুখপাত্র এফি দেফরিন জানিয়েছেন, লেবাননে হামলার জন্য প্রায় এক লাখ সংরক্ষিত সেনা প্রস্তুত করা হয়েছে। ইসরায়েলের হামলায় লেবাননে ৫২ জন নিহত ও ১৫৪ জন আহত হয়েছে, এবং সাড়ে ২৮ হাজারের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।
অর্থনৈতিক প্রভাব ও তেলের দাম বৃদ্ধি
মধ্যপ্রাচ্যে হামলার মধ্যে বিশ্বব্যাপী অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়েছে, বিশেষ করে সৌদি আরবের রাস তানুরা তেল শোধনাগারে ইরানের ড্রোন হামলার পর উৎপাদন সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। আরব আমিরাত, কাতার ও অন্যান্য দেশেও জ্বালানি স্থাপনায় হামলা চলছে, যা আঞ্চলিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অবস্থান ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
যুক্তরাষ্ট্র, বাহরাইন, জর্ডান, কুয়েত, কাতার, সৌদি আরব ও আরব আমিরাত যৌথ বিবৃতি দিয়ে ইরানের হামলাকে ‘অন্যায্য’ বলে অভিহিত করেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ফ্রান্স ইরানের হামলার শিকার দেশগুলোর প্রতি সংহতি জানিয়েছে, তবে ন্যাটো সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার কোনো পরিকল্পনা নেই বলে জানিয়েছে। বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন, ইরান যুদ্ধের চেয়ে আত্মসমর্পণকে বেশি ভয় পায়, যা সংঘাতকে দীর্ঘায়িত করতে পারে।
