মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা: ইরানের হামলায় তেল শোধনাগারে কালো ধোঁয়া, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের পাল্টা আক্রমণ
সৌদি আরবের রাস তানুরা তেল শোধনাগারে ইরানের হামলার পর কালো ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়েছে, যা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল ভিডিওর মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী আলোচনার জন্ম দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও উপসাগরীয় দেশগুলো এক যৌথ বিবৃতিতে ইরানের হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে, অভিযোগ করে যে ইরান অঞ্চলজুড়ে ‘নির্বিচার ও বেপরোয়াভাবে’ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালাচ্ছে, যা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য মারাত্মক হুমকি সৃষ্টি করছে।
ইসরায়েল-হিজবুল্লাহ সংঘাতের তীব্রতা
ইসরায়েলি সেনাবাহিনী সোমবার সকালে দাবি করেছে যে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যার প্রতিশোধ নিতে হিজবুল্লাহ ইসরায়েলে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। এর জবাবে ইসরায়েল লেবাননজুড়ে হিজবুল্লাহর ওপর ব্যাপক হামলা চালাচ্ছে, যেখানে শিয়া মতাবলম্বী এই সশস্ত্র গোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে ইরানের প্রধান মিত্র হিসেবে ভূমিকা পালন করে আসছে। লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, হিজবুল্লাহ–নিয়ন্ত্রিত বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলীয় উপশহর এবং লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে ইসরায়েলের হামলায় অন্তত ৩১ জন নিহত এবং ১৪৯ জন আহত হয়েছেন।
ইসরায়েলি সেনাবাহিনী লেবাননের পূর্ব ও দক্ষিণাঞ্চলের প্রায় ৫০টি গ্রামের বাসিন্দাদের নিরাপদ এলাকায় সরে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে, যার ফলে সোমবার সকালে সড়কগুলোতে ব্যাপক ভিড় ও বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে। বৈরুতে ইসরায়েলের হামলার পর আগুন ও ধোঁয়ার কুন্ডলী আকাশে উড়তে দেখা গেছে, যা স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে দিয়েছে।
হতাহতের সংখ্যা বৃদ্ধি ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
ইরানের রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি জানিয়েছে যে শনিবার থেকে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় অন্তত ৫৫৫ জন নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে ইরানের দক্ষিণাঞ্চলের একটি বালিকা বিদ্যালয়ে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১৬৫ জনে দাঁড়িয়েছে। যুদ্ধ শুরুর পর কোনো একক হামলায় এটাই সবচেয়ে বেশি প্রাণহানির ঘটনা হিসেবে রেকর্ড করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র উপসাগরীয় দেশগুলো ধারাবাহিকভাবে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার শিকার হচ্ছে, যেখানে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই ও সামহা এবং কাতারের রাজধানী দোহায় বড় বড় বিস্ফোরণ ঘটছে। সৌদি আরবের সবচেয়ে বড় তেল শোধনাগার সৌদি আরামকোয় ড্রোন হামলায় আগুন ধরার পর সেটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, যা দেশটির অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা দিয়েছে।
জ্বালানি বাজার ও বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রভাব
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা চালানোর পর থেকেই বিশ্ব অর্থনীতিতে এর বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা। সোমবার জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি পুঁজি বাজারগুলোতে দরপতনের চাপ তৈরি হয়েছে, যেখানে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ১৩ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি মূল্য ৮২ ডলারে উঠেছে। এটা গত ১৪ মাসের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দাম হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
বিশ্ববাণিজ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পথগুলোর একটি হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জ্বালানি তেলের সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তীব্র হয়েছে, যা বৈশ্বিক শিল্প ও পরিবহন খাতকে ব্যাহত করছে। যুদ্ধের কারণে বেসামরিক বিমান পরিবহন চলাচল ব্যাপকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে, যার ফলে মধ্যপ্রাচ্যে লাখ লাখ মানুষ আটকা পড়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান ও রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া
যুক্তরাষ্ট্র সেনাবাহিনীর আরও এক সদস্য নিহত হওয়ায় যুদ্ধে চার মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে এক ভিডিও বার্তায় বলেছেন যে যুদ্ধে আরও মার্কিন সেনা হতাহত হতে পারে, পাশাপাশি তিনি ইরানে সামরিক অভিযান অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছেন। ট্রাম্প দাবি করেছেন যে ইরানের ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিহত করতে কুয়েতের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা থেকে ভুল করে ছোড়া গোলায় তিন মার্কিন যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হয়েছে, তবে ছয়জন ক্রুই নিরাপদে বের হয়ে এসেছেন।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ফক্স নিউজকে বলেছেন যে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় দেশটির ৪৮ জন নেতা নিহত হয়েছেন, যা তিনি একটি বড় সাফল্য হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তবে রয়টার্স/ইপসোসের এক জনমত জরিপে বলা হয়েছে যে মাত্র ২৭ শতাংশ আমেরিকান যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যুকে সমর্থন করেছেন, অন্যদিকে প্রায় অর্ধেক আমেরিকান মনে করেন যে ট্রাম্প সামরিক শক্তি প্রয়োগের বিষয়ে অতি উৎসাহী।
সাইপ্রাসে যুক্তরাজ্যের ঘাঁটি আর এ এফ আকরোতিরিতে ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে বলে ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় নিশ্চিত করেছে, যদিও সেখানে এ ঘটনায় কেউ হতাহত হয়নি। যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ের স্টারমার ইরানের ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করার জন্য মার্কিন বাহিনীকে তাদের ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দেওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে এই হামলা ঘটে, যা আন্তর্জাতিক উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
