ইসরায়েল-মার্কিন হামলায় তেহরানে আতঙ্ক, ইরানিদের মিশ্র প্রতিক্রিয়া
ইসরায়েল-মার্কিন হামলায় তেহরানে আতঙ্ক, ইরানিদের মিশ্র প্রতিক্রিয়া

ইসরায়েল-মার্কিন হামলায় তেহরানে আতঙ্ক, ইরানিদের মিশ্র প্রতিক্রিয়া

সাইরেনের আওয়াজ শোনার পর নিরাপদ আশ্রয়ে ছুটছেন ইসরায়েলিরা। ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, শনিবার সকালে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় তেহরানে বিকট বিস্ফোরণে কেঁপে ওঠে ইরানের রাজধানী। আকাশে কুণ্ডলী পাকানো ধোঁয়া উড়তে দেখা যায়, যা সপ্তাহের প্রথম কর্মদিবসের শুরুতেই শহরবাসীকে আতঙ্কিত করে তোলে।

সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ও বাস্তবতা

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ভিডিওতে দেখা যায়, বিস্ফোরণস্থলের কাছাকাছি থাকা মানুষজন আতঙ্কে ছোটাছুটি করছেন। পেছন থেকে ভেসে আসছে মানুষের চিৎকার ও কান্নার শব্দ। তবে একই সময়ে একদল মানুষের মধ্যে স্বস্তি, এমনকি উল্লাসেরও আভাস পাওয়া গেছে। তাঁরা বিশ্বাস করেন, একমাত্র সামরিক হস্তক্ষেপের মাধ্যমেই ইরানের বর্তমান সরকারের পতন ঘটানো সম্ভব।

অনেকেই আগে থেকে ধারণা করছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র হয়তো হামলা চালাতে পারে। এ নিয়ে ইরানিদের মধ্যে চরম মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। ইরানেও ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি রয়েছে—মধ্যপ্রাচ্যের এমন কয়েকটি দেশে পাল্টা হামলা চালিয়েছে। এ হামলা নিয়ে দুই দেশের মানুষ আতঙ্কে আছেন। সেই কথাই তাঁরা জানিয়েছেন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকে।

বিভিন্ন শহরের বাসিন্দাদের প্রতিক্রিয়া

রাজধানী তেহরান থেকে রয়টার্সের সঙ্গে কথা বলার সময় এক ব্যক্তি বলেন, তিনি সন্তানদের স্কুল থেকে আনতে তাড়াহুড়ো করে সেদিকে ছুটছেন। উত্তরাঞ্চলীয় শহর তাবরিজ থেকেও বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে। সেখানকার ৩২ বছর বয়সী দুই সন্তানের জননী মিনু বলেন, ‘আমরা খুব ভয় পাচ্ছি, আমরা আতঙ্কিত। আমার সন্তানেরা ভয়ে কাঁপছে। আমাদের যাওয়ার কোনো জায়গা নেই, আমরা এখানেই মারা পড়ব।’ ফোনে কথা বলার সময় কাঁদতে কাঁদতে মিনু বলেন, ‘আমার সন্তানদের কী হবে?’

মধ্যাঞ্চলীয় শহর ইয়াজদের এক বাসিন্দা বলেন, তিনি আশা করেন এই হামলার মাধ্যমে ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকে দেশ শাসন করে আসা ধর্মীয় শাসনব্যবস্থার পতন ঘটবে। ইয়াজদের ওই বাসিন্দা বলেন, ‘ওদের বোমা ফেলতে দিন।’ তবে উত্তরাঞ্চলীয় শহর রাশ্তের বাসিন্দা সামিরা মহেবি ইয়াজদের ওই ব্যক্তির কথার সঙ্গে একমত নন।

যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন হামলায় সাদ্দাম হোসেনের পতনের পর প্রতিবেশী দেশ ইরাক বছরের পর বছর ধরে চরম বিশৃঙ্খলা ও রক্তপাতের শিকার হয়েছে—এমন উদাহরণ টেনে তিনি (সামিরা মহেবি) বলেন, ‘আমি এই শাসনতন্ত্রের বিরোধী, এরা জাহান্নামে যাক। কিন্তু আমি চাই না, বিদেশি কোনো বাহিনী আমার দেশে হামলা চালাক। আমার ইরানকে আমি ইরাকের মতো হতে দেখতে চাই না।’

তেহরানের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও আলোচনার ব্যর্থতা

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, তেহরানের যে এলাকায় সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি, প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের কার্যালয় এবং পার্লামেন্ট ভবন অবস্থিত, সেখানকার রাস্তাঘাট আটকে দিয়েছে নিরাপত্তা বাহিনী। গত বৃহস্পতিবার জেনেভায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সর্বশেষ দফার আলোচনা হয়। মধ্যস্থতাকারী দেশ ওমানের কর্মকর্তারা ওই আলোচনায় অগ্রগতির কথা জানালেও তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচির বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সমঝোতা হয়নি। এই আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পরই এই হামলার ঘটনা ঘটল।

তেহরানের এক বাসিন্দা বলেন, ‘তারা (ইরান সরকার) বলেছিল পারমাণবিক আলোচনা ভালো চলছে। তারা আমাদের আবার বোকা বানাল।’ পশ্চিমা দেশগুলোর সরকার দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ করে আসছে, ইরান পারমাণবিক বোমা তৈরির চেষ্টা চালাচ্ছে। তবে তেহরান বরাবরই এই অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।

অর্থনৈতিক প্রভাব ও জনগণের উদ্বেগ

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সাধারণ মানুষ এখন হন্যে হয়ে বৈদেশিক মুদ্রা কেনার জন্য ছুটছেন। ইস্ফাহান শহরের কয়েকটি জায়গায়ও হামলার খবর পাওয়া গেছে। সেখানকার কয়েকজন বাসিন্দা জানান, তাঁরা এটিএম বুথ থেকে নগদ টাকা তুলতে পারছেন না। ৪৫ বছর বয়সী রেজা সাদাতি বলেন, তিনি তাঁর পরিবারকে তুর্কি সীমান্তের কাছাকাছি উরুমিয়েহ শহরে নিয়ে যাচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘সীমান্ত খোলা থাকলে আমরা ওপারে যাব এবং এরপর ইস্তাম্বুলের উদ্দেশে উড়াল দেব।’

তেহরান থেকে প্রায় ৫০০ কিলোমিটার দূরের শহর ইলাম থেকে ৬৩ বছর বয়সী মোহাম্মদ ইসমাইলি জানান, তিনিও পরিবার নিয়ে শহর ছাড়বেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের কপালে কী আছে, তা একমাত্র আল্লাহই জানেন। আমাদের জন্য প্রার্থনা করবেন।’ তেহরানের তিন সন্তানের মা বলেন, ‘মানুষ হতবাক হয়ে পড়েছে, চরম আতঙ্কে আছে। আমাদের কী হবে? দয়া করে আমাদের বাঁচান।’

ইসরায়েলি বাসিন্দাদের অভিজ্ঞতা ও সরকারের প্রতি অবিশ্বাস

‘এই পরিস্থিতি কতটা ভয়ংকর, তা আমার মনে আছে,’ জেরুজালেমের আশ্রয়কেন্দ্র থেকে এক ইসরায়েলি নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাসিন্দা বিবিসিকে বলেন, তিনি তিন ঘণ্টা ধরে নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে (বম্ব শেল্টার) আছেন। ইসরায়েল ইরানের ওপর হামলা চালানোর ঘোষণা দেওয়ার সময় সরকারের পক্ষ থেকে প্রথম সতর্কতা জারি করার পর থেকেই তিনি সেখানে অবস্থান করছেন।

ওই ইসরায়েলি বলেন, এক ঘণ্টা ধরে তিনি শুধু সাইরেনের শব্দ শুনছেন। সেই সঙ্গে মাথার ওপর দিয়ে যুদ্ধবিমান উড়ে যাওয়ার শব্দ এবং ইসরায়েলের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা দিয়ে হামলা ঠেকানোর বিকট শব্দও শুনতে পাচ্ছেন তিনি। ওই বাসিন্দা বলেন, ‘গতবারের অভিজ্ঞতা থেকে এই পরিস্থিতি কতটা ভয়ংকর হতে পারে, তা হয়তো আমার ধারণা আছে। কিন্তু এবারের পরিস্থিতি আমাকে নতুন করে ভয় পাইয়ে দিয়েছে। একটা ক্ষেপণাস্ত্র এসে যেকোনো মুহূর্তে আমাকে বা আমার প্রিয়জনদের মেরে ফেলতে পারে, এমন চিন্তাটাই চরম আতঙ্কের। আর এই অনুভূতি কতটা ভয়ংকর, তা আমি ভুলেই গিয়েছিলাম।’

হোয়াটসঅ্যাপে পাঠানো এক বার্তায় জেরুজালেমের ওই বাসিন্দা লেখেন, ‘আমি এখানে বেশ স্বাচ্ছন্দ্যেই আছি, যে সুবিধা অনেক ইসরায়েলি নাগরিকেরই নেই। তবে আমি জানি, সরাসরি কোনো বোমা আঘাত হানলে এই ঘরটি আমাকে বাঁচাতে পারবে না। তাই আমি ভাবছি আমার পাবলিক শেল্টারে (সরকারি আশ্রয়কেন্দ্র) যাওয়া উচিত কি না। কারণ, সরাসরি আঘাত সামলাতে সেটি হয়তো তুলনামূলকভাবে একটু বেশি সুরক্ষিত।’

আজ ইরানের ওপর ইসরায়েলের হামলার বিষয়ে নিজের প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে এই বাসিন্দা বলেন, ‘আমার নিজের সরকারের ওপরই চরম অবিশ্বাস তৈরি হয়েছে। আমি একদমই বিশ্বাস করি না, তারা একজন নাগরিক হিসেবে আমার কিংবা অন্য কারও স্বার্থ নিয়ে ভাবছে। ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার এই লড়াইয়ে তারা কেবল নিজেদের স্বার্থই দেখছে।’ সংক্ষেপে বলতে গেলে, ‘আমি ভীত এবং একই সঙ্গে প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ। কারণ, আমাদের আবারও এমন এক পরিস্থিতিতে ঠেলে দেওয়া হলো। ক্ষমতা দখলের এই অযৌক্তিক লড়াইয়ে আমরা সাধারণ মানুষ যেন কেবলই দাবার ঘুঁটি।’